নিখোঁজ গরুর হদিস

অলংকরণ করেছেন রজত
সবাই যখন গরুর জন্য চিন্তায় অস্থির, এক দুষ্টু বালক তখন কী কাণ্ডই না ঘটিয়ে বসল! তা নিয়ে গল্প লিখেছেন শেখ সালাহ্উদ্দীন
সেদিন সকালে পাড়ায় তুমুল হুলস্থুল।
ব্যাপার কী! ব্যাপারটা গুরুতর। আমাদের প্রতিবেশী আক্কেল আলি ভাইয়ের সবচেয়ে দামি গরুটা গোয়াল থেকে উধাও। আক্কেল ভাই উঠানে বসে এমন মড়াকান্না জুড়লেন যে উঠানের মুরগিগুলো ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে বাগানের দিকে ছুটে পালাল। পোষা বিড়ালটা ভয় পেয়ে এক দৌড়ে ডালিম গাছে উঠে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
পাড়ার সবাই এসে জড়ো হলো তার বাড়িতে। খবর পেয়ে গায়ের মোড়ল চাচাও হাজির। তাকে দেখে আক্কেল ভাইয়ের কান্নার ভলিউম দ্বিগুণ হয়ে গেল।
মোড়ল চাচা তত্ত্ব-তালাশ শুরু করলেন।
কেউ একজন বলল, ‘গতকাল তো ছিল অমাবস্যা। গরুটা জিন-পরীরা নিয়া যায়নি তো!’
আরেকজন বলল, ‘আক্কেল কালকে গরু গোয়ালে আনতেই হয়তো ভুইলা গেছে।’
ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ একজন বলল, ‘না না, মনে হয় ছুইটা গিয়া কারও ক্ষেতে মুখ দিছে। হয়তো পেট ভইরা কাল খাওনই পায় নাই; আক্কেল যা কিপটা মানুষ!’
শেষের কথাটা সে ফিসফিস করে বলল, যা পাশের লোকটিও স্পষ্ট শুনতে পেল না। নিজের সম্পর্কে কিপটা শব্দটা আক্কেল আলি ভাই একেবারেই পছন্দ করেন না। কেউ বললে ভীষণ চটে যান। ভাগ্য ভালো, কান্নায় মনোযোগ ছিল বলে কথাগুলো আক্কেল ভাইয়ের কানে যায়নি।
মোড়ল চাচা হাত তুলে সবাইকে থামালেন, ‘আন্দাজে আর কোনো কথা না। সবাই যাও, আশপাশের এলাকা ভালো করে খুঁজে দেখ।’
ব্যস, শুরু হলো তল্লাশি অভিযান।
কেউ মাঠে, কেউ বাগানে, কেউ আবার খালের ধারে খুঁজতে গেল। মোড়ল চাচা নিজেও এদিক-ওদিক খুঁজতে লাগলেন। পুরো এলাকা তন্নতন্ন করে খুঁজেও গরুর হদিস মিলল না। বেশ কিছুক্ষণ পর একে একে তল্লাশি দল ফিরে আসতে লাগল।
সবাই মাথায় হাত দিয়ে ভাবছে। পাড়ার সবচেয়ে অলস ছেলে হাবুল এক কোণে বসে চিপস খেতে খেতে মোবাইলে গেম খেলছিল। গরুর চিন্তায় সবাই ব্যস্ত থাকায় কেউ তাকে লক্ষ করেনি। ক্লাস এইটে দুবার ফেল করার পর সে লেখাপড়ার পাট প্রায় চুকিয়ে দিয়েছে। কাজে-কর্মে তার প্রচণ্ড অনীহা। সামান্য পরিশ্রমেই তার বুক নাকি ধড়ফড়িয়ে ওঠে, ব্যাকপেইন শুরু হয়। সম্প্রতি তার ‘হেপাটোস্প্লেনোমেগালি’ অসুখ করেছে বলে সে দাবি করে। এই অদ্ভুত সমস্যাটা কী— এমন প্রশ্ন করলে সে খানিক ভাব নিয়ে বলে, ‘একটা সাধারণ মেডিকেল টার্ম, জানো না! গুগল করে জেনে নাও।’
মুরব্বিদের আলোচনা যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখন হঠাৎ সে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলল, ‘হুম, গরু কে নিয়েছে, আমি জানি।’
সঙ্গে সঙ্গে আলোচনা থেমে গেল। সবাই একসঙ্গে তার দিকে তাকাল। মোড়ল চাচা বললেন, ‘বেশ বেশ, জানিস তো জলদি নামটা বল।’
চশমাটা নাকের ওপর ঠেলে দিয়ে সে বলল, ‘আমি শিওর ওটা নিয়ে গেছে চোরে।’
মোড়ল চাচা বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘আহা চোর তো বুঝলাম, চোরের নাম কী?’
হাবুল চিপসের খালি প্যাকেট ঝাঁকিয়ে ধীরে-সুস্থে শেষ গুঁড়াগুলো মুখে ঢালল। তারপর হালকা চিবিয়ে তা গলাধঃকরণ করে বলল, ‘মুরব্বিরা যদি অভয় দেন তো চোরের নামও বলতে পারি।’
অধৈর্য হয়ে মোড়ল চাচা বললেন, ‘তোর আবার ভয় কী! ভয় কারে কয়, কত প্রকার ও কী কী, তা তো চোর ব্যাটা টের পাবে।’
হাবুল দুই হাত মাথার ওপর তুলে আড়মোড় ভাঙতে ভাঙতে বলল, ‘গরু নিয়ে গেছে গরুচোরে।’
পুরো উঠোন স্তব্ধ। পরবর্তী পাঁচ সেকেন্ড কারও মুখে রা নেই।
মোড়ল চাচার মাথার চুল রাগে খাড়া হয়ে গেল। তিনি ঝট করে উঠে দাঁড়ালেন, এরপর তারস্বরে চিৎকার করে উঠলেন, ‘কী বললি? বাঁদর পাজি হতচ্ছাড়া... তুই আমাদের সঙ্গে ইয়ার্কি মারিস? তোর এত বড় সাহস!’
ডানে-বামে তাকিয়ে কাছেই পেলেন গরু তাড়ানো বাঁশের লাঠি। হাতে তুলে নিতে নিতে হুংকার ছাড়লেন, ‘আজ তোর বাঁদরামি ছুটিয়ে দেব।’
ব্যস!
হাবুলের ব্যাকপেইন উধাও।
হেপাটোস্প্লেনোমেগালি উধাও।
অলসতাও উধাও।
সে এমন এক দৌড় দিল, দেখলে মনে হবে ১০০ মিটার স্প্রিন্টের ফাইনাল চলছে! মোড়ল চাচা লাঠি হাতে পেছনে আর প্রাণ হাতে নিয়ে হাবুল সামনে; ছুটছে তো ছুটছেই।
উঠোন পেরোল।
মাঠ পেরোল।
ঝোপঝাড় পেরোল।
কাঁটাতার টপকাল।
সামনেই খাল। কোনোরকম চিন্তা না করেই সে এক লাফে পানিতে ঝপাং! এক ডুবে খালের ওপারে গিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলল, ‘আহ্! এবারের মতো বেঁচে গেছি।’
সেদিনের পর থেকে হাবুল আর কখনো ফালতু কথা বলে না। আর অলসতা? তাও পুরোপুরি কেটে গেছে। বই-খাতা নিয়ে সে আবার স্কুলে আসা-যাওয়া শুরু করেছে।
তবে একটা ব্যাপার বদলায়নি। মোড়ল চাচাকে দূর থেকে দেখলে এখনো সে ১১০ মিটার হার্ডলস দিয়ে মুহূর্তে হাওয়া হয়ে যায়।




