ইতিহাস গড়ে দেওয়া ছয়জন মা
- মা দিবস বিশেষ

ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি
একজন মা সন্তানের প্রথম আশ্রয়, প্রথম শিক্ষক, প্রথম সাহস এবং প্রথম ভালোবাসা। সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য তিনি নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখেন, নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দেন, কখনও অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করেন, আবার কখনও পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সন্তানের হাত শক্ত করে ধরে রাখেন।
আর আজকের দিনটি তাদেরকেই শ্রদ্ধা জানানোর দিন। আজ ‘বিশ্ব মা দিবস’।
ইতিহাসে যাদের আমরা মহান মানুষ হিসেবে চিনি, তাদের অনেকের জীবন গভীরভাবে গড়ে দিয়েছেন তাদের মায়েরা। কখনও একটি অনুপ্রেরণার বাক্য, কখনও নিঃশব্দ ত্যাগ, কখনও অটল বিশ্বাস- এসবই বদলে দিয়েছে সন্তানের ভবিষ্যৎ। মা দিবস উপলক্ষে এমন ছয়জন মায়ের গল্প তুলে ধরা হলো, যাদের ভালোবাসা ও প্রেরণা শুধু একজন সন্তানকেই নয়, বদলে দিয়েছে ইতিহাসের গতিপথও।
পুতলিবাই গান্ধী: সত্য ও মানবতার শিক্ষা দেওয়া মা
ভারতের জাতির পিতা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রভাবগুলোর একটি ছিলেন তার মা পুতুলিবাই গান্ধী নিজেই। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ, ধৈর্যশীল ও নীতিবান নারী। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছেলেকে সত্য কথা বলা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং আত্মসংযমের শিক্ষা দিয়েছিলেন।
মহাত্মা গান্ধী তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন- মায়ের উপবাস, প্রার্থনা ও কঠোর আত্মনিয়ন্ত্রণ তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি দেখেছিলেন, একজন মানুষ কতটা শক্তিশালী হতে পারেন শুধু নৈতিকতার জোরে।
পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে গান্ধী যেভাবে পুরো পৃথিবীর সামনে এক নতুন সংগ্রামের পথ দেখিয়েছিলেন, তার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল মায়ের কাছ থেকে পাওয়া সেই নৈতিক শিক্ষার মধ্য দিয়েই।
সারাহ বুশ লিংকন: বইয়ের প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তোলা মা
আব্রাহাম লিংকন খুব ছোট বয়সেই নিজের জন্মদাত্রী মাকে হারান। পরে তার জীবনে আসেন সারাহ বুশ লিংকন। যদিও তিনি ছিলেন সৎমা, কিন্তু লিংকনের জীবনে তার ভালোবাসা ছিল একেবারে আপন মায়ের মতো।
দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হওয়া লিংকনের পড়াশোনার সুযোগ খুব সীমিত ছিল। কিন্তু সারাহ বুশ বুঝতে পেরেছিলেন, ছেলেটির মধ্যে জ্ঞানের প্রতি প্রবল আকর্ষণ রয়েছে। তিনি ছেলেকে বই পড়তে উৎসাহ দিতেন এবং কখনও তার শেখার আগ্রহকে থামিয়ে দেননি।
লিংকন পরে বলেছিলেন, তার জীবনের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তির বড় অংশ তিনি পেয়েছিলেন এই মায়ের কাছ থেকেই। একজন মায়ের উৎসাহ শেষে একজন দরিদ্র শিশুকে দাসপ্রথা বিলোপ এবং মানবাধিকারের জন্য সংগ্রাম করে লিংকন ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়কে পরিণত করে। তার চরিত্রের দৃঢ়তা ও মানবিকতার পেছনে মায়ের অবদান ছিল অপরিসীম।
ভুবনেশ্বরী দেবী: বিবেকানন্দের সাহসের ভিত্তি
স্বামী বিবেকানন্দের ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস ও মানবসেবার চেতনার পেছনে ছিলেন তার মা ভুবনেশ্বরী দেবী। তিনি ছোটবেলা থেকেই ছেলেকে বীরত্ব, আত্মসম্মান ও সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিয়েছিলেন। তিনি নিয়মিত সন্তানকে নৈতিক গল্প শোনাতেন। সেই গল্পগুলো থেকেই বিবেকানন্দের মনে জন্ম নেয় শক্তি, আত্মবিশ্বাস ও মানবতার বোধ।
বিবেকানন্দ একবার বলেছিলেন, তার চরিত্র গঠনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব তার মায়ের। শিকাগোর বিশ্বধর্ম সম্মেলনে যে যুবক আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভারতীয় দর্শনের কথা বলেছিলেন, তার মানসিক শক্তির ভিত তৈরি হয়েছিল মায়ের শিক্ষাতেই।
পাউলিন আইনস্টাইন: ভিন্নধর্মী শিশুর পাশে থাকা মা
বিখ্যাত নোবেলজয়ী পদার্থবিদ আলবার্ট আইনস্টাইনের শৈশব অন্য শিশুদের মতো ছিলেন না। তিনি দেরিতে কথা বলতে শুরু করেছিলেন, আর স্কুলেও তাকে খুব মেধাবী মনে করা হতো না। অনেকেই ভাবতেন, এই শিশু হয়তো খুব বেশি দূর এগোতে পারবে না।
কিন্তু তার মা পাউলিন আইনস্টাইন কখনও ছেলের ভিন্নতাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখেননি। বরং তিনি আইনস্টাইনের কৌতূহলকে উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি ছেলেকে সংগীত শিখিয়েছেন, বেহালা বাজাতে শিখিয়েছেন, স্বাধীনভাবে ভাবতে শিখিয়েছেন এবং প্রশ্ন করতে নিরুৎসাহিত করেননি।
এই স্বাধীন চিন্তার পরিবেশই পরে আইনস্টাইনের অসাধারণ সৃজনশীলতার ভিত্তি তৈরি করে। এমনকি পরিণত বয়সেও তিনি যেখানেই যেতেন, সঙ্গে তার ভায়োলিন নিয়ে যেতেন।
পৃথিবী যখন শিশুটিকে বুঝতে পারেনি, তখন তার মা-ই তাঁর সম্ভাবনার ওপর বিশ্বাস রেখেছিলেন।
আশিয়াম্মা: অভাবের মধ্যেও স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখা মা
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও মিসাইল ম্যান হিসেবে খ্যাত রকেট বিজ্ঞানী এপিজে আবদুল কালাম দরিদ্র পরিবারে বড় হয়েছেন। তার মা আশিয়াম্মা সংসারের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সন্তানের শিক্ষার ব্যাপারে কখনও আপস করেননি।
কালাম পরে স্মৃতিচারণে লিখেছিলেন, তার মা অনেক সময় নিজের খাবার কম খেয়ে সন্তানদের জন্য খাবার তুলে রাখতেন। তিনি ছেলেকে শিখিয়েছিলেন বিনয়, মানবতা ও কঠোর পরিশ্রমের মূল্য।
একটি সাধারণ পরিবারের সন্তান থেকে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রপতি হয়ে ওঠার পেছনে ছিল এই মায়ের নীরব ত্যাগ এবং অটল বিশ্বাস।
ডেলোরিস জর্ডান: ব্যর্থতার ভেতর থেকে উঠে দাঁড়াতে শেখানো মা
কৈশোরে একবার স্কুলের বাস্কেটবল দল থেকে বাদ পড়ে গভীরভাবে ভেঙে পড়েছিলেন মাইকেল জর্ডান। সেই কঠিন সময়ে তার পাশে দাঁড়ান মা ডেলোরিস জর্ডান।
তিনি ছেলেকে বোঝান, জীবনে ব্যর্থতা আসবেই, কিন্তু সেই ব্যর্থতার কাছে হার মানলে চলবে না। বরং ব্যর্থতাকেই শক্তিতে পরিণত করতে হবে। তিনি জর্ডানকে কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং আত্মবিশ্বাসের শিক্ষা দিয়েছিলেন।
মায়ের সেই কথাগুলো হৃদয়ে ধারণ করেই জর্ডান নিজেকে বদলে ফেলেন। পরবর্তীতে তিনি হয়ে ওঠেন বাস্কেটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। তার জীবনের গল্প আজও প্রমাণ করে, একজন মায়ের বিশ্বাস সন্তানের জীবন কত দূর বদলে দিতে পারে।






