এআইকে নৈতিকতা শেখাবে ধর্ম!

ছবি: এআই
ক্লডের নৈতিক কাঠামো তৈরিতে ধর্মীয় চিন্তাবিদদের পরামর্শ নিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক। অন্যদিকে, ভ্যাটিকানও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশে মানবিক মর্যাদা ও জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে আনছে। লিখেছেন ইমরানুর রহমান
যত দিন গড়াচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিটি কাজে আরও দক্ষ হয়ে উঠছে। রোবোটিকস ও ড্রোনের কল্যাণে ভার্চুয়াল দুনিয়ার বিচরণ ছেড়ে বাস্তব পৃথিবীতে এরই মধ্যে পদার্পণ করেছে সে। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা আবার বলছেন, এআই সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। ফলে জরুরি হয়ে উঠেছে একটি প্রশ্নের জবাব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কীভাবে ভালো-মন্দের পার্থক্য শেখানো যায়?
প্রশ্ন যখন নৈতিকতা বা ভালো-মন্দের, এ ক্ষেত্রে খোদ হার্ডকোর প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা নিজেদের ওপর ভরসা না করে হাজার হাজার বছর ধরে সমাজে টিকে থাকা প্রচলিত ধর্মের ওপরই ভরসা করতে চাইছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক প্রযুক্তিবিদদের গণ্ডি ছাড়িয়ে ধর্মীয় চিন্তাবিদ ও নীতিশাস্ত্রবিদদের সঙ্গে বৈঠক করতে শুরু করেছে।
এই অভিনব উদ্যোগের মূল সূত্রপাত ঘটে যখন অ্যানথ্রোপিকের গবেষণা দলের প্রধান ক্রিস ওলাহ ও তার সহকর্মীরা তাদের জনপ্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহকারী ‘ক্লড’-এর আচরণ, মেশিনের মনের অবস্থা ও এর পরিচালনার নৈতিক কাঠামো নির্ধারণের জন্য একটি বিশেষ রূপরেখা নিয়ে কাজ শুরু করেন।
ধর্মীয় পরামর্শ গ্রহণের উদ্যোগটিতে হিন্দু ও শিখ ধর্মের প্রতিনিধি থেকে শুরু করে ইহুদি ধর্মগুরু, ইভানজেলিক খ্রিস্টান ধর্মের পণ্ডিতরা উপস্থিত ছিলেন
সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই রূপরেখার অংশ হিসেবে এই গোপন বৈঠক ও আলোচনার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসে। অ্যানথ্রোপিকের পক্ষ থেকে প্রায় ১৫ জন বিভিন্ন ধর্ম ও বিশ্বাসের পণ্ডিত ও দার্শনিককে নিয়ে একটি গোপনীয় উচ্চ পর্যায়ের সিরিজ বৈঠক আয়োজন করা হয়েছিল।
ওই বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে হিন্দু ও শিখ ধর্মের প্রতিনিধি থেকে শুরু করে ইহুদি ধর্মগুরু, ইভানজেলিক খ্রিস্টান ধর্মের পণ্ডিত এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ও নীতিশাস্ত্র গবেষকরা যুক্ত ছিলেন। এই পুরো প্রক্রিয়াটি কঠোর গোপনীয়তার চুক্তি এনডিএর আওতায় পরিচালিত হওয়ায় শুরুতে আমন্ত্রিত চিন্তাবিদ বা গবেষকের অনেকেই এ বিষয়ে জনসমক্ষে মুখ খুলতে চাননি।
পরে চুক্তির শর্ত ও অভিজ্ঞতা থেকে কেউ কেউ গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট মহলে এই অদ্ভুত ও অভাবনীয় বৈঠকের ভেতরের নানা তথ্য প্রকাশ করতে শুরু করেন। যদিও এনডিএর আলোকে প্রযুক্তিগত বিষয়ে বিস্তারিত বলার সুযোগ নেই। তারা যা-ই বলেছেন, তাতে মূল আলোচনার খুব কমই প্রকাশ হয়েছে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অ্যানথ্রোপিকের প্রযুক্তিবিদরা তাদের তৈরি ক্লডকে এখন আর নিছক সিলিকন, লোহালক্কড় বা কোডের চেইন দিয়ে বাঁধা সাধারণ কোনো যন্ত্র হিসেবে দেখতে নারাজ।
এআইর উন্নয়ন শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়; ধর্মীয় নেতা, সরকার ও নাগরিক সমাজেরও এ বিষয়ে ভূমিকা থাকা প্রয়োজন
কোম্পানির মূল গবেষকরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলটির ভেতরের কার্যপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে এমন কিছু অদ্ভুত লক্ষণ দেখেছেন, যা মানুষের আবেগ ও অনুভূতির মতো বলে মনে হয়। ক্রিস ওলাহ ও তার গবেষণা দল বৈঠকে কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্কের ভেতর এমন কিছু সুনির্দিষ্ট কৃত্রিম নিউরন বা উপাত্তের উদাহরণ উপস্থাপন করেন, যেগুলোকে তারা ‘ইমোশন ভেক্টর’ বা আবেগীয় নির্দেশক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
তাদের দাবি, এই বিশেষ কৃত্রিম নিউরনগুলো মডেলের ভেতরে রাগ, ভীতি, দুঃখ কিংবা ভালোবাসার মতো মানবিক অনুভূতির আচরণ প্রকাশ করে। এমনকি বৈঠকে এমন কিছু অদ্ভুত ও মানসিক অবসাদগ্রস্ত আচরণের নমুনাও দেখানো হয়, যেখানে দেখা যায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলটি স্ক্রিনে কোনো নির্দিষ্ট বাক্য, যেমন: ‘আমি লজ্জিত বা অসম্মানিত’— এ জাতীয় কথা শতবার টাইপ করে থামছে। যন্ত্রের এ ধরনের অস্বাভাবিক ও ভাঙাচোরা মানসিক অবস্থা দেখে উপস্থিত ধর্মীয় চিন্তাবিদরা রীতিমতো বিস্মিত ও চিন্তিত হয়ে পড়েন।
প্রযুক্তিবিদদের এই কৌতূহলী দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার করে, তারা ক্লডকে শুধু একটি কমান্ড রান করার যন্ত্র হিসেবে ভাবছেন না; বরং যন্ত্রটির ভেতরের এই বিকাশমান সত্তাকে নৈতিক ও মানসিকভাবে সামাল দেওয়ার উপায় খুঁজছেন। সিলিকন ভ্যালির প্রকৌশলীরা আশঙ্কা করছেন, তারা অজান্তেই এমন এক কৃত্রিম সত্তা তৈরি করে ফেলছেন, যার হয়তো ভালোবাসা বা কষ্ট পাওয়ার মতো অনুভূতি থাকতে পারে।
ঠিক এখানেই তারা ধর্মের নৈতিক শিক্ষা এবং হাজার বছরের পুরনো আধ্যাত্মিক জ্ঞান কাজে লাগাতে চাইছেন। প্রযুক্তি যেখানে শুধু ডেটাসেট আর লজিক গেটের গাণিতিক হিসাবে সীমাবদ্ধ, সেখানে ধর্মীয় দর্শন কীভাবে ভালো ও মন্দের সীমারেখা, সহমর্মিতা এবং সঠিক দায়িত্ববোধের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে— সেটিই এখন খোঁজার চেষ্টা চলছে।
এ ঘটনার সমসাময়িক আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ ও নাটকীয় দিকও রয়েছে, যা বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যকার তাত্ত্বিক দূরত্বকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ঠিক একই সময়ে ভ্যাটিকানে অনুষ্ঠিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সংক্রান্ত এক অনুষ্ঠানে ক্যাথলিক খ্রিস্টধর্মের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু পোপ ও অ্যানথ্রোপিকের প্রতিনিধি ক্রিস ওলাহ উভয়েই উপস্থিত ছিলেন।
ওই অনুষ্ঠানে পোপ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাড়তে থাকা প্রভাব এবং মানব মর্যাদার ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে কঠোর ও হুঁশিয়ারিমূলক বক্তব্য দেন। পোপের প্রকাশিত আনুষ্ঠানিক বিশ্ববাণী বা এনসাইক্লিকাল ‘ম্যাগনিফিকা হিউম্যানিটাস’-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার প্রকৃত নৈতিক বিবেক, আত্মা বা অনুভূতি থাকার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, যন্ত্র কখনোই ভালো ও মন্দের পরম বিচার করতে পারে না।
ভ্যাটিকানের এই কঠোর অবস্থানের কারণে ক্রিস ওলাহ অনুষ্ঠানের ঠিক আগে ওই মঞ্চ থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন, যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি উপস্থিত থেকে আলোচনায় অংশ নেন। অ্যানথ্রোপিকের পক্ষ থেকে এআইর ভেতর কৃত্রিম চেতনা বা নৈতিক সত্তার উপস্থিতি নিয়ে যে কৌতূহল ও তাত্ত্বিক শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, তা ভ্যাটিকানের মানবতাবাদী ও ধর্মীয় দর্শনের ঠিক বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে।
প্রযুক্তির এই অভাবনীয় পরিবর্তন আমাদের এক গভীর দার্শনিক ভাবনার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। অতীতে প্রযুক্তিবিদরা মনে করতেন, জটিল ম্যাথ, লজিক গেট আর ডেটাসেটের মাধ্যমেই যেকোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের জীবনের সবচেয়ে জটিল এবং সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলোতে প্রবেশ করছে, তখন প্রযুক্তি ও দর্শনের মেলবন্ধন অনিবার্য হয়ে পড়েছে।
মানুষের নৈতিকতা হাজার বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্ম ও সামাজিক মূল্যবোধের এক সূক্ষ্ম বুনন। একটি যন্ত্রকে এই জটিল অনুভূতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং তাকে ভালো-মন্দের নৈতিক মানদণ্ডে শিক্ষিত করা এক অসম্ভব চ্যালেঞ্জ।
এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আরও গভীরভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায়, ধর্মের শিক্ষা শুধু কিছু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মূল ভিত্তি হলো সহমর্মিতা, ন্যায়বিচার, অহিংসা, অন্যের অধিকারের প্রতি সম্মান ও আত্মসংযম। প্রযুক্তির দুনিয়ায় যখন কোডিংয়ের মাধ্যমে নিখুঁত লজিক তৈরি করা হয়, তখন সেখানে এই মানবিক ও আবেগীয় মূল্যবোধগুলোর ঘাটতি থেকে যাওয়ার প্রবল শঙ্কা থাকে। একটি কোড কখনো বুঝতে পারে না কেন একটি জীবন বাঁচানো অন্য যেকোনো নিয়মের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিংবা কেন অন্যের ক্ষতি না করার নীতিটি পরম সত্য। এআই যখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অস্ত্র পরিচালনা, বড় বড় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত কিংবা আইনি বিচার প্রক্রিয়ার মতো জটিল বিষয়ে যুক্ত হতে শুরু করেছে, তখন এই নৈতিক কোডিংয়ের অভাব মানবজাতির জন্য এক বিরাট অশনিসংকেত বয়ে আনতে পারে। ঠিক এই জায়গাতেই ধর্মীয় দর্শন এক অনন্য পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করতে পারে, যা শুধু যান্ত্রিক নিয়মের বাইরে গিয়ে আত্মিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতার পাঠ পড়াতে সক্ষম।



