জলের পাথরে আগুন জ্বলে

সাগরের গভীর থেকে যান্ত্রিক হাত তুলছে পাথর। ছবি: উডস হোল ওশানোগ্রাফিক ইনস্টিটিউট
গভীর সাগরে লুকিয়ে থাকা পাথরেও যে আগুন জ্বলে উঠতে পারে, তা আমরা কয়জনইবা ভাবতে পারি। কিন্তু এমনটাই ঘটেছে। লিখেছেন জেমাম আহমেদ
সেদিন গবেষণাগারে কেউ কল্পনাও করেনি, টেবিলের পাথরই তাদের চমকে দেবে। সমুদ্রের অতল থেকে আনা নমুনাগুলো তখন গুঁড়া করা হচ্ছিল। চারদিকে নীরবতা। হঠাৎ একটি নমুনা গরম হতে শুরু করল। তাপ বাড়তে বাড়তে পেরিয়ে গেল ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তারপর দপ করে জ্বলে উঠল আগুন। কেউ দেশলাই ধরায়নি। বাইরের কোনো শিখাও ছিল না। পাথর নিজেই নিজের অগ্নি অস্তিত্ব তৈরি করেছিল।
ঘটনাটি ২০২২ সালের। প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে ওরেগন ও ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলের কাছে আছে এসকানাবা ট্রফ নামে এক অন্ধকার খাদ। সেখানে সমুদ্রতলের তপ্ত ঝরনা যুগের পর যুগ ধরে জমিয়েছে তামা, দস্তা আর লোহার ভাণ্ডার। সেই ভাণ্ডারের খোঁজেই গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের অভিযাত্রী দল। সহযোগী ছিল যুক্তরাষ্ট্রের আরও দুটি সংস্থা বোয়েম ও নোয়া। দলের হাতিয়ার ছিল জেসন নামের এক রিমোটচালিত যান।
অন্ধকার গভীরে নেমে সেটি তুলে আনল ৫৭টি নমুনা। চারটি আলাদা এলাকা থেকে সংগ্রহ করা হয় সেগুলো। বেশির ভাগের মূল উপাদান ধাতব সালফাইড। দেখতে সাধারণ পাথর। ভেতরে কী লুকিয়ে আছে, তা তখনো কেউ জানত না। নমুনাগুলো এলো গবেষণাগারে। প্রথমে শুষ্ক করা হলো। এরপর শুরু হলো গুঁড়া করার পালা। তখনই ঘটল সেই অবিশ্বাস্য ঘটনা। ৫৭টির মধ্যে দুটি নমুনা আপনাআপনি জ্বলে উঠল। সম্পূর্ণ জারিত হয়ে মূল রূপ হারাল সেগুলো। আগুন নিভল। কিন্তু প্রশ্ন নিভল না। পাথর আগুন ধরায় কীভাবে?
জ্বলে ওঠা পাথরগুলো গড়া ছিল অতি সূক্ষ্ম ন্যানো আকারের মার্কাসাইটে। অক্সিজেনের সামনে এই খনিজ ভীষণ অস্থির
গবেষকরা প্রথমে সন্দেহ করলেন তেল বা আলকাতরাকে। গভীর সমুদ্রে পলি জমলে তাপের প্রভাবে পেট্রোলিয়াম তৈরি হতে পারে। সেটি পাথরের ভেতরে লুকিয়ে থেকে ডাঙায় এসে গরম হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু পরীক্ষায় দেখা গেল, দোষী অন্য কেউ। তার নাম মার্কাসাইট। এটি লোহা সালফাইডের এক রূপ। জ্বলে ওঠা পাথরগুলো গড়া ছিল অতি সূক্ষ্ম ন্যানো আকারের মার্কাসাইটে। অক্সিজেনের সামনে এই খনিজ ভীষণ অস্থির। সমুদ্রের তলায় অক্সিজেন প্রায় নেই। সেখানে মার্কাসাইট ঘুমিয়ে থাকে। ওপরে আনলেই সব বদলে যায়। বাতাসের অক্সিজেন তাকে ঘিরে ধরে। ভাঙলে, গুঁড়া করলে বা ঘষলে সেই বিক্রিয়া আরও শক্তি পায়। পাথর তখন নিজেই তাপ তৈরি করে। সেই তাপ আবার বিক্রিয়াকে গতি দেয়। চক্র ঘুরতে ঘুরতে একসময় ধরে যায় আগুন।
এই আবিষ্কার ছাপা হয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্টিফিক রিপোর্টসে। কিন্তু এটি শুধু বিস্ময়ের গল্প নয়; এক সতর্কবার্তাও। কারণ, সাগরতলে এখন সোনার খোঁজে নামার প্রস্তুতি চলছে। সালফাইড খনিজে মেলে সোনা, রুপা, তামা আর দস্তা। আন্তর্জাতিক সমুদ্রতল কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে অনুসন্ধানের অনুমতি দিয়েছে। উত্তর মধ্য আটলান্টিক ও দক্ষিণ-পশ্চিম ভারত মহাসাগরের দুটি শৈলশিরায় চলছে খোঁজ। খনন এখনো শুরু হয়নি। কিন্তু সেই পথে এগোনোর আয়োজন চলছে। এবার ভাবুন একটি জাহাজের কথা। মাঝসমুদ্রে সেটি টন টন সালফাইড পাথর নিয়ে ভেসে চলেছে। চারদিকে শুধু জল আর আকাশ। নিচের খোলে নীরবে জমছে তাপ। কেউ টের পাচ্ছে না। তারপর হঠাৎ আগুন। গবেষকরা ঠিক এই আশঙ্কার কথাই বলছেন।
তাদের মতে, এমন তাপজনিত বিক্রিয়া জাহাজে দ্রুত অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়ে দিতে পারে। ইউএসজিএস একে বলছে সম্ভাব্য বিপদ। খনন এগোলে এটিকে আলাদা গুরুত্ব দিতে হবে। স্থলের খনির সঙ্গে সমুদ্রতলের খনি এক নয়। সেখানে চাপ আলাদা। তাপমাত্রা আলাদা। আর্দ্রতা আলাদা। পাথর যখন সেই পরিবেশ ছেড়ে ডেকে ওঠে, তখন বদলে যায় তার চরিত্র। এসব পরিবর্তনে খনিজ কতটা তাপ ছাড়বে, তা আগে থেকে বলা কঠিন। তবে সমুদ্রতলের প্রতিটি পাথর বিপজ্জনক নয়। মার্কাসাইট থাকলেই আগুন লাগবে, এমনও নয়। ৫৭টির মধ্যে জ্বলেছে মাত্র দুটি। তবু একটিই যথেষ্ট, যদি সেটি থাকে জাহাজের খোলে। এই গবেষণার আসল শক্তি তাই সতর্কতায়। আছে আরেকটি উদ্বেগও। পরিবেশবিদরা আগেই সতর্ক করেছেন। গভীর সমুদ্রের জীবজগৎ এমনিতেই বিপন্ন। খনির যন্ত্র নামলে সেই নীরব জগৎ কেঁপে উঠবে। এখন যোগ হলো আগুনের ভয়। এসকানাবা অভিযানের প্রধান ছিলেন ইউএসজিএসের সমুদ্রবিজ্ঞানী অ্যামি গার্টম্যান। হাতের লেন্সে তিনি পরখ করেছিলেন সমুদ্রতলের খনিজ নমুনা। সেই পরখই আজ খুলে দিল এক অজানা অধ্যায়। সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট



