ভ্যাংকুভার থেকে মেক্সিকো সিটি
১৬ শহরে দেখার আছে কত কী!

মেক্সিকান সংস্কৃতির অনেক পরিচিত উপাদানের জন্ম গুয়াদালাহারায়
বিশ্বকাপ মানেই শুধু ৯০ মিনিটের লড়াই নয়। কখনো তা পাহাড়ের শহরে সকালের কফি, কখনো সমুদ্রতটে সূর্যাস্ত, কখনো হাজার বছরের সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ কিংবা রাস্তায় রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা খাবারের গন্ধ। তিন দেশ, ১৬ শহর, এক মহাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ফুটবলের অনন্য এক উৎসব এবারের ২০২৬ বিশ্বকাপ। তাই কেউ যদি শুধু খেলা দেখে হোটেলে ফিরে যান, তাহলে বিশ্বকাপের অর্ধেকই মিস করবেন। চলুন, স্টেডিয়ামের গ্যালারি ছাড়িয়ে দেখে আসি বিশ্বকাপের শহরগুলোকে। এ বিষয়ে সহায়তা করেছেন ইশতিয়াক হাসান
পাহাড়, সমুদ্র আর বনের শহর
কানাডার পশ্চিম উপকূলের ভ্যাংকুভার অনেকের চোখেই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শহরগুলোর একটি। এক পাশে প্রশান্ত মহাসাগর, অন্য পাশে তুষারঢাকা পাহাড়। শহরের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্থান স্ট্যানলি পার্ক। সাইকেল চালাতে চালাতে একদিকে সমুদ্র, অন্যদিকে শতবর্ষী গাছের বন দেখবেন মোহিত চোখে। কাছেই গ্রাউস মাউন্টেন। গ্রীষ্মেও সেখানে পাহাড়ি আবহাওয়া উপভোগ করা যায়। রসনার কথা বললে ভ্যাংকুভার সমুদ্রজাত খাবারের জন্য বিখ্যাত। এশীয় অভিবাসীদের প্রভাবে শহরটিতে মিলবে চীনা, জাপানি ও কোরীয় খাবারের অসংখ্য ভালো রেস্তোরাঁ।
পৃথিবীর ক্ষুদ্র সংস্করণ
বিশ্বের অন্যতম বহু সাংস্কৃতিক শহর টরন্টো। এখানে দুই শতাধিক জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বাস করে। শহরের প্রতীক সিএন টাওয়ার। একসময় এটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু স্বাধীন স্থাপনা। ওপর থেকে পুরো শহর আর অন্টারিও হ্রদ দেখা যায়। সুযোগ থাকলে একদিনের জন্য চলে যেতে পারেন নায়াগ্রা জলপ্রপাতে। পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত জলপ্রপাতটি টরন্টো থেকে খুব বেশি দূরে নয়।
কফি আর কুয়াশার নগরী
যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পশ্চিমের শহর সিয়াটলকে অনেকেই কফির রাজধানী বলেন। পাইক প্লেস মার্কেট শহরের প্রাণকেন্দ্র। এখানে মাছ বিক্রেতাদের অভিনব ডাকাডাকি পর্যটকদের জন্য বড় আকর্ষণ। কাছেই রয়েছে স্পেস নিডল, যেখান থেকে শহরের চমৎকার দৃশ্য দেখা যায়। সিয়াটলের আশপাশে রেনিয়ার পর্বত ও অলিম্পিক জাতীয় উদ্যান প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে স্বর্গের মতো।
সোনালি সেতুর শহর
বিশ্বকাপের ম্যাচ হবে সান্তা ক্লারায়, কিন্তু অধিকাংশ দর্শনার্থীর গন্তব্য হবে সান ফ্রান্সিসকো। গোল্ডেন গেট সেতু, আলকাত্রাজ দ্বীপ ও বিখ্যাত ট্রামলাইন শহরের পরিচিত মুখ। প্রযুক্তিপ্রেমীদের জন্য কাছেই সিলিকন ভ্যালি। এ অঞ্চলের ওয়াইন উৎপাদনও বিখ্যাত। নাপা ভ্যালি ও সোনোমা উপত্যকায় গিয়ে বিশ্বের সেরা কিছু আঙুরক্ষেত দেখতে পারবেন।
স্বপ্ন তৈরির কারখানা
হলিউডের নাম শোনেননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। লস অ্যাঞ্জেলেসে গেলে হলিউড বুলেভার্ড, ইউনিভার্সাল স্টুডিও ও সান্তা মনিকা সৈকত ঘুরে দেখা যায়। শহরটির উপকূলরেখা প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ। মেক্সিকান খাবারের জন্যও এটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সেরা শহর। আর যারা তিন গোয়েন্দাপ্রেমী তারা নিশ্চিতভাবেই এখানে রকি বিচের খোঁজ করে হয়রান হবেন।
টেক্সাসের হৃৎস্পন্দন
বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ হচ্ছে ডালাস-ফোর্ট ওয়ার্থে। ফুটবলের বাইরেও শহরটি পরিচিত বিশাল আকারের সবকিছুর জন্য। এখানে কাউবয় সংস্কৃতির ছাপ স্পষ্ট। ফোর্ট ওয়ার্থের পুরনো পশুর হাট ও ঐতিহাসিক এলাকা সেই অতীতের গল্প বলে। বারবিকিউ আর টেক্সাস স্টেকের খ্যাতি বিশ্বজোড়া।
সংস্কৃতির মিলনমেলা
মার্কিন মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে হিউস্টনের নাম অমর। নাসার জনসন মহাকাশ কেন্দ্র এখানে অবস্থিত। মহাকাশচারীদের প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে বহু ঐতিহাসিক অভিযানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এ শহর। খাবারের বৈচিত্র্যও বিস্ময়কর। বিশ্বের নানা দেশের রান্না এখানে পাওয়া যায়।
বারবিকিউয়ের রাজধানী
যদি খাবার ভালোবাসেন, তাহলে কানসাস সিটি আপনার তালিকায় থাকা উচিত। বিশ্বখ্যাত ধোঁয়ায় সেঁকা বারবিকিউ এখানকার পরিচয়। পাশাপাশি জ্যাজ সংগীতের ইতিহাসেও শহরটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
দক্ষিণের প্রাণকেন্দ্র
আটলান্টা আধুনিক দক্ষিণাঞ্চলীয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতীক। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের জন্মস্থান এখানেই। নাগরিক অধিকার আন্দোলনের ইতিহাস জানতে শহরটি গুরুত্বপূর্ণ। বিশাল অ্যাকোয়ারিয়াম ও কোকা-কোলার জাদুঘরও জনপ্রিয়।
আমেরিকার ইতিহাসের পাঠশালা
বোস্টনের রাস্তায় হাঁটলেই ইতিহাসের গন্ধ পাওয়া যায়। আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলনের বহু ঘটনা ঘটেছে এখানে। ফ্রিডম ট্রেইল ধরে হাঁটলে সেই ইতিহাসের অনেক অধ্যায় চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সমুদ্রের তাজা লবস্টার ও ক্ল্যাম চাউডার অবশ্যই চেখে দেখা উচিত।
মার্কিনিদের স্বাধীনতার শহর
মার্কিন স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও সংবিধানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ফিলাডেলফিয়া। ইন্ডিপেনডেন্স হল ও লিবার্টি বেল শহরের প্রধান আকর্ষণ। আর খাবারের কথা উঠলে ফিলি চিজস্টেকের কথা না বললেই নয়।
সূর্য, সমুদ্র আর লাতিন ছন্দ
মায়ামিতে গেলে মনে হবে আপনি যেন যুক্তরাষ্ট্রে নয়, লাতিন আমেরিকার কোনো শহরে এসেছেন। দক্ষিণ সৈকতের সাদা বালু, আর্ট ডেকো স্থাপত্য আর কিউবান সংস্কৃতির প্রভাব শহরটিকে আলাদা করে তুলেছে। বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচও হবে এখানে।
পৃথিবীর রাজধানী!
নিউ ইয়র্ক-নিউ জার্সি। বিশ্বকাপের ফাইনাল হবে এখানেই। স্বাধীনতার মূর্তি, টাইমস স্কয়ার, সেন্ট্রাল পার্ক, ব্রুকলিন সেতু— তালিকা যেন শেষই হয় না। এ শহরে পৃথিবীর প্রায় সব দেশের খাবার পাওয়া যায়। শুধু খেতে খেতেই কয়েক দিন কাটিয়ে দেওয়া সম্ভব।
মেক্সিকোর আত্মা
মেক্সিকান সংস্কৃতির অনেক পরিচিত উপাদানের জন্ম গুয়াদালাহারায়। মারিয়াচি সংগীত, টাকিলা এবং ঐতিহ্যবাহী ঘোড়সওয়ারি সংস্কৃতির সঙ্গে শহরটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ঐতিহাসিক কেন্দ্র, বিশাল বাজার আর রঙিন রাস্তাগুলো মেক্সিকোর প্রাণস্পন্দন অনুভব করার আদর্শ জায়গা।
পাহাড়ঘেরা শিল্পনগরী
উত্তর মেক্সিকোর মনতেরেইয়ে একদিকে আধুনিক শিল্পশহর, অন্যদিকে প্রকৃতির অপূর্ব ভাণ্ডার। শহরের চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়গুলো এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। বিশেষ করে সেরো দে লা সিয়া পর্বতশ্রেণি মনতেরেইয়ের প্রতীক। এখানকার গ্রিল করা মাংস সারা মেক্সিকোতেই বিখ্যাত।
হাজার বছরের রাজধানী
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ হয়েছে মেক্সিকো সিটিতে। ইতিহাস গড়ে এ শহরের ঐতিহাসিক স্টেডিয়াম তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজন করেছে। কিন্তু মেক্সিকো সিটির আসল আকর্ষণ স্টেডিয়ামের বাইরে। একসময় এখানে ছিল অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের রাজধানী তেনোচতিতলান। আজও শহরের কেন্দ্রস্থলে সেই ইতিহাসের ছাপ দেখা যায়। বিশাল জোকালো চত্বর, জাতীয় প্রাসাদ, নৃবিজ্ঞান জাদুঘর— সবই অনন্য। শহর থেকে অল্প দূরে রয়েছে তেওতিহুয়াকান। দুই হাজার বছরের পুরনো এই নগরীর সূর্য ও চন্দ্র পিরামিড আজও বিস্ময় জাগায়। রাস্তার টাকো থেকে শুরু করে অভিজাত রেস্তোরাঁ— খাবারের জগতেও মেক্সিকো সিটির জুড়ি মেলা ভার। বিশ্বকাপের ম্যাচ শেষ হবে। ট্রফি উঠবে কোনো এক অধিনায়কের হাতে। কয়েক সপ্তাহ পর গ্যালারিগুলো আবার নীরব হয়ে যাবে। কিন্তু যারা এ শহরগুলো ঘুরে দেখবেন, তাদের স্মৃতিতে শুধু গোল আর ফলাফল থাকবে না। থাকবে পাহাড়ের চূড়া, সমুদ্রের ঢেউ, শতবর্ষী স্থাপত্য, ধোঁয়া ওঠা বারবিকিউ, রাস্তার টাকো আর অচেনা মানুষের হাসি। ফুটবল হয়তো মানুষকে স্টেডিয়ামে টানে। কিন্তু ভ্রমণই শেখায়, পৃথিবী আসলে কত বড়।
সূত্র: ফিফা ডট কম, রয়টার্স, ইউএসএ টুডে, দ্য টাইমস, বিভিন্ন শহরের সরকারি পর্যটন ওয়েবসাইট, কানাডিয়ান এনসাইক্লোপিডিয়া, ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিস, স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশন।










