গুরু মারা শিষ্য কিলার তারেক
- মতিঝিল এজিবি কলোনিতে এক যুবককে হত্যার মধ্য দিয়েই তারেকের কিলিং মিশনে হাতেখড়ি
- সাধারণ পোশাকে অভ্যস্ত তারেককে দেখে কারও কিলার মনে হতো না

গ্রাফিকস: সোহানুর রহমান
ঢাকা শহরের ২৫-৩০টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকলেও কোনো খুনের মামলায় আসামি ছিলেন না জাহিদ সিদ্দিকী ওরফে তারেক। তার অন্ধকার জগৎ আর পরিণতির রোমাঞ্চকর কাহিনি শুনিয়েছেন মাহবুব আলম লাবলু
ঢাকার রাত। ব্যস্ততম নগরীটি তখনো পুরোপুরি নিস্তব্ধ হয়নি। সবে মধ্যরাতের ঝিমুনি শুরু হয়েছে। ঠিক তখনই আমার মোবাইল ফোনের রিংটোন বেজে উঠল। রিসিভ করতেই ভরাট কণ্ঠের জিজ্ঞাসা, ‘কোথায় আছেন সাংবাদিক সাব? একটু গুলশান আসতে পারবেন? আমি আর তারেক আছি।’ কথা না বাড়িয়ে শুধু বললাম, আসছি। কল বিচ্ছিন্ন করেই শাহজাহানপুরের বাসা থেকে মোটরবাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
গুলশান-১ নম্বরের একটি কফিশপ। কাচের দেয়ালের ওপারে ঢাকা শহরের আলো ঝাপসা হয়ে জ্বলছে। সে রাতেই তারেকের সঙ্গে প্রথম পরিচয়, আলাপচারিতা। এটা ২০১০ সালের কথা। তখনো জানতাম না, সুদর্শন চেহারার আড়ালে এক ভয়ংকর পেশাদার খুনি তারেক। ঢাকা শহরের অন্তত ২৫-৩০টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকলেও কোনো খুনের মামলার আসামির তালিকায় তার নাম ছিল না। এ কারণেই অপরাধ জগতে তার পরিচিতি ছিল ‘হোয়াইট-কালার ক্রিমিনাল’ হিসেবে।
চলনে-বলনে দুর্দান্ত স্মার্ট তারেক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কখনো মিস করতেন না। তারেককে দেখে কারও কিলার মনে হওয়ার সুযোগ ছিল না
ঢাকার অপরাধ জগতের আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ভারতে পলাতক শাহাদাতের মুখে প্রথম শুনি তারেকের নাম। তখন শাহাদাত রাগত স্বরে বলেছিলেন, ‘দিব্যি ঢাকার শহরে বসে একের পর খুনখারাবি চালিয়ে যাচ্ছে তারেক। কিন্তু ওকে নিয়ে আপনাদের কোনো রিপোর্ট নেই। খুন-চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটলেই শুধু আমার নাম লিখে দেন। ওর (তারেক) সম্পর্কে খোঁজখবর নেন, দেখবেন ও কত বড় খুনি।’ পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, তারেকের পুরো নাম জাহিদ সিদ্দিকী। ছাত্রজীবনে জাতীয় পার্টির কর্মী থাকলেও পরে সক্রিয় ছিলেন যুবলীগের রাজনীতিতে। যুবলীগের (দক্ষিণ) নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কির হাত ধরেই তার উত্থান। মিল্কি ছিলেন তার রাজনৈতিক গুরু। শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে পাখির মতো গুলি করে মিল্কিকে হত্যা করে ‘গুরু মারা শিষ্য’ হিসেবে খেতাব জুটলেও ঢাকার অপরাধ জগতের ডন হওয়ার স্বপ্নপূরণ হয়নি তার। মিল্কি খুনের ঘটনায় র্যাবের হাতে গ্রেপ্তারের পর ক্রসফায়ারে নিহত হয় তারেক।
আলাপকালে র্যাব-১-এর তৎকালীন অধিনায়ক লে. কর্নেল কিসমত হায়াতও আমাকে বলেছিলেন, ‘তারেক একজন ঠান্ডা মাথার সিরিয়াল কিলার। তার বিরুদ্ধে ২৫-৩০টি খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও বিস্ময়করভাবে সে কোনো মামলার আসামি নয়। বরাবরই থেকেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।’
চার ভাই ও চার বোনের মধ্যে তারেক ছিল দ্বিতীয়। বাবা আব্দুল হাই ছিলেন সরকারি কর্মচারী। গ্রামের বাড়ি সিলেটের হবিগঞ্জে। তবে তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা মতিঝিলের এজিবি কলোনিতে। তারেকের সঙ্গে বেড়ে ওঠা কয়েকজনের সঙ্গে আলাপে জানতে পারি, নব্বইয়ের দশকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি বিপুল সান্যালের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়েই তার রাজনৈতিক পথচলা শুরু। তখন বিপুল ও মিল্কি এক গ্রুপে ছিলেন। আরেক গ্রুপে ছিলেন ইখতিয়ার, জিসান ও তাদের সহযোগীরা।
ইখতিয়ারের অনুসারী সন্ত্রাসী লোটো পলাশ ১৯৮৮ সালে তারেককে ধরে নিয়ে মারধর করেন। তারেক আশ্রয় নেন তৎকালীন শীর্ষ সন্ত্রাসী কালা জাহাঙ্গীরের কাছে। সেই সূত্রে তারেকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে ভারতে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদত, তাজসহ আরও কয়েকজনের। এ সন্ত্রাসীরাই তারেককে কিলারে পরিণত করেন।



