ভার্চুয়াল দুনিয়ায় মহারণ: ভিডিও গেমে ‘ক্যাপিটাল শিপ’ ধ্বংস, লাখো পাউন্ডের আর্থিক ক্ষতি!

জেমস হাজার হাজার ঘণ্টা ব্যয় করেছেন ইভ অনলাইন গেমে। ছবি: বিবিসি
টানা কয়েক রাত জেমস কানিংহামের চোখে কোনো ঘুম ছিল না। কম্পিউটারের কিবোর্ড আর মাউস হাতে নিয়ে স্ক্রিনের সামনে বসে একটানা ‘নিজের জীবন বাঁচানোর’ লড়াই করে যাচ্ছিলেন ২৭ বছর বয়সী এই তরুণ। যুক্তরাজ্যের হার্টফোর্ডশায়ারের ওয়ার এলাকার বাসিন্দা জেমস আসলে বাস্তব কোনো যুদ্ধ নয়, বরং একটি ভার্চুয়াল সাম্রাজ্যকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে লড়ছিলেন।
২০২৫ সালের জুন মাসে হঠাৎ করেই ফেটে পড়া এই যুদ্ধ নিয়ে জেমস বলেন, “আমি ভাবতেও পারিনি সবকিছু এভাবে এক নিমেষে ওলটপালট হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতাই ছিল এমন।”
বিশ্বখ্যাত সায়েন্স-ফিকশন গেম ‘ইভ অনলাইন’-এর পেছনে জেমস এ পর্যন্ত হাজার হাজার ঘণ্টা (দিনে প্রায় ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত) সময় এবং প্রায় ৬ হাজার পাউন্ড (বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৯ লক্ষাধিক টাকা) খরচ করেছেন।
বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ এই গেমটি খেলেন। তবে গত বছর এই গেমের ইতিহাসে এমন এক বিধ্বংসী ও ব্যয়বহুল অধ্যায় তৈরি হয়েছে, যা গেমারদের বাস্তব জীবনেও বড় ধরণের আর্থিক ধাক্কা দিয়েছে। বছর শেষে দেখা যায়, খেলোয়াড়দের লাখ লাখ পাউন্ড মূল্যের ভার্চুয়াল সম্পদ মহাকাশের অতল গহ্বরে চিরতরে হারিয়ে গেছে।
ইভ অনলাইন: এক অদ্ভুত ও জটিল মহাবিশ্ব
২০০৩ সালে যাত্রা শুরু করা এই গেমটি মূলত মহাকাশের একটি কাল্পনিক জগৎ নিয়ে তৈরি। এখানে খেলোয়াড়রা মুক্ত পাইলট হিসেবে ঘুরে বেড়াতে পারেন। গেমটির কোনো নির্দিষ্ট বা তৈরি করা গল্প নেই; খেলোয়াড়রাই তাদের নিজেদের গল্প তৈরি করেন।
এখানে খেলোয়াড়রা দলবদ্ধ হয়ে ‘কর্পোরেশন’ (যা বেসরকারি সামরিক বাহিনী বা শিপিং কোম্পানির মতো কাজ করে) এবং পরবর্তীতে একাধিক কর্পোরেশন মিলে বিশাল ‘অ্যালায়েন্স’ বা জোট গঠন করে। এই জোটগুলো বছরের পর বছর ধরে জটিল সামরিক ও শিল্প কার্যক্রম পরিচালনা করে। সম্পদ এবং সীমানা সীমিত হওয়ায় এদের মধ্যে প্রায়ই যুদ্ধ বেধে যায়।
অনেকে একে ঠাট্টা করে ‘স্প্রেডশিট স্টিমুলেটর’ বলেন, কারণ এর গেমপ্লে অত্যন্ত ধীরগতির ও কৌশলগত। মানচিত্র, চার্ট এবং তথ্য বিশ্লেষণ করে এখানে যুদ্ধজাহাজ পরিচালনা করতে হয়।
বাস্তব টাকার খেলা ও স্থায়ী ক্ষতি: এই গেমের প্রতিটি জিনিস- স্পেস স্টেশন থেকে শুরু করে বিশাল যুদ্ধজাহাজ সবকিছু খেলোয়াড়রা নিজেরাই তৈরি করেন। এগুলো তৈরি করতে শত শত ঘণ্টা সময় লাগে। তবে গেমের ভেতরে আইসল্যান্ডিক ডেভেলপার কোম্পানি 'ফেনরিস ক্রিয়েশনস'-এর কাছ থেকে বাস্তব অর্থ দিয়েও সম্পদ কেনা যায়।
উদাহরণস্বরূপ, গেমের একটি বিশাল ‘টাইটান-ক্লাস’ জাহাজের মূল্য প্রায় ৭৪১ পাউন্ড। ইভ অনলাইনের অর্থনীতি এতটাই জটিল যে, ২০২৫ সালে আইসল্যান্ডের সেন্ট্রাল ব্যাংকের একজন সাবেক অর্থনীতিবিদকে এই গেমের আর্থিক ব্যবস্থা তদারকি করার জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
তবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় হলো, যুদ্ধে যদি কোনো জাহাজ বা সম্পদ ধ্বংস হয়ে যায়, তবে তা চিরতরে শেষ! বাস্তব টাকা দিয়ে কেনা সম্পদ সেকেন্ডের মধ্যে হাওয়া হয়ে যায়।
যুদ্ধের পটভূমি এবং মহাকাব্যিক অ্যাম্বুশ
২০২৫ সালের এই মহাযুদ্ধ এক রাতে শুরু হয়নি। ২০২০ সালে একটি যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই মূলত এই ক্ষোভের সূত্রপাত। সে সময় ‘দ্য ম্যাসাকার অ্যাট’ নামের একটি যুদ্ধ একটানা ১৪ ঘণ্টা চলেছিল, যেখানে ২ লক্ষ ৮০ হাজার পাউন্ডের বেশি সম্পদ ধ্বংস হওয়ায় সেটি গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড বুকে নাম লেখায়। এরপর থেকেই দলগুলোর মধ্যে একটি ‘শীতল যুদ্ধ’ বা কোল্ড ওয়ার চলছিল।
এই সময়ে জেমস কানিংহাম গেমের অন্যতম বৃহত্তম জোট ‘প্যান্ডেমিক হোর্ড’-এর ফ্লিট কমান্ডার (নৌবহর প্রধান) হিসেবে পদোন্নতি পান। হাজার হাজার খেলোয়াড়কে রিয়েল-টাইমে যুদ্ধক্ষেত্রে নির্দেশনা দেওয়া জেমসের জন্য ছিল অত্যন্ত মানসিক চাপের। তিনি বলেন, “এটি বাস্তব জীবনের চেয়েও বেশি চাপ সৃষ্টি করত।”
শীঘ্রই জেমস লক্ষ্য করেন, তাদের দীর্ঘদিনের শত্রু জোট ‘দ্য ইম্পেরিয়াম’ তাদের ঘাঁটির দিকে ধেয়ে আসছে। ইম্পেরিয়াম প্রায় ৫০ লাখ পাউন্ড মূল্যের বিপুল যুদ্ধ সরঞ্জাম নিয়ে মহাকাশ পাড়ি দিয়ে এই আক্রমণ চালায়। গেমের ইতিহাসে এটিকে সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী সামরিক অভিযান হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধ এতটাই তীব্র রূপ নেয় যে, অনেক খেলোয়াড় বাস্তব জীবনে তাদের অফিস থেকে অসুস্থতার অজুহাতে ছুটি নেন। জেমস নিজেও বিভিন্ন টাইম জোনের খেলোয়াড়দের সামলানোর জন্য নিজের ঘুমের সময় পরিবর্তন করেন।
‘দ্য ওয়ার অফ রুজেস’ এবং একটি সাম্রাজ্যের পতন
২০২৫ সালের জুনে শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের নাম দেওয়া হয় ‘দ্য ওয়ার অফ রুজেস’। রকেটের আলো আর স্পেস স্টেশনের বিস্ফোরণে ভার্চুয়াল মহাকাশ নীল আর কমলায় রূপ নেয়। জেমস বলেন, “আমি সবসময় আতঙ্কে থাকতাম যে আমার একটি ভুল সিদ্ধান্তের কারণে হয়তো ৫০ হাজার পাউন্ড মূল্যের সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাবে।”
এই যুদ্ধে জেমসের জোট ‘প্যান্ডেমিক হোর্ড’ পিছু হটতে বাধ্য হয়। কিন্তু বিপর্যয় সেখানেই শেষ হয়নি। এর কয়েক মাস পর, প্যান্ডেমিক হোর্ডের ১০ বছরের পুরনো প্রধান নেতা আকস্মিকভাবে পদত্যাগ করেন এবং নতুন নেতৃত্ব জোটটিকে মহাকাশের অন্য প্রান্তে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে শত্রু পক্ষ দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা তাদের ওপর বোমাবর্ষণ শুরু করে।
এই ভয়াবহ পরাজয়ের ধাক্কা সামলাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ‘প্যান্ডেমিক হোর্ড’ জোটটি সম্পূর্ণ ভেঙে যায়। জেমস তার বড় সম্পদগুলো বাঁচাতে পারলেও প্রায় ২০০ পাউন্ডের ক্ষতি স্বীকার করেন। তবে অন্যরা হারিয়েছেন হাজার হাজার পাউন্ড।
ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান
বিবিসি-র কাছে তথ্য পাঠানো এক গেমারের স্প্রেডশিট অনুযায়ী, এই যুদ্ধে প্রায় সাত লাখ পাউন্ডের ভার্চুয়াল সম্পদ ধ্বংস হয়েছে। তবে গেম ডেভেলপার ফেনরিস ক্রিয়েশনসের মতে, এই ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক চার লাখ পাউন্ড (আনুমানিক ৬ কোটি টাকা)।
মজার ব্যাপার হলো, এই ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ফলে খেলোয়াড়রা নতুন করে সম্পদ কিনতে বাধ্য হন। যার ফলে ২০২৫ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসটি ছিল এই গেমের ২৩ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রাজস্ব আয়ের মাস।
প্যান্ডেমিক হোর্ডের পতনের পর জেমসের ভার্চুয়াল চাকরি এবং ঘরবাড়ি দুটোই হারিয়ে যায়। তিনি বলেন, “এটি এমন ছিল যেন আপনি প্রতিদিন যেখানে লগ-ইন করতেন, যেখানে আপনার বন্ধুরা থাকত, সেই পুরো এলাকাটাই একদিন সকালে উঠে দেখলেন গায়েব হয়ে গেছে।”
জোটটি ভেঙে যাওয়ার পর হাজার হাজার বন্ধু ও গেমার মহাকাশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছেন এবং অনেকের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
গেমটির ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর বার্গুর ফিনবোগাসন এই ঘটনাকে একটি ‘রিসেট’ বা নতুন সূচনা হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “হঠাৎ করেই ৪০ হাজার মানুষ গৃহহীন এবং নেতৃত্বহীন হয়ে পড়েছিল। তবে এখন সেই জায়গায় ছোট ছোট নতুন গ্রুপ বা জোট গড়ে উঠছে।”
জেমস কানিংহাম এখন ইভ অনলাইনে সময় কমিয়ে দিয়েছেন। তিনি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন, ঠিকমতো ঘুমাচ্ছেন এবং একটি ছোট জোটে যোগ দিয়ে শান্তিতে খেলছেন। যুদ্ধের সেই বিনিদ্র রজনীগুলো তিনি মিস না করলেও, মাসের পর মাস ধরে পরিকল্পনা করা যুদ্ধকৌশলগুলো সফলভাবে বাস্তবায়ন করার সেই রোমাঞ্চকর মুহূর্তগুলো তিনি ঠিকই মিস করেন।
ইভ অনলাইনের পরবর্তী অধ্যায়ে কী ঘটতে যাচ্ছে তা এখনো অজানা, তবে পুরো গেমার বিশ্ব এখন গভীর আগ্রহ নিয়ে এই ভার্চুয়াল মহাবিশ্বের দিকে তাকিয়ে আছে।




