মানবসভ্যতার পতনের সাক্ষী হবে ‘আর্থস ব্ল্যাক বক্স’

শিল্পীর কল্লনায় পৃথিবীর ব্ল্যাকবক্স। ছবি: আর্থস ব্ল্যাকবক্স
দীর্ঘ পাঁচ বছরের রহস্যময় নীরবতা ভেঙে অবশেষে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে মানবসভ্যতার পতনের সাক্ষী হতে যাওয়া অবিনাশী ‘আর্থস ব্ল্যাক বক্স’। ২০২১ সালে গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের কপ২৬ জলবায়ু সম্মেলনের সময় প্রথম এই মেগা-প্রজেক্টের ঘোষণা দিয়ে বিশ্বজুড়ে হইচই ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
এরপর প্রজেক্টটি নিয়ে কোনো আপডেট না থাকায় এবং এর অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম পেজে কেবল কয়েকটি কালো টাইলের ছবি ছাড়া আর কিছুই পোস্ট না করায় অনেকেই এটিকে কেবলই একটি প্রচারণামূলক স্ট্যান্ট বলে ধরে নিয়েছিলেন।
সব সংশয় উড়িয়ে দিয়ে এই প্রকল্পের আর্ট ডিরেক্টর জনাথন নিবোন নিশ্চিত করেছেন যে, বিগত পাঁচ বছর ধরে এর ডিজাইন, ডেটা স্টোরেজ সিস্টেম এবং ওয়েব প্ল্যাটফর্মের ক্রমাগত উন্নয়ন করা হচ্ছিল।
এটি এখন ‘আর্থস ব্ল্যাক বক্স ফাউন্ডেশন’ নামক একটি নিবন্ধিত দাতব্য সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে এবং আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই এটি চূড়ান্তভাবে স্থাপন করা হবে।
অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়ার একটি প্রত্যন্ত এবং দুর্গম ওয়েস্টার্ন এয়ারফিল্ডের পাশে, কুইন্সটাউনের কাছাকাছি এই বিশাল মনোলিথটি স্থাপন করা হচ্ছে।
প্রজেক্টের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এই ১৬ মিটার দীর্ঘ এবং ৪ মিটার উঁচু অত্যন্ত মজবুত স্টিলের তৈরি কাঠামোর ওপরের অংশটি সম্পূর্ণ গ্লাস দিয়ে ঢাকা সোলার প্যানেল দ্বারা আবৃত থাকবে, যা একে নিরবচ্ছিন্নভাবে সচল রাখবে।
ওয়েস্ট কোস্ট কাউন্সিলের মেয়র শেন পিট জানান, গ্লেসিয়ার বা হিমবাহ দ্বারা গঠিত তাসমানিয়ার এই দুর্গম ও পাথুরে অঞ্চলটিকে এর ভূতাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে বেছে নেওয়া হয়েছে।
এই স্থানটি যেকোনো বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত এবং ভবিষ্যতে এটি একটি বড় পর্যটন আকর্ষণ হিসেবেও ভূমিকা রাখবে।
উড়োজাহাজের ককপিট বা ফ্লাইট রেকর্ডারের ধারণার ওপর ভিত্তি করেই এই ব্ল্যাক বক্সটি তৈরি করা হচ্ছে, যা ক্র্যাশ-প্রুফ কেসিংয়ের ভেতর তথ্য জমা রাখে।
কাকতালীয়ভাবে, ১৯৫৪ সালে মেলবোর্নের একটি সরকারি গবেষণাগারে প্রথম ব্ল্যাক বক্সের প্রোটোটাইপ তৈরি করেছিলেন একজন অস্ট্রেলীয় বিজ্ঞানীই।
পৃথিবীর এই নিজস্ব ব্ল্যাক বক্সটির কাজ হবে মানবজাতির জলবায়ু ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিটি পদক্ষেপের হিসাব রাখা। এর ডিজিটাল হার্ডড্রাইভগুলো ২০২১ সাল থেকেই কপ২৬ সম্মেলনের ডেটা সংগ্রহ করা শুরু করেছে, যা পরবর্তীতে মূল ফিজিক্যাল বক্সে স্থানান্তর করা হবে।
গ্রহের স্বাস্থ্যের সাথে সম্পর্কিত শত শত ডেটাসেট, পরিমাপ এবং মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের তথ্য এখানে ক্রমাগত সংগ্রহ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদে সংরক্ষণ করা হবে।
এই প্রজেক্টটির মূল পরিকল্পনাকারী কোনো বিজ্ঞানী দল নয়, বরং ‘রাউজার ল্যাব’ নামক অস্ট্রেলিয়ার একটি অলাভজনক পরীক্ষামূলক পরিবেশগত যোগাযোগ সংস্থা। এই প্রজেক্টের সাথে যুক্ত আছে আর্ট ও ডিরেক্টিং কালেক্টিভ ‘দ্য গ্লু সোসাইটি’ এবং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘রিভলভার’।
শুরুতে এর সাথে যুক্ত থাকলেও পরবর্তীতে ‘ইউনিভার্সিটি অব তাসমানিয়া’ এই প্রজেক্ট থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে এবং রাউজার ল্যাবের ওয়েবসাইট থেকে তাদের নাম সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করেছে।
রাউজার ল্যাব আরও জানিয়েছে যে, তাদের জলবায়ু বিষয়ক বিভিন্ন উদ্যোগ বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪০০ কোটি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
তারা ‘টেকনো-অবলিস্ক’ নামের আরও একটি মহাকাশ প্রজেক্টের পরিকল্পনা করছে, যা মহাশূন্যে অবিরাম জলবায়ু সংকটের সংকেত পাঠাবে।
বিশ্বের বর্তমান জলবায়ু পরিস্থিতি কতটা ভয়ানক, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে অ্যান্টার্কটিকার পশ্চিম উপকূলে ফ্রান্সের সমান বিশাল আয়তনের সামুদ্রিক বরফ নিখোঁজ হওয়া এবং তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার ঘটনায়।
এছাড়া, বিশ্ব ধ্বংসের প্রতীকী ঘড়ি ‘ডুমসডে ক্লক’ বর্তমানে মধ্যরাত বা কেয়ামতের মাত্র ৮৫ সেকেন্ড আগে অবস্থান করছে, যা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়।
শেষ পর্যন্ত এই ব্ল্যাক বক্সটি কি ভবিষ্যৎ কোনো উন্নত বা ভিনগ্রহের সভ্যতার জন্য মানুষের ধ্বংসের ইতিহাস ঘাঁটার দলিল হয়ে থাকবে, নাকি মানুষ নিজে সচেতন হয়ে পৃথিবীকে রক্ষা করবে এবং এই বিশাল মনোলিথটি কেবলই একটি পরাজয় এড়ানোর স্মারক হিসেবে টিকে থাকবে, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে বর্তমান মানবজাতির ওপর।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান




