এলিয়াহ ম্যাককর্ডের দ্বিতীয় জীবন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঢাকার বিমানবন্দরে ৩৪ বছর আগে হেরোইনসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এক মার্কিন তরুণী। সাড়ে চার বছর জেলজীবন কাটানোর পর দেশে ফিরতে পেরেছিলেন তিনি। লিখেছেন মাহমুদ নেওয়াজ জয়
১৯৯২ সাল। ২৫ ফেব্রুয়ারি, ভোর। জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের চেক-ইন কাউন্টারে তখনো রাতজাগা আলসেমি। লাইনে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে— চশমা পরা, বয়স মোটে উনিশ, কাঁধে ভারী ব্যাগ। লন্ডন হয়ে জুরিখ— এই ছিল তার রুট। পনেরো দিনের একটি তথাকথিত সাংস্কৃতিক সমীক্ষা বা স্টাডি ট্যুর শেষ করে সে ফিরছিল নিজ ঠিকানায়।
দক্ষিণ এশিয়া তখন হেরোইন পাচারের এক প্রধান করিডর— মিয়ানমার-ভারত সীমান্ত থেকে শুরু করে ইউরোপের বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত এক জটিল রুট। এই চোরাচালান চক্রে বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হতো এমন তরুণী, ভ্রমণকারী বা ছাত্রছাত্রীদের, যাদের ওপর সহজে কারও সন্দেহ হয় না। এই নির্মম সিস্টেমের একেবারে শেষপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছিল লিয়া; হয়তো নিজের অজান্তেই।
হঠাৎই কাস্টমস অফিসারের চোখ আটকে গেল মেয়েটির ওপর। কেন আটকেছিল, তা তিনি তখনো বুঝতে পারেননি। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে শুরু হয় পুঙ্খানুপুঙ্খ তল্লাশি। আবিষ্কৃত হয় এক লোমহর্ষক সত্য— তার কাপড়ের নিচে থাই ও পেটে স্কচটেপ দিয়ে সযত্নে প্যাঁচানো রয়েছে সাড়ে সাত পাউন্ড (প্রায় সাড়ে তিন কেজি) হেরোইন! এত বিশুদ্ধ এবং নিখুঁতভাবে লুকানো সেই মাদক দেখে অফিসাররা নিশ্চিত হন, এই চালান কোনো শৌখিন বা এলোমেলো চেষ্টা নয়; বরং কোনো এক সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের অংশ।
মেয়েটির পূর্ণ নাম এলিয়াদাহ ম্যাককর্ড। জন্ম ১৯৭৩ সালের ২৭ মার্চ, হিউস্টন, টেক্সাসে। বন্ধুরা ভালোবেসে ডাকত লিয়া।
আঠারো বছর বয়সে সে বাড়ি ছেড়েছিল। এক বন্ধুর সঙ্গে নিয়েছিল একটি ভাড়া অ্যাপার্টমেন্ট। কিন্তু কয়েক মাস না যেতেই ফিকে হয়ে আসে স্বপ্ন। পকেট যখন প্রায় শূন্য, ঠিক তখনই সেই রুমমেট নিয়ে আসে এক লোভনীয় অথচ সর্বনাশা প্রস্তাব— একটি নির্দিষ্ট মিশনে শুধু একটি গন্তব্যে ব্যাগটি পৌঁছে দিতে হবে, এই তো সামান্য কাজ!
লোভের ফাঁদে পা দিয়ে লিয়া রাজি হয়ে যায় এবং চলে আসে বাংলাদেশে। পনেরো দিন সে কীভাবে কাটিয়েছে, কার সঙ্গে মিশেছে বা কোথায় ঘুরেছে— তার কোনো স্পষ্ট বিবরণ কোথাও নেই। শুধু টিকে আছে শেষ দৃশ্যটি— বিমানবন্দর, কাস্টমস কাউন্টার এবং তল্লাশির সেই অবধারিত মুহূর্ত।
গ্রেপ্তারের পর বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয় দ্রুতগতিতে। একটানা চল্লিশ মিনিট ধরে চলে রায়ের পাঠ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো মার্কিন নাগরিককে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড দেওয়া হলো।
মাদক পাচারের সর্বোচ্চ সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ডও হতে পারত। কিন্তু বিচারক সেই পথে হাঁটেননি; তার পর্যবেক্ষণ ছিল, মেয়েটি কোনো অভ্যাসগত মাদক কারবারি নয়, বরং চক্রের এককালীন বাহক মাত্র। শেষ পর্যন্ত তাকে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এজলাসের বাইরে তখন সাংবাদিকের উপচে পড়া ভিড়, নোট নিচ্ছেন মার্কিন দূতাবাসের প্রতিনিধিরা। দুই দেশের কূটনৈতিক মহলে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে মামলাটি।
বিদেশ বিভুঁইয়ে, পরিবার থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে সেই সাজার অঙ্কটা হয়ে ওঠে আরও ভারী। কারাগারের চার দেয়ালে তার দিনগুলো শুরুতে ছিল নিঃসঙ্গ ও যন্ত্রণাময়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লিয়ার আচরণেও পরিবর্তন আসে। কারাগারের নথিতে সে পরিচিত হয়ে ওঠে এক ‘মডেল প্রিজনার’ হিসেবে।
কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি এক মার্কিন তরুণী শিখলেন বাংলা ভাষা। সোপান গড়ে উঠল অন্য ধর্মের মানুষগুলোর সঙ্গে মেলবন্ধনের— তিনি শোনালেন নিজের খ্রিস্টধর্মের কথা, বিনিময়ে জেনে নিলেন তাদের হিন্দু ও মুসলিম বিশ্বাসের গভীরতা। কিন্তু শুধু ভালো আচরণই নয়; বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ ও মার্কিন ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট এজেন্সির (ডিইএ) সঙ্গে মাদকবিরোধী অভিযানে সহযোগিতা করা শুরু করে লিয়া। সেলের ভেতরে বসে যে চক্র তাকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধেই তথ্য দিতে শুরু করে সে— শুধু নিজের মুক্তির আশায় নয়, বরং যাতে অন্য কোনো তরুণী একই ফাঁদে না পড়ে।
এই সিদ্ধান্তের ঝুঁকি ছিল মারাত্মক। যে ভয়ংকর নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে সে তথ্য দিচ্ছিল, তাদের দীর্ঘ হাত কারাগারের প্রাচীর ভেদ করে ভেতরেও পৌঁছাতে পারত।
সবমিলিয়ে সাড়ে চার
বছর কাটে একটি বিদেশি কারাগারে। এদিকে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক করিডরে এ মামলায় নাম জড়ায়
কংগ্রেসম্যান বিল রিচার্ডসনের— যিনি পরবর্তীকালে ইরাক, উত্তর কোরিয়া ও কিউবার মতো
বিশ্বের নানা প্রান্তে
জিম্মি ও বন্দি মুক্তির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি পান।
রিচার্ডসন বাংলাদেশ সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠান। যুক্তিতে তুলে ধরেন লিয়ার সাড়ে চার বছরের সংশোধিত আচরণ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সহায়তার তথ্য। বাংলাদেশ সরকার সেই অনুরোধ বিবেচনা করে। অবসান ঘটে সাড়ে চার বছরের বন্দিদশার। সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি পান এলিয়াহ ম্যাককর্ড।
এ গল্পটা এখানেই ফুরিয়ে যেতে পারত— কোনো পুরনো পত্রিকার পাতা কিংবা ধুলোজমা আর্কাইভে চিরতরে হারিয়ে। কিন্তু তা হয়নি। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের জনপ্রিয় তথ্যচিত্র সিরিজ ‘লকড আপ অ্যাবরোড’-এ স্থান করে নেয় লিয়ার চাঞ্চল্যকর জীবন। এই সিরিজটি বিদেশের মাটিতে মাদক মামলার ফাঁদে পড়া মানুষদের অবিশ্বাস্য সত্য ঘটনাগুলো তুলে ধরে। লিয়ার পর্বটি ছিল বেশ আলোড়ন সৃষ্টিকারী, কারণ এখানে শুধু অপরাধ ও শাস্তির গল্পে থেমে থাকেনি, বরং কারাগারের ভেতর থেকে এক তরুণীর ঘুরে দাঁড়ানোর ও প্রতিরোধ গড়ার গল্পও উঠে এসেছে।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লিয়ার আচরণেও পরিবর্তন আসে। কারাগারের নথিতে সে পরিচিত হয়ে ওঠে এক ‘মডেল প্রিজনার’ হিসেবে
১৯৯৬ সালের ৩০ জুলাই রিচার্ডসনের হাত ধরে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরে সে। ওয়াশিংটন ডিসিতে এক দিনের যাত্রাবিরতি শেষে ১ আগস্ট মায়ের হাত ধরে পৌঁছায় হিউস্টনে। তবে থেমে থাকেনি এই সংগ্রামী নারী। যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে ২০০১ সালের জুনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে। এর পাশাপাশি হিউস্টনের নাসার জনসন স্পেস সেন্টারে এবং পরে এইএস করপোরেশনে পূর্ণকালীন চাকরি করে নিজের কর্মদক্ষতার প্রমাণ দেয়।
বর্তমানে থিতু হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে; জীবন কাটাচ্ছে নিজের মতো করে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের এক সাক্ষাৎকারে ফেলে আসা সেই অধ্যায় নিয়ে জানায়, এই কঠিন অভিজ্ঞতা তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। এমন বিপদে সে আর কখনো জড়াতে চায় না; কিন্তু অতীতে যা ঘটে গেছে, তার একটি বিন্দুও বদলাতে চায় না। ফেরার সময় ঢাকার বিমানবন্দরে এক সাক্ষাৎকারে েস সাবলীল বাংলায় বাংলাদেশের মানুষের প্রতি তার অন্তরের গভীর ভালোবাসার কথা জানিয়ে আবারও এই মাটিতে ফিরে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। ভিনদেশের দেওয়া দ্বিতীয় সুযোগটি কতটা সার্থক করে তুলেছে, সেই সোনালি গল্পটাই সে উপহার দিতে চায়।







