এক ‘ক্রিপ্টো কুইনের’ গল্প
- বিটকয়েনকে টেক্কা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের থেকে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার হাতিয়ে নেন রুজা ইগনাতোভা। তার জালিয়াতির গল্প শুনিয়েছেন মারুফ হোসেন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পরনে ঝলমলে মেরুন রঙের সান্ধ্য পোশাক। মঞ্চে পা রাখতেই চারদিকে আলোর রোশনাই আর আগুনের ফুলকি। স্পিকারে চড়া সুরে বাজছে অ্যালিসিয়া কিজের বিখ্যাত গান— ‘গার্ল অন ফায়ার’। উপস্থিত দর্শকদের গগনবিদারী চিৎকারের মাঝে সহাস্যে মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন রুজা ইগনাতোভা।
ঘটনাটা ২০১৬ সালের জুন মাসের। ক্রিপ্টোকারেন্সি, অর্থাৎ ডিজিটাল মুদ্রা তখন বিনিয়োগের দুনিয়ায় নতুন এক উন্মাদনা। সেই জোয়ারে গা ভাসাতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে। ঠিক তখনই নিজেকে ‘ক্রিপ্টো কুইন’ আখ্যা দিয়ে রুজা দাবি করেন, তার কোম্পানি ওয়ানকয়েন অচিরেই জনপ্রিয়তায় বিশ্বের প্রথম ও সবচেয়ে পরিচিত ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েনকে ছাপিয়ে যাবে। লন্ডনের ওয়েম্বলি অ্যারেনায় দাঁড়িয়ে তুমুল করতালির মধ্যে রুজা ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আর মাত্র দুই বছর। তারপর কেউ বিটকয়েনের নামও উচ্চারণ করবে না।’
এর ১৬ মাস পর, ২০১৭ সালের অক্টোবরে, বুলগেরিয়ার সোফিয়া থেকে একটি বিমানে ওঠার পরেই উধাও হয়ে যান রুজা। এরপর তার আর হদিস মেলেনি।
বিটকয়েনকে টেক্কা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের থেকে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার হাতিয়ে নিয়েছেন রুজা। মার্কিন ফেডারেল প্রসিকিউটরদের মতে, এটি বিশ্বের ইতিহাসের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক জালিয়াতিগুলোর একটি। বাস্তবে ওয়ানকয়েনের কানাকড়িও মূল্য ছিল না।
বর্তমানে এফবিআইয়ের মোস্ট ওয়ান্টেড পলাতক আসামির তালিকায় রুজাই একমাত্র নারী। কুখ্যাত গ্যাংস্টার ও খুনিদের সঙ্গে উঠেছে তার নাম। ১৯৫০ সালে এই তালিকা তৈরির পর থেকে এ পর্যন্ত ৫২৯ জন ফেরারির মধ্যে রুজাসহ মাত্র ১১ জন নারীর নাম উঠেছে।
২০১৭ সালের অক্টোবরে, বুলগেরিয়ার সোফিয়া থেকে একটি বিমানে ওঠার পরেই উধাও হয়ে যান রুজা। এরপর তার আর হদিস মেলেনি
ইউরোপের মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধীদের তালিকায়ও শীর্ষে রয়েছেন তিনি। এফবিআইয়ের জারি করা পোস্টারে বলা হয়েছে— এ ‘ক্রিপ্টো কুইন’ সশস্ত্র দেহরক্ষীবেষ্টিত হয়ে ভ্রমণ করতে পারেন। এমনকি প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে চেহারাও বদলে ফেলতে পারেন।
আদালতের নথির তথ্যের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমে সিএনএন এক প্রতিবেদনে বলেছিল, রুজা ও তার সহযোগী কার্ল সেবাস্টিয়ান গ্রিনউড শুরু থেকেই জানতেন, তাদের এ উচ্চাকাঙ্ক্ষী উদ্যোগ আসলে একটি পনজি স্কিম। এই ওয়ানকয়েন তৈরি করা হয়েছিল বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে জালিয়াতি করার উদ্দেশ্যেই।
তদন্তে উঠে আসে, ইমেইলে ওয়ানকয়েন নিয়ে আলাপের সময় রুজা ও গ্রিনউড একে ‘আবর্জনা’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। রুজার ভাই কনস্ট্যান্টিন ইগনাতোভকে পাঠানো ইমেইলে গ্রিনউড বিনিয়োগকারীদের ‘বোকা’ ও ‘পাগল’ বলে বিদ্রূপও করেন। কনস্ট্যান্টিনও এ জালিয়াতিতে নাম লিখিয়েছিলেন, রুজা উধাও হওয়ার পর তিনিই ওয়ানকয়েনের নেতৃত্বে আসেন।
রুজা জার্মানির নাগরিক হলেও তার জন্ম বুলগেরিয়ায়। বাবা ছিলেন প্রকৌশলী, মা শিক্ষিকা। জেমি বার্টলেটের লেখা দ্য মিসিং ক্রিপ্টো কুইন বইয়ে রুজার সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর কাহিনির সবিস্তার বর্ণনা রয়েছে।
শৈশবেই সপরিবার জার্মানিতে চলে যান রুজা। ছোট থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী। পড়াশোনার বাইরে দাবা খেলা ছিল তার নেশা। রুজা ছিলেন অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং কিছুটা আত্মকেন্দ্রিক।
বৃত্তি পেয়ে জার্মানির কনস্টানজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়েছিলেন রুজা। সেখানেই এক সহপাঠীকে বিয়ে করেন। ৩০ বছর বয়সের মধ্যেই কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। টাকা রোজগারের উপায় নিয়ে রাত জেগে একের পর এক বইও পড়তেন।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইউরোপীয় আইন নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে সোফিয়াতে আন্তর্জাতিক পরামর্শদাতা সংস্থা ম্যাককিনসে অ্যান্ড কোম্পানিতে কর্মজীবন শুরু করেন রুজা। রুশ, জার্মান, ইংরেজি ও বুলগেরীয় ভাষায় সমান পারদর্শী হওয়ার সুবাদে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সহজে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে ধনী হওয়ার লড়াইয়ের গল্প শুনে অনেকেই তাকে বিশ্বাস করেছিলেন। পোশাক-আশাকের ব্যাপারেও রুজা ছিলেন অত্যন্ত শৌখিন। হীরার দুল আর টকটকে লাল লিপস্টিকে নিজেকে সফল ও গ্ল্যামারাস নারী হিসেবে উপস্থাপন করতে ভালোবাসতেন।
ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো ডিজিটাল সম্পদ। ব্যাংক বা সরকারের বদলে বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে থাকা কম্পিউটারের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এ সম্পদ ব্যবস্থাপনা করা হয়। যেমন, বিটকয়েন ‘মাইনিং’ করার জন্য ডেটা সেন্টারে শক্তিশালী সার্ভারের প্রয়োজন হয়। লগ্নিকারীদের একাংশ এ ব্যবস্থাকে ভবিষ্যৎ মনে করলেও সমালোচকদের চোখে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং এক ধরনের পনজি স্কিম।
২০১৪ সালে রুজা ও গ্রিনউড নিউ ইয়র্কসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে ওয়ানকয়েনের প্রচার শুরু করেন। অনলাইনে বিভিন্ন সেমিনার ও ওয়েবিনারের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের ওয়ানকয়েনের নানা প্যাকেজ কিনতে প্রলুব্ধ করা হতো। নিজেদের স্বপ্ন ফেরি করতে ম্যাকাউ থেকে দুবাই, সিঙ্গাপুর— বিশ্ব জুড়ে চষে বেড়ান রুজা। সংগৃহীত বিপুল অর্থ দুহাতে ওড়ান। বুলগেরিয়ার সোফিয়া ও কৃষ্ণসাগর-সংলগ্ন রিসর্ট শহর সোজোপলে কোটি কোটি ডলার খরচ করে বহুমূল্য সম্পত্তি কেনেন। অবসরযাপনের সঙ্গী ছিল তার বিলাসবহুল প্রমোদতরী দ্য দাভিনা।
তার কোম্পানি মূলত মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পদ্ধতিতে কাজ করত। অর্থাৎ একজন বিনিয়োগকারী আরেকজন নতুন বিনিয়োগকারী জোগাড় করতে পারলেই পেতেন মোটা অঙ্কের কমিশন।
সাধারণ মানুষের আয়ের কথা মাথায় রেখে হরেক রকমের প্যাকেজ সাজিয়ে বসেছিল রুজার কোম্পানি। আদালতে পেশ করা নথিতে দেখা গেছে, বিনিয়োগকারীদের মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ৫ থেকে ১০ গুণ লাভের দেখানো হয়েছিল স্বপ্ন।
এরপরই ওয়ানকয়েন কেনার ধুম পড়ে যায়। ২০১৪ সালের শেষভাগ থেকে ২০১৬ সালের শেষ পর্যন্ত লগ্নিকারীরা এ কোম্পানিকে ৪০০ কোটি ডলারের বেশি দিয়েছিলেন। এর মধ্যে শুধু আমেরিকার বিনিয়োগকারীদের অর্থই ছিল ৫ কোটি ডলারের কাছাকাছি।
পরে তদন্তে এক বিস্ফোরক তথ্য উঠে আসে। সাধারণ ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো ওয়ানকয়েনের আদতে কোনো ‘মাইনিং’ হতো না। অন্যান্য ডিজিটাল মুদ্রার জন্য যেখানে শক্তিশালী সার্ভারের প্রয়োজন হয়, সেখানে ওয়ানকয়েন চলত সাধারণ একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে। ওয়ানকয়েন কোম্পানি নিজেই কারসাজি করে মুদ্রার দাম নিয়ন্ত্রণ করত। ২০১৪ সালের অাগস্টে গ্রিনউডকে লেখা একটি ইমেইলে রুজা স্বীকার করেন, ‘আসলে কোনো মাইনিং হচ্ছে না, আমরা মানুষকে শুধু মিথ্যে বলছি।’
২০১৬ সালের দিকে রুজার সাজানো সাম্রাজ্যে ফাটল দেখা দেয়। বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পারেন, তাদের কেনা ওয়ানকয়েন বেচে লগ্নিকৃত অর্থ আর ফেরত পাওয়া যাচ্ছে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এ প্রতারণার খবর। সংবাদমাধ্যমগুলো প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। এরপর খোঁজখবর শুরু করে আন্তর্জাতিক ও মার্কিন তদন্ত সংস্থাগুলো।
রুজার ব্যক্তিগত জীবনের খবর বিশেষ জানা না গেলেও এফবিআইয়ের দাবি, নিজের মার্কিন প্রেমিকের ফ্ল্যাটে গোপনে আড়িপাতার যন্ত্র বসিয়েছিলেন ‘ক্রিপ্টো কুইন’। সেখান থেকেই রুজা জানতে পারেন, তার প্রেমিক ফেডারেল তদন্তকারীদের সাহায্য করছেন। সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে যান।
২০১৭ সালের অক্টোবরে রুজার বিরুদ্ধে আর্থিক জালিয়াতি, শেয়ারবাজার-সংক্রান্ত প্রতারণা ও অর্থ পাচারের একাধিক ধারায় মামলা করে মার্কিন বিচার বিভাগ। এর পরেই নিউ ইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার আগে তিনি উধাও হয়ে যান।
আদালতের নথি অনুযায়ী, এর দিন ১৫ পরেই, ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর বুলগেরিয়ার সোফিয়া থেকে একটি বিমানে চড়ে গ্রিসের অ্যাথেন্সে পাড়ি দেন রুজা। তারপরই তিনি পুরোপুরি লাপাত্তা। ডুবতে বসা কোম্পানির যাবতীয় দায়ভার সহযোগীদের কাঁধে ঠেলে দিয়ে কার্যত হাওয়ায় মিশে গেছেন তিনি।
এফবিআইয়ের ধারণা, অ্যাথেন্স থেকে জার্মান পাসপোর্ট ব্যবহার করে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত, জার্মানি, রাশিয়া কিংবা পূর্ব ইউরোপের কোনো দেশে চলে গেছেন। এমনকি বুলগেরিয়ায়ও ফিরে গিয়ে থাকতে পারেন। তার সঠিক হদিস দিতে পারলে লাখ ডলার পুরস্কার দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে মার্কিন তদন্তকারী সংস্থাটি।
রুজার ভাগ্য প্রসন্ন হলেও তার সহযোগীরা রেহাই পাননি। এরপর থেকে ওয়ানকয়েন কোম্পানিটি বন্ধ রয়েছে, তাদের ওয়েবসাইটও নিষ্ক্রিয়।
তবে দামি সান্ধ্য পোশাক আর হীরার গহনায় মোড়া ক্রিপ্টোসম্রাজ্ঞী আজও পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে। গ্রিসে পা রাখার পর আট বছর পেরিয়ে গেলেও রুজা ইগনাতোভা আজও এক অমীমাংসিত রহস্য।




