নেটওয়ার্কহীন স্বর্গীয় ও নক্ষত্রখচিত এক রাত

এক স্বর্গীয় ও নক্ষত্রখচিত রাতের খোঁজে বান্দরবানের পাহাড়ে আমাদের দল
ইট-পাথরের যান্ত্রিক খাঁচা আর ডিজিটাল স্ক্রিনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেতে আমরা ১০ জন মিলে এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম— হারিয়ে যাব এমন কোথাও, যেখানে মোবাইল ফোনের সিগন্যাল পৌঁছায় না, কিন্তু প্রকৃতির ইশারা বোঝা যায় প্রতি ক্ষণে। আমাদের গন্তব্য ছিল রুমার দুর্গম পথ পেরিয়ে রূপকথার বগা লেক, সুউচ্চ কেওক্রাডং এবং স্নিগ্ধ নীলাচল।
পাহাড়ের বুক চিরে চলে যাওয়া খাড়া আর উঁচু-নিচু পথ ধরে যখন আমাদের চাঁদের গাড়িটি ধুলো উড়িয়ে এগিয়ে চলছিল, তখনো জানতাম না প্রকৃতির কী এক জাদুকরি রূপ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। দুপুরের মাথার ওপর জ্বলজ্বল করা সূর্যের তীব্র তাপে যখন আমরা ক্লান্ত, ঠিক তখনই রাস্তার পাশে দেখা মিলল পার্বত্য অঞ্চলের সবচেয়ে পরিকল্পিত ও পরিচ্ছন্ন গ্রাম ‘মুনলাই পাড়া’র। গাড়ি থামিয়ে আমরা যখন স্থানীয় গাছপাকা তাজা থাই পেঁপে মুখে দিলাম, মনে হলো পাহাড়ের খাঁটি মাটির সবটুকু মিষ্টি আর রস যেন তাতে ঢেলে দেওয়া হয়েছে। রোদের প্রখরতার মধ্যে সেই পেঁপের প্রতিটি কামড় নিমেষেই আমাদের তপ্ত শরীর ও মনকে শীতল করে দিল।আবার যাত্রা শুরু। পাহাড়ি ঝিরির কলকল শব্দ পেরিয়ে যখন আমরা প্রথম বগা লেকের পাড়ে গিয়ে দাঁড়ালাম, মনে হলো কোনো দক্ষ শিল্পীর জীবন্ত ক্যানভাসে পা রেখেছি। পাহাড়ের চূড়ায় নীল জলের সেই রহস্যময় হ্রদ! পানিতে নামার পরপরই ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা—ঝাঁকে ঝাঁকে ছোট মাছ এসে পুরো শরীরে আলতো করে কামড় দিতে শুরু করল। কোনো কৃত্রিম স্পা নয়, যেন প্রকৃতির কোলে বসে এক জাদুকরি বডি থেরাপি! পাহাড়ি হ্রদের ঠান্ডা পানি আর মাছের সেই মায়াবী পরশ নিমেষেই আমাদের পথক্লান্তি ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিল। পেট আর মনকে কিছুটা শীতল করে আমাদের চাঁদের গাড়ি এসে থামল হারমন পাড়ায়। আমাদের গাইড হারুন ভাই দুপুরের খাবারের চমৎকার আয়োজন করে রেখেছিল রজার দাদার মাচাং বাসায়। সম্পূর্ণ পাহাড়ি ঐতিহ্য এবং মাটির খাঁটি সুবাসে ঘেরা সেই দুপুরের খাবারের স্বাদ যেন জিভে আর মনে চিরকাল লেগে থাকার মতো।
জুমের বিশেষ মসলার মেলবন্ধনে তৈরি ঝাল ও ঝোলালো পাহাড়ি বড় দেশি মোরগের মাংস, কচি বাঁশ কোড়ল, মিক্স সবজি, পাহাড়ি কুমড়ো আর জুমের ছোট ছোট বেগুন ভর্তা মুখে এনে দিয়েছিল এক আদিম ও অনন্য স্বাদ। এর সঙ্গে ছিল আদা ও আদা ফুলের ভর্তা। আদা ফুলের সেই অদ্ভুত সুন্দর সুঘ্রাণ আর ঝাঁঝালো স্বাদ পুরো খাবারের রুচিকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। পাহাড়ের চূড়ার হিমশীতল হাওয়া আর মেঘের দেশে বসে রজার দাদার হাতের এই নিখাদ পাহাড়ি ভোজ শুধু আমাদের পেটই ভরায়নি, বরং তাদের সরলতা ও ভালোবাসায় মনটাকেও এক পরম তৃপ্তিতে ভরিয়ে দিয়েছিল। সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে, ঠিক তখনই আমরা দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ পর্বতচূড়া কেওক্রাডং-এ এসে পৌঁছলাম। কিছুক্ষণ বাদেই চারপাশ জুড়ে নেমে এলো আদিম অন্ধকার। পাহাড়ের চূড়ায় কাটানো সেই রাতের অভিজ্ঞতা ছিল এককথায় অপার্থিব।
রাতের কেওক্রাডং যেন এক দূষণহীন পরিষ্কার আকাশে জোনাকির মতো জ্বলজ্বল করতে থাকা অনন্ত নক্ষত্ররাজির মেলা! চোখ মেললেই মনে হচ্ছিল, পুরো আকাশটা যেন এক বিশাল হিরের চাদরে ঢাকা পড়েছে। পাহাড়ের চূড়া বেয়ে বয়ে আসা কনকনে ঠান্ডা বাতাসের প্রতিটি ঝাপটা আমাদের শহরের সব ক্লান্তি ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। নির্জন ও নিঝুম চারপাশে ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক আর নাম না জানা কীটপতঙ্গের বিচিত্র আওয়াজ মিলেমিশে তৈরি করেছিল প্রকৃতির নিজস্ব এক লাইভ কনসার্ট।
পাহাড়ের চূড়ায় আমাদের সবচেয়ে দারুণ অভিজ্ঞতা ছিল মশারির বাঁধনহীন এক নিশ্চিন্ত রাত। কতদিন পর যে মশার চিরচেনা গুঞ্জন আর মশারির ঝামেলা ছাড়া এমন মুক্ত বাতাসে ঘুমাতে পেরেছি, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। ছোট কিন্তু এই মায়াবী অভিজ্ঞতাটি অনেক দিনের জমে থাকা মানসিক ক্লান্তি নিমেষেই দূর করে দিল।
পরদিন ভোরবেলায় পুব আকাশে পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে আসা সূর্যের রাজকীয় আগমন দেখে আমরা রওনা হলাম সুংসাং পাড়ার উদ্দেশে। কেওক্রাডংয়ের কোল ঘেঁষে চরম আঁকাবাঁকা ও ভয়ংকর পথ পেরিয়ে বম নৃগোষ্ঠীর এ পাড়াটিতে যখন পৌঁছালাম, মনে হলো যান্ত্রিকতা থেকে বহু দূরের এক টুকরো স্বর্গে চলে এসেছি। সেখানে আমাদের আপ্যায়ন করা হলো খাঁটি নারকেলের পিঠা, মিষ্টি পাহাড়ি আখ, গাছপাকা ছোট ছোট দেশি পেয়ারা, সুঘ্রাণযুক্ত জুমের বাঙ্গি আর পাহাড়ি বাংলা কলা দিয়ে। তবে এই খাবারের চেয়েও যা আমাদের বেশি ছুঁয়ে গেছে, তা হলো বম জনগোষ্ঠীর নিখাদ আতিথেয়তা। তাদের মাচাং ঘরে বসে পাহাড়ি জীবনের দৈনন্দিন লড়াই, সরলতা আর প্রকৃতির সাথে মিতালির গল্প শোনার প্রতিটি মুহূর্ত ছিল জীবনের এক নতুন শিক্ষা। প্রকৃতির এত বৈরী পরিবেশেও তাদের মুখের অমলিন হাসি আমাদের জীবনকে নতুন করে ভালোবাসতে শিখিয়েছে।
ভ্রমণের শেষ বিকালে আমাদের এই রোমাঞ্চের সঙ্গে স্নিগ্ধতার চূড়ান্ত ছোঁয়া যোগ করল ‘নীলাচল’। মেঘের দেশ হিসেবে পরিচিত এই পাহাড়ের চূড়া থেকে পুরো বান্দরবান শহরকে পাখির চোখে দেখা যায়। বিশেষ করে গোধূলিলগ্নে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে সূর্যের অস্ত যাওয়া এবং মেঘ-পাহাড়ের রঙ পরিবর্তনের সেই দৃশ্য ছিল এক অপার্থিব, মোহনীয় রূপ।
এক রাতের সেই নেটওয়ার্কহীন নির্জনতা আমাদের একে অপরের আরও কাছাকাছি এনে দিয়েছিল। যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল থেকে দূরে, প্রকৃতির এ অকৃত্রিম সান্নিধ্য এবং পাহাড়ের এই ভ্রমণলিপি আমাদের স্মৃতির মণিকোঠায় জমা থাকবে আজীবন।






