লাহোরের রবি রোড, বাড়ি নম্বর ১৬-বি

পুলিশের সঙ্গে জাভেদ ইকবাল
১৯৯৯ সালের ৯ জুলাইয়ের সকাল। পাকিস্তানের লাহোর শহরের এক ঘিঞ্জি মহল্লা থেকে কাজে বেরিয়েছিল ৯ বছরের ফয়সাল রাজ্জাক। ছোট্ট ছেলেটি কাগজের বাক্স মোড়ানোর কাজ করত একটি কারখানায়। সেদিনের পর আর তাকে জীবিত দেখেনি কেউ।
কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে হারিয়ে গেল দরিদ্র পরিবারের বেশ কয়েকজন শিশু-কিশোর। কেউ স্কুলে যাওয়ার পথে উধাও, কেউ বাজারে গিয়ে আর ফেরেনি।
নিখোঁজের তালিকায় ছিল ইজাজ মুহাম্মদ, ডাকনাম ‘কাকা’। সে আর তার ভাই পার্কে পার্কে ঘুরে মালিশ করত। হাতে রঙিন তেলের শিশি, পায়ে পাথর বসানো মল— এই ছিল তাদের পরিচয়। একদিন দুই কিশোর এসে ওদের বলল, ‘সাহেব মালিশ করাবে, দ্বিগুণ টাকা দেবে।’ কাকারা তাদের সঙ্গে গেল রবি রোডের ১৬-বি নম্বর বাড়িতে। ভেতরে বসে ছিল খাটো গড়নের, চশমা পরা এক লোক জাভেদ ইকবাল। কাকার ভাই অন্য খদ্দেরের খোঁজে বেরিয়ে গেল। এরপর আর কখনো দেখা মেলেনি কাকার।
পরের কয়েক মাসে যা সামনে এলো, তা রোমহর্ষক সিনেমাকেও হার মানায়।
১৯৯৯ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে লাহোর পুলিশের কাছে একটি উড়ো চিঠি আসে। চিঠির প্রেরক ১০০ জন কিশোরকে হত্যা করেছে বলে জানায়। পুলিশ প্রথমে বিষয়টি গুরুত্বই দেয়নি। ডিএসপি তারিক কাম্বোহ কয়েকজন কনস্টেবল নিয়ে অনিচ্ছাভরে গেলেন চিঠিতে লেখা ঠিকানায়, ১৬-বি রবি রোডে।
জাভেদ ইকবাল তখন বাড়িতেই ছিলেন। পুলিশ জেরা শুরু করতেই তিনি অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকেন। একপর্যায়ে নিজের লাইসেন্স করা পিস্তল বের করে আত্মহত্যার হুমকিও দেন। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করল না, এমনকি বাড়িটিও তল্লাশি করল না। ফিরে যাওয়ার সময় পিস্তলটাও তার কাছেই রেখে যায়।
অথচ এর আগেও অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল ইকবালের বিরুদ্ধে। কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তাদের ধারণা হয়েছিল, ‘এই লোক এত বড় খুনি হতে পারে না।’
পুলিশ গুরুত্ব না দেওয়ায় জাভেদ একই চিঠি পাঠাল পাকিস্তানের জনপ্রিয় উর্দু দৈনিক জং পত্রিকায়। সঙ্গে পাঠাল কয়েক ডজন কিশোরের ছবি। অপরাধ সম্পাদক জামিল চিশতির হাতে পৌঁছায় সেই ভয়ংকর স্বীকারোক্তি।
চিঠিতে জাভেদ লিখেছিল, কীভাবে সে শিশুদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করত, তারপর অ্যাসিডভর্তি ড্রামে দেহ গলিয়ে ফেলত। প্রতিটি শিশুর নাম, ঠিকানা, পোশাকের বর্ণনা পর্যন্ত ছিল সেখানে। এমনকি কোন অঙ্গ দেখে তার বিকৃত যৌন উত্তেজনা হতো, সেটাও লিখে রেখেছিল সে।
চিশতি ও তার সহকর্মী দ্রুত পৌঁছে যান রবি রোডের বাড়িটিতে। বাড়িটি তখন তালাবদ্ধ, পরিত্যক্ত। পাঁচিল টপকে ভেতরে ঢুকতেই তাদের নাকে আসে উৎকট গন্ধ। ঘরের ভেতরে ছড়িয়ে ছিল শিশুদের জামাকাপড়, জুতা আর নীল রঙের প্লাস্টিকের ক্যানিস্টার।
জাভেদ শিশুদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করত, তারপর অ্যাসিডভর্তি ড্রামে দেহ গলিয়ে ফেলত
একটি ক্যানিস্টারের মুখ খুলতেই দেখা গেল, তরলের মধ্যে ভাসছে অর্ধগলিত মানুষের দেহাবশেষ।
পরদিন সংবাদপত্রের প্রথম পাতাজুড়ে শিরোনাম হলো— ‘১০০ শিশুকে খুনের দাবি’। খবর ছড়িয়ে পড়তেই থানার সামনে ভিড় জমাল নিখোঁজ শিশুদের পরিবার। অনেকে কাপড় দেখে শনাক্ত করলেন নিজেদের সন্তানকে।
পুলিশ বাড়ি থেকে উদ্ধার করল অ্যাসিডভর্তি ড্রাম। একটি ড্রামের ভেতরে ছিল মানুষের ধড়, আরেকটিতে কাটা পা ও কোমরের হাড়। একটি পায়ের গোড়ালিতে তখনো ঝুলছিল রুপালি মল—ঠিক যেমনটি ছিল কাকার পায়ে।
ততক্ষণে জাভেদ ইকবাল উধাও।
তদন্তে বেরিয়ে আসে তার অন্ধকার অতীত। লাহোরের ধনী ব্যবসায়ী পরিবারে জন্ম নেওয়া জাভেদ ছোটবেলা থেকেই ছিল খামখেয়ালি ও হিংস্র। বই পড়া আর ডায়েরি লেখার নেশা ছিল তার। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেদের প্রতি বিকৃত যৌন আকর্ষণ তৈরি হয়।
১৯৯০-এর দশকে একাধিকবার তার বিরুদ্ধে শিশু ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু প্রতিবারই ঘুষ দিয়ে পার পেয়ে যায় সে। পরে নিজের কারখানায় পথশিশু ও পালিয়ে আসা কিশোরদের কাজে রাখতে শুরু করে। বাইরে থেকে তাকে অনেকেই ‘পথশিশুদের ত্রাতা’ ভাবত। বাস্তবে সেটাই ছিল তার শিকারের জাল।
১৯৯৮ সালে এক কিশোরের হাতে গুরুতরভাবে আহত হওয়ার পর জাভেদের জীবন আরও অন্ধকার হয়ে ওঠে। ব্যবসা ধসে যায়, মা মারা যান। নিজের ডায়েরিতে সে লিখেছিল, ‘আমার মা যেভাবে কেঁদেছেন, আমি একশ মাকে সেভাবে কাঁদাব।’
এরপর শুরু হয় হত্যাযজ্ঞ।
জাভেদ তার সহযোগীদের দিয়ে শিশুদের ভুলিয়ে বাড়িতে আনত। নির্যাতনের পর লোহার শিকল দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করত। তারপর অ্যাসিডে গলিয়ে দিত দেহ।
মনোবিদ অধ্যাপক স্টিফেন হোমস জাভেদ ইকবালকে কেবল পেডোফাইল হিসেবে মানতে নারাজ। তার মতে, ইকবাল ছিলেন একাধারে হেবিফাইল ও মাইসোপিড। এটি হচ্ছে এমন বিরল ধরনের অপরাধী, যারা শিশুদের নির্যাতন ও হত্যা করে আনন্দ পায়।
অবশেষে ১৯৯৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাভেদ নিজেই নাটকীয়ভাবে হাজির হয় ‘জং’ পত্রিকার অফিসে। ধুলোমাখা কাপড়, এলোমেলো দাড়ি আর ক্লান্ত চোখে শান্ত গলায় বলেছিল, ‘আমি জাভেদ ইকবাল, একশ শিশুর খুনি।’
গ্রেপ্তারের পর আদালতে তাকে কঠোর নিরাপত্তায় আনা-নেওয়া করা হতো। ক্ষুব্ধ জনতা সুযোগ পেলেই তাকে পিটিয়ে মারতে চাইত। কিন্তু আদালতে জাভেদ থাকত আশ্চর্য রকম স্বাভাবিক। কখনো সোয়েটার চাইত, কখনো বিচারকের টাকায় খাবারের আবদার করত।
মামলায় প্রসিকিউশন ১০৫ জন সাক্ষী হাজির করে। অনেক মা-বাবা নিজেদের সন্তানের জামাকাপড় শনাক্ত করেন। কিন্তু বড় সমস্যা, প্রত্যক্ষদর্শী নেই। কারণ, জাভেদ কোনো সাক্ষীকেই জীবিত রাখেনি।
তবুও ২০০০ সালের ১৬ মার্চ আদালত জাভেদ ইকবাল ও তার সহযোগী সাজিদকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। বিচারক নির্দেশ দেন, তাদের প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া হবে এবং পরে দেহ টুকরো করে অ্যাসিডে গলিয়ে দেওয়া হবে। ঠিক যেভাবে তারা শিশুদের হত্যা করেছিল।
কিন্তু সেই রায় কার্যকর হওয়ার আগেই ২০০১ সালে লাহোরের লাখপত জেলে রহস্যজনকভাবে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় জাভেদ ইকবালকে। পুলিশ জানায়, সে নিজের জামা ছিঁড়ে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে।




