তর্ক করতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলছেন? জানুন কারণ ও সমাধান

ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি
তর্কের মাঝখানে হঠাৎ করে এমন কথা শুনে বসা, ‘তোমার মধ্যে সহানুভূতি বলতে কিচ্ছু নেই’— এটি কেবল কষ্টের না, ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা করে দেয়। বিশেষ করে যখন জানেন, আপনি আসলে তেমন নন।
তবুও সে মুহূর্তে নিজেকে থামাতে পারেন না, কথা বাড়তেই থাকে, প্রতিক্রিয়া তীব্র হতে থাকে। পরে ঠান্ডা মাথায় ভাবলে অচেনা লাগে নিজেরই আচরণ।
এই অভিজ্ঞতাটা অস্বাভাবিক নয়। আমরা যখন প্রিয় মানুষের সঙ্গে তর্কে জড়াই, তখন অনেক সময় আমাদের মস্তিষ্ক এমন এক অবস্থায় ঢুকে পড়ে, যেখানে যুক্তি বা সহানুভূতির চেয়ে টিকে থাকাই যেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বেশি।
তর্কের সময় খেয়াল করলে দেখা যায়, শরীর আগে বদলে যায়। হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়, শরীর গরম হয়ে ওঠে, হাত কাঁপতে পারে, অস্বস্তি বাড়তে থাকে। যেন হঠাৎ করে কোনো অদৃশ্য বিপদের মুখে পড়ে গেছি। এই অবস্থাকেই বলা হয় ইমোশনাল ফ্লাডিং। বাস্তবে হয়তো কোনো শারীরিক বিপদ নেই; কিন্তু শরীর সেভাবেই প্রতিক্রিয়া দেখায়, যেন এখনই কিছু একটা থেকে বাঁচতে হবে।
এখানেই মস্তিষ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক কাজ করে। আমরা যা দেখি বা অনুভব করি, তা সরাসরি বাস্তবতার প্রতিফলন নয়। মস্তিষ্ক সবকিছু ব্যাখ্যা করে আমাদের আগের অভিজ্ঞতার আলোকে।
তাই তর্কের সময় সঙ্গী যদি হঠাৎ চুপ হয়ে যায় বা চোখ ফিরিয়ে নেয়, সেটি কেবল একটি আচরণ হিসেবেই থাকে না; অনেক সময় সেটি পুরনো কোনো অনুভূতির দরজা খুলে দেয়— অবহেলা, দূরত্ব বা প্রত্যাখ্যানের স্মৃতি ফিরে আসে।
বর্তমান আর অতীত মিশে গিয়ে একধরনের অস্বস্তিকর ‘বিপদের’ অনুভূতি সৃষ্টি করে।
যাদের জীবনে আগে থেকেই কনফ্লিক্ট বা মানসিক আঘাতের অভিজ্ঞতা বেশি, তাদের ক্ষেত্রে এ প্রতিক্রিয়া আরও দ্রুত হয়। মস্তিষ্ক তখন ছোট সংকেতকেও বড় হুমকি হিসেবে ধরে নেয়।
এটি আসলে আমাদের রক্ষা করার চেষ্টা করে; কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় সম্পর্কের ক্ষতি করে ফেলে।
এ অবস্থায় আমাদের চিন্তার ধরনও বদলে যায়। ‘আমরা’ ভাবনা থেকে ‘আমি’ ভাবনায় চলে যাই। তখন নিজের অনুভূতি, নিজের নিরাপত্তা— এগুলোই প্রধান হয়ে ওঠে।
অন্যজন কী অনুভব করছে, সেটি বোঝার জায়গাটা সংকুচিত হয়ে যায়। ফলে সহানুভূতি কমে যায় আর তর্কটা আরও তীব্র হয়।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ; আমরা একে অপরকে প্রভাবিত করি। তর্কে একজন উত্তেজিত হলে অন্যজনও সহজে উত্তেজিত হয়ে পড়ে। একে অপরের আবেগ যেন অন্যকে টেনে নিচে নামাতে থাকে।
তাই এ পরিস্থিতিতে দায়িত্বটা একতরফা নয়; বরং দুজনেরই।
এ বিষয়টি পরিবারে, বিশেষ করে মা-বাবা ও সন্তানের সম্পর্কে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি শিশু যখন অস্থির আচরণ করে, তখন সেটি অনেক সময় কিছু বোঝাতে চায়। কিন্তু যদি সে মুহূর্তে অভিভাবক নিজেই মানসিকভাবে চাপে থাকেন, তাহলে বোঝার বদলে প্রতিক্রিয়া দেখানোই সহজ হয়ে যায়।
যেখানে দরকার ছিল একটু কৌতূহল, সেখানে চলে আসে বিরক্তি বা রাগ।
তাহলে কী করা যায়? প্রথমত, নিজের ভেতরের পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করা জরুরি। ফ্লাডিং শুরু হওয়ার আগে শরীর কিছু সংকেত দেয়। সেগুলো চিনতে পারলে প্রতিক্রিয়া দেওয়ার আগে একটুখানি থামার সুযোগ পাওয়া যায়।
এ ছোট বিরতিটাই অনেক বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
দ্বিতীয়ত, মস্তিষ্ক যে প্রথম ব্যাখ্যাটি দেয়, সেটিকে চূড়ান্ত ধরে না নেওয়াই ভালো। নিজেকে জিজ্ঞেস করা যেতে পারে, এর অন্য কোনো মানে হতে পারে কি? এ প্রশ্ন ভাবনার দিক পাল্টে দিতে পারে আর আবেগকে কিছুটা নরম করে।
সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো, সময় নিয়ে নেওয়া। তর্কের মাঝখানে একটু বিরতি নেওয়া। তবে সেটি যেন সম্পর্ক থেকে সরে যাওয়া না হয়; বরং সাময়িকভাবে নিজেকে সামলে নেওয়া হয়।
অন্তত কিছু সময় দরকার, যাতে শরীর আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে। এ সময়টা তর্ক নিয়ে ভাবার জন্য নয়; বরং মনকে অন্যদিকে নেওয়ার জন্য।
যারা নিজের শারীরিক প্রতিক্রিয়া বুঝতে পারেন না, তাদের জন্য সহজ কিছু প্রযুক্তিও সাহায্য করতে পারে। যেমন হৃৎস্পন্দন মাপার মাধ্যমে বোঝা যায়, কখন শরীর উত্তেজিত হয়ে উঠছে। ধীরে ধীরে এটি নিজের অনুভূতিকে চিনতে সহায়তা করে।
শেষ পর্যন্ত তর্ক এড়িয়ে যাওয়াই লক্ষ্য নয়। সম্পর্ক থাকলে মতবিরোধ থাকবেই। গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই মুহূর্তে আমরা কতটা সচেতন থাকতে পারছি। সহানুভূতি হারিয়ে ফেলা মানেই আপনি খারাপ মানুষ নন; বরং সেটি অনেক সময় শরীর ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
তবে এটিও সত্য, বোঝাপড়া বাড়ালে এবং নিজেকে একটু সময় দিলে আমরা ধীরে ধীরে শিখতে পারি— কীভাবে তর্কের মধ্যেও নিজেকে ধরে রাখা যায়। আর সেখানেই সম্পর্ক টিকে থাকার সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়।
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট



