৮৬ বছর বয়সে মারা গেলেন জনপ্রিয় লেখক জেফ্রি আর্চার

জেফ্রি আর্চার
জনপ্রিয় লেখক ও সাবেক রাজনীতিক জেফ্রি আর্চার ৮৬ বছর বয়সে মারা গেছেন। সোমবার নিজ বাড়িতে লেখালেখির কাজের মধ্যেই আকস্মিক ও শান্তিপূর্ণভাবে তার মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছে তার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হার্পারকলিন্স।
পাঁচ দশকের লেখকজীবনে আর্চারের বই বিক্রি হয়েছে ৩০ কোটিরও বেশি কপি। তার জনপ্রিয় বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ক্লিফটন ক্রনিকলস’ ও ‘কেন অ্যান্ড এবেল’। নিজের শহর সমারসেটের ওয়েলিংটনকে তার অনেক উপন্যাসের পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করেছেন তিনি।
১৯৪০ সালের ১৫ এপ্রিল উত্তর লন্ডনে জেফ্রি আর্চারের জন্ম। পরে পরিবারের সঙ্গে সমারসেটের ওয়েস্টন-সুপার-মেয়ারে চলে যান। সেখানে তার পরিবার ব্রিটিশ কৌতুক অভিনেতা জন ক্লিজের মায়ের কাছ থেকে একটি বাড়ি কিনেছিল।
১৯৬৯ সালে লিংকনশায়ারের লাউথ আসন থেকে রক্ষণশীল দলের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আর্চার। পাঁচ বছর সংসদ সদস্য থাকার পর তিনি দলটির চেয়ারম্যান হন।
তবে ২০০১ সালে তার রাজনৈতিক জীবনে বড় ধাক্কা আসে। একটি সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে করা মানহানি মামলায় মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। মামলাটিতে তিনি পাঁচ লাখ পাউন্ড ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন। পরে মিথ্যাচার ও বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার অপরাধে তাকে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
২০০৩ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আবার উচ্চকক্ষে যোগ দেন। ২০২৪ সালে তিনি সেখান থেকে অবসর নেন।
তার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, আর্চারের সর্বশেষ বই ‘অ্যাডাম অ্যান্ড ইভ’ চলতি সপ্তাহেই প্রকাশিত হওয়ার কথা। প্রতিষ্ঠানটি তাকে ‘অসাধারণ গল্পকার’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছে, তার পাঠকরাই তার কাছে সবকিছুর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন।
মৃত্যুর মাত্র এক সপ্তাহ আগে নিজের সাবেক বিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন আর্চার। সেখানে সর্বশেষ বইটির প্রচারে অংশ নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘এখানে ফিরে আসাটা দারুণ। গ্রন্থাগারের দিকে হাঁটার সময় আমি সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছি শিক্ষার্থীদের দেখে। ছেলেমেয়েদের দেখে মনে হচ্ছিল, এদের মধ্য থেকেই তৈরি হবে পরবর্তী প্রজন্ম।’
আগামী শনিবার চেলটেনহ্যাম উৎসবে নিজের শেষ উপন্যাস নিয়ে আলোচনায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল তার। এর আগের দিন রবিবার লন্ডনের লেস্টার স্কয়ার থিয়েটারে সম্প্রচারক গাইলস ব্র্যান্ডরেথের সঙ্গে ভক্তদের জন্য বইয়ে স্বাক্ষরও করেছিলেন তিনি।
আর্চারের স্ত্রী মেরির সঙ্গে এ বছর তাদের ৬০তম বিবাহবার্ষিকী উদ্যাপন হয়। তাদের দুই ছেলে ও পাঁচ নাতি-নাতনি রয়েছে।
আর্চারের মৃত্যুতে রক্ষণশীল দলের নেতা কেমি ব্যাডেনক শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘তার মৃত্যুতে আমি ভীষণভাবে মর্মাহত। আজ সকালেই তিনি আমাকে একটি সুন্দর বার্তা পাঠিয়েছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি সবসময় আমাকে উৎসাহ দিতেন।’
আর্চারের দীর্ঘদিনের সম্পাদক ও হার্পারকলিন্সের যুক্তরাজ্য শাখার প্রধান নির্বাহী কেট এলটন বলেন, ‘আমার প্রকাশনা জীবনের অন্যতম বড় সৌভাগ্য ছিল জেফ্রি আর্চারের সম্পাদক হতে পারা। তিনি ছিলেন অসাধারণ গল্পকার এবং সম্পাদকের জন্য স্বপ্নের লেখক। তিনি অসম্ভব পরিশ্রমী ছিলেন। প্রতিটি শব্দ যতটা সম্ভব নিখুঁত না হওয়া পর্যন্ত খসড়া বারবার সংশোধন করে যেতেন। ভালো প্রকাশনার পেছনে একটি দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন, আর তিনি ছিলেন সেই দলীয় চেতনার একজন সত্যিকারের সমর্থক।’
আর্চারের সঙ্গে অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া গাইলস ব্র্যান্ডরেথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘মাত্র গতকালই জেফ্রি আর্চারের নতুন উপন্যাস প্রকাশ উপলক্ষে আমি তার সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, এটিই হবে তার শেষ উপন্যাস। তাকে তখন দারুণ প্রাণবন্ত মনে হচ্ছিল। পরিপূর্ণ দর্শক তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিল। তিনি ছিলেন মজার, আকর্ষণীয় ও নিজের সম্পর্কে রসিকতা করতে পারা একজন মানুষ। শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ছিলেন অসাধারণ গল্পকার।’
সাবেক রক্ষণশীল দলের অর্থমন্ত্রী নাদিম জাহাওয়ি আর্চারকে ‘প্রিয় বন্ধু ও অসাধারণ মানুষ’ হিসেবে স্মরণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘গল্প বলার প্রতিভার সঙ্গে তার ছিল রসবোধ, উষ্ণতা ও অফুরন্ত প্রাণশক্তি। জেফ্রি আর্চারের সঙ্গ কখনোই একঘেয়ে ছিল না।’






