যুক্তরাজ্যে মৃত, পানামায় জীবিত

স্ত্রী অ্যান ডারউইনের সঙ্গে জন
সাগরে হারিয়ে যাওয়ার পাঁচ বছর পর পুলিশ স্টেশনে হাজির হলেন জন ডারউইন। এতদিন কোথায় ছিলেন তিনি? লিখেছেন শুভ রহমান
২০০২ সালের ২১ মার্চ। উত্তর সাগরের ধূসর জলরাশি তখন বেশ শান্ত। ইংল্যান্ডের ডারহামের সিটোন ক্যারিও সমুদ্রসৈকত থেকে নিজের লাল রঙের ক্যানুটি (এক ধরনের ছোট নৌকা) নিয়ে সাগরের বুকে ভাসলেন ৫১ বছর বয়সী জন ডারউইন। পেশায় তিনি ছিলেন একজন সাবেক জেলকর্মী ও শিক্ষক। কিন্তু রাত গড়িয়ে সকাল হলেও জন আর ফিরে এলেন না।
পরদিন সমুদ্রের বুকে পাওয়া গেল জনের সেই লাল ক্যানুটির ভাঙা অংশ। শুরু হলো বিশাল উদ্ধার অভিযান। কোস্ট গার্ড, পুলিশ, উড়োজাহাজ আর আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে সাগরের মাইলের পর মাইল চষে ফেলা হলো। কিন্তু জনের হদিস মিলল না। একপর্যায়ে জনের স্ত্রী অ্যান ডারউইন এবং তাদের দুই সন্তান মার্ক ও অ্যান্থনি মেনে নিলেন যে, সাগরের বুক চিরতরে কেড়ে নিয়েছে তাদের বাবাকে। এক বছর পর সরকারিভাবে জনকে ‘মৃত’ ঘোষণা করা হলো। কান্নায় ভেঙে পড়া অ্যান ডারউইন স্বামীর লাইফ ইন্স্যুরেন্স বা জীবন বীমার প্রায় আড়াই লাখ পাউন্ড (বাংলাদেশি টাকায় কয়েক কোটি টাকা) এবং পেনশনের অর্থ তুলে নিলেন।
কিন্তু আসল সত্যটা লুকিয়ে ছিল সেই সমুদ্রসৈকতের ঠিক বিপরীতে ডারউইন দম্পতির নিজেদের বড় বাড়িটির ভেতরেই। জন আসলে সেদিন সাগরে ডুবে মারা যাননি। পুরো ঘটনাটি ছিল ডারউইন দম্পতির ঠান্ডা মাথার এক নিখুঁত চিত্রনাট্য। সাগরে ক্যানু নিয়ে যাওয়ার পর জন গোপনে অন্য একটি ঘাটে ফিরে আসেন, যেখানে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন স্ত্রী অ্যান। জন সোজা চলে আসেন তাদের নিজেদের বাড়িতেই।
অ্যানের শোবার ঘরের আলমারির পেছনে একটি গোপন সুড়ঙ্গ বা দরজা তৈরি করা হয়েছিল
তাদের সেই বিশাল বাড়িটির ঠিক পাশেই ছিল আরেকটি ছোট ভাড়াটে ফ্ল্যাট, যার মালিকও ছিলেন তারা। জন নিজেকে গুটিয়ে নিলেন সেই গোপন ফ্ল্যাটের একটি অন্ধকার কামরায়। প্রতিবেশীদের চোখ এড়াতে তিনি দিনের বেলা কখনো জানালা খুলতেন না, দাড়ি-গোঁফ বড় করে ফেলেছিলেন এবং হাঁটার সময় ল্যাংচাতেন যেন দূর থেকে কেউ দেখলেও চিনতে না পারে। সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ব্যাপার ছিল, অ্যানের শোবার ঘরের আলমারির পেছনে একটি গোপন সুড়ঙ্গ বা দরজা তৈরি করা হয়েছিল। সেই সুড়ঙ্গ দিয়ে জন রাতের বেলা চুপিচুপি স্ত্রীর ঘরে চলে আসতেন।
এই জালিয়াতির সবচেয়ে নির্মম শিকার ছিল তাদের দুই সন্তান মার্ক ও অ্যান্থনি। তারা জানতেনই না যে তাদের বাবা বেঁচে আছেন। জন ও অ্যানের জীবন বেশ ভালোই কাটছিল। জন ছদ্মনাম ব্যবহার করে জাল পাসপোর্টও তৈরি করে ফেলেন। ২০০৬ সালে তারা দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পানামায় চলে যান। সেখানে গিয়ে একটি বিলাসবহুল বাড়ি এবং ট্রপিক্যাল রিসোর্ট তৈরির জমি কেনেন। পানামার এক রিয়েল এস্টেট এজেন্টের অফিসে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে একটি ছবিও তোলেন এই দম্পতি।
২০০৭ সালে পানামার আইনকানুন কিছুটা বদলে যায়। সেখানে স্থায়ীভাবে থাকতে গেলে ব্রিটিশ পুলিশের কাছ থেকে একটি ‘ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট’ বা চরিত্রগত সনদের প্রয়োজন পড়ে। জন ভাবলেন, এখন যদি তিনি নাটক করে আবার ফিরে আসেন, তবে কেউ আর সন্দেহ করবে না।
২০০৭ সালের ১ ডিসেম্বর। লন্ডনের ওয়েস্ট এন্ড পুলিশ স্টেশনে আচমকা হেঁটে ঢুকলেন এক বৃদ্ধ। ডিউটি অফিসারকে গিয়ে তিনি বললেন, ‘আমার নাম জন ডারউইন। আমিই সেই মানুষ, যে পাঁচ বছর আগে সাগরে নিখোঁজ হয়েছিল। এই পাঁচ বছর আমি কোথায় ছিলাম, কীভাবে বেঁচে ছিলাম— তার কিছুই আমার মনে নেই।’
জনের এই তথাকথিত ‘স্মৃতিভ্রম’ নাটক দেখে পুলিশ প্রথমে অবাক হলেও দ্রুতই তাদের মনে সন্দেহের দানা বাঁধে। একজন মানুষ পাঁচ বছর নিখোঁজ থাকার পরও তার গায়ের চামড়া এত ফর্সা, শরীর এত সুস্থ এবং পোশাকে কোনো মলিনতা নেই কেন? পুলিশ যখন গোপনে তদন্ত শুরু করে, ঠিক তখনই ইন্টারনেটের দুনিয়ায় ঘটে যায় এক বিস্ফোরণ।
একজন গুগলে ‘জন, অ্যান, পানামা’ লিখে সার্চ করতেই ২০০৬ সালে পানামায় তোলা সেই রিয়েল এস্টেট অফিসের ছবিটি সামনে চলে আসে। ছবিতে দেখা যায়, জন এবং অ্যান ডারউইন একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে অত্যন্ত সুখী মুখে হাসছেন! ছবিটি মুহূর্তের মধ্যে বিশ্ব মিডিয়া এবং পুলিশের হাতে পৌঁছে যায়। পানামা থেকে ফেরার পথে অ্যানকে বিমানবন্দর থেকেই গ্রেপ্তার করা হয়। আর পুলিশি জেরার মুখে জনের স্মৃতিভ্রমের নাটক কর্পূরের মতো উড়ে যায়।
২০০৮ সালের বিচারে জন ডারউইন এবং তার স্ত্রী অ্যানকে সাড়ে ছয় বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাদের সব সম্পত্তি এবং বীমার টাকা বাজেয়াপ্ত করা হয়।





