শক্তির ভবিষ্যৎ সোলার

সূর্য আমাদের সৌরজগতের শক্তির মূল উৎস।
বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে যখন পরিবেশ বিপর্যয় দৃশ্যমান, তখন প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে সোলার প্যানেল। লিখেছেন শুভ রহমান
যমুনার বুকে জেগে ওঠা চর কাশিমপুর। সন্ধ্যা নামতেই চারপাশের আদিম অন্ধকার গ্রাস করে নেয় পুরো গ্রামটিকে। কলিমুদ্দিনের দশ বছরের মেয়ে আসমা যখন কেরোসিনের কুপি জ্বালিয়ে কাঁপা কাঁপা আলোয় বইয়ের পাতা ওল্টানোর ব্যর্থ চেষ্টা করত, তখন মেয়ের দুর্ভোগের সমাধানের চিন্তা করতেন কলিমউদ্দিন। আর একদিন ঠিক সমাধান হিসেবে এলো সৌরবিদ্যুৎ।
গল্পটি কাল্পনিক। কিন্তু এ দৃশ্য শুধু বাংলাদেশের কোনো প্রত্যন্ত চরের নয়, বরং বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি মানুষের জীবন বদলে যাওয়ার এক জীবন্ত দলিল। জীবাশ্ম জ্বালানির সীমাবদ্ধতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতার মুখে দাঁড়িয়ে মানবজাতি আজ এমন এক শক্তির উৎস খুঁজছে, যা একই সঙ্গে টেকসই, পরিবেশবান্ধব এবং অফুরন্ত।
আর এ অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সূর্য— আমাদের সৌরজগতের শক্তির মূল উৎস। সোলার বা সৌরশক্তি আজ আর শুধু কোনো বিকল্প বা পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি নয়; এটিই হচ্ছে বৈশ্বিক শক্তি খাতের ভবিষ্যৎ।
এই প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়ন ও গণ-উৎপাদনের ফলে গত এক দশকে সোলার প্যানেলের উৎপাদন খরচ প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে। একে বলা হচ্ছে লার্নিং কার্ভ বা সোয়েনসনের সূত্র, যা নির্দেশ করে যে সোলার প্যানেলের বৈশ্বিক উৎপাদন দ্বিগুণ হলে এর মূল্য প্রায় ২০ শতাংশ হ্রাস পায়।
বর্তমানে অনেক দেশে কয়লা বা গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের চেয়ে সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদন করা অনেক বেশি সাশ্রয়ী। সোলার প্যানেল বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় কোনো গ্রিনহাউজ গ্যাস বা ক্ষতিকারক বর্জ্য তৈরি করে না। এক গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র বছরে লাখ লাখ টন কার্বন নির্গমন কমাতে পারে।
ফলে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ধরে রাখতে সোলার এনার্জি সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
তবে রাতে বা মেঘলা দিনে সোলার প্যানেল বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে না, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘ইন্টারমিটেন্সি’ সমস্যা বলা হয়। মার্কিন কোম্পানি টেসলা তাদের উন্নত ব্যাটারি স্টোরেজ প্রযুক্তি দিয়ে এ সমস্যার নিখুঁত সমাধান করেছে। গৃহস্থালির জন্য তাদের ‘পাওয়ারওয়াল’ এবং শিল্পকারখানা বা গ্রিডের জন্য ‘পাওয়ারপ্যাক’ ও ‘মেগাপ্যাক’ ব্যাটারি সিস্টেম দিনের বেলার উদ্বৃত্ত সৌরবিদ্যুৎ জমা রাখে। এই সঞ্চিত বিদ্যুৎ রাতে বা লোডশেডিংয়ের সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরবরাহ করা হয়, যা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে ভূমিকা রাখছে।
টেসলার পাশাপাশি ফার্স্ট সোলার, কানাডিয়ান সোলার ও জেএ সোলারের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলো প্যানেলের প্রযুক্তিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনছে। প্রচলিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থা মূলত কেন্দ্রীভূত, অর্থাৎ একটি বড় পাওয়ার প্ল্যান্টে বিদ্যুৎ তৈরি হয়ে শত শত মাইল দূরে সঞ্চালিত হয়, যাতে সঞ্চালন লাইনে প্রচুর বিদ্যুৎ অপচয় হয়। সোলার এনার্জি এ ধারণাকে বদলে দিয়ে একে একটি ‘ডিস্ট্রিবিউটেড এনার্জি রিসোর্স’ বা বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থায় রূপান্তর করেছে। বাড়ির ছাদে, কারখানার ওপর কিংবা অব্যবহৃত জমিতে সোলার প্যানেল বসিয়ে সরাসরি ব্যবহারের জায়গায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে। এর ফলে গ্রিডের ওপর চাপ কমছে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল হচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের নিত্যনতুন উদ্ভাবন সৌরশক্তিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে।




