মস্ত জাদুর ছাতা

বৃষ্টির দিনে মায়ের কথা না শুনে বেশ বিপদে পড়ে গিয়েছিল পুচ্চিটা। তারপর কী হলো? জানতে হলে পড়ো এই গল্প। লিখেছেন মেঘের কাকু অদ্বৈত মারুত। ছবি এঁকেছেন ছাতার বন্ধু রজত
সকাল থেকেই মেঘবুড়িটা মুখ ভার করে আছে। রেগে থেকে থেকে চিৎকার করছে। কার ওপর তার এত রাগ, অভিমান— বাপি জানে না। সে যখন স্কুলে যাচ্ছিল, মা ডেকে বললেন, ‘ছাতাটা নিয়ে যাও, বাবা। মেঘবুড়ির মতিগতির ঠিক নেই। যখন-তখন কান্না করে বসবে।’
কিন্তু বাপি তো ডানপিঠে ছেলে, দুরন্ত! আকাশের দিকে তাকাল। তার মনে হলো, এ আর কী মেঘ! বৃষ্টি-ফিষ্টি কিচ্ছু হবে না। মায়ের শুধু-শুধু চিন্তা। ছাতা বয়ে নেওয়ার দরকার কী!
সে মায়ের কথা না শুনেই পিঠে ব্যাগ নিয়ে স্কুলের দিকে ভোঁ-দৌড় দিল।
সারাদিন বন্ধুদের সঙ্গে ভালোই কাটল পড়ালেখা আর দুষ্টুমি করে। সমস্যা বাধল ছুটির ঘণ্টা বাজার একটু আগে। হঠাৎ কুচকুচে কালো মেঘে আকাশ ঢেকে গেল। গুরুগুরু শব্দও বেড়ে গেল। তারপর— ঝমঝমাঝম, মুষলধারে বৃষ্টি নামল।
স্কুল ছুটি হতেই কিছুক্ষণের মধ্যে মাঠ ফাঁকা হয়ে গেল। বন্ধুদের মধ্যে যারা ছাতা এনেছিল, তারা বাড়ি চলে গেল। কারও বড় ভাই এসে সাইকেলের পেছনে বসিয়ে নিয়ে গেল কাউকে। বারান্দায় শুধু বাপি, একা দাঁড়িয়ে রইল। তাকে কেউ সঙ্গে নিল না!
খুব মন খারাপ হলো তার। মায়ের কথা না শোনায় নিজের ওপর বড্ড রাগ হতে লাগল। বাতাসের রাগী ভাব দেখে ভয় পেতে শুরু করল বাপি। বৃষ্টির ছাঁট টেনে এনে তার গায়ে লাগাচ্ছিল ঠাস ঠাস করে। থেকে থেকে মেঘবুড়িটাও কঠিন হুংকার দিতে লাগল। বাপির বুক তখন ঢিপঢিপ করে কাঁপছিল।
সে বারবার স্কুলের গেটের দিকে তাকাচ্ছিল। ভাবছিল— ইশ! মা যদি জাদু জানতেন! একটা জাদুর কাঠি দিয়ে আমাকে এক্ষুনি ঘরে নিয়ে যেতেন! উঁহু, আমি যদি মায়ের কথা শুনতাম!
ঝাপসা বৃষ্টির ভেতর ঠিক তখনই বাপি দেখল, একজন মানুষ কাদা-পানি ভেঙে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসছেন। মাথায় পুরনো চেনা ছাতাটা। মানুষটা যত কাছে এলেন, বাপির মুখ তত চওড়া হাসিতে ভরে উঠল।
আরে! ও তো আর কেউ নয়, ও তো তার বাবা!
বাবা বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই বাপি দেখল, বাবার ফতুয়ার হাতা ভিজে গায়ে লেপ্টে গেছে, পায়ে কাদা লেগে আছে। কিন্তু চোখেমুখে মিষ্টি হাসি। বাবা বললেন, ‘আমার বাপি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল বুঝি?’
বাপি একছুটে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। বলল, ‘উঁহু, একটুও না! আমি জানতাম তুমি এক্ষুনি চলে আসবে।’
বাবা হাসলেন। ছেলের কপালে চুমু খেলেন। তারপর বললেন, ‘চলো, এবার বাড়ি যাই। তোমার মা চিন্তা করছেন।’
একটাই ছাতা। ছোট্ট। বাবা বাপিকে নিজের গায়ের সঙ্গে লেপ্টে ধরে রাখলেন, যাতে এক ফোঁটা পানিও ওর গায়ে না লাগে। রাস্তায় তখন বৃষ্টির পানি থইথই করছে। বাবা বললেন, ‘আমার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখো, কেমন? পথ খুব পিচ্ছিল।’
হাঁটতে হাঁটতে বাপি জিজ্ঞেস করল, ‘আমি তো মায়ের কথা শুনিনি, ছাতাটাও নিয়ে আসিনি। খুব রাগ করেছ, তাই না বাবা?’
বাবা মুচকি হাসলেন। বাপির নাক টিপে দিয়ে বললেন, ‘একটুও না। রাগ করলে কি আর তোমাকে নিতে আসতাম? আমার রাজপুত্তুর স্কুলের বারান্দায় একা একা দাঁড়িয়ে থাকবে আর আমি ঘরে বসে ভাবব? তা কি হয়?’
বাপি বাবার মুখের দিকে তাকাল। ফিসফিস করে বলল, ‘বাবা, তুমি আমাকে কত ভালোবাসো?’
ছেলের এমন প্রশ্নে বাবা আবারও হাসলেন। শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ‘এই বৃষ্টি শেষে আকাশ যতটা ঝলমল করে উঠবে, রাতের পরিষ্কার আকাশে যত তারা ফুটবে, তার চেয়েও কোটি কোটি গুণ বেশি ভালোবাসি, বাবা।’
বাপি বাবার বুকে মাথা রাখল। দুহাত দিয়ে শক্ত করে কোমর জড়িয়ে ধরল। আপনমনে ভাবল, তার বাবাই আসলে একটা জাদুকরী মস্ত বড় ছাতা। যত ঝড়ই আসুক, বৃষ্টি পড়ুক, সেই ছাতা সবসময় তাকে পরম মমতায় আগলে রাখে।




