ভুতুড়ে বান্ধব মিল
- ১০০ বছর আগে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস বান্ধব কটন মিল স্থাপন করেছিলেন। এখন এটিকে ঘিরে ডালপালা মেলেছে নানা অতিপ্রাকৃত কাহিনি। লিখেছেন সরওয়ার পাঠান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জাফর সাহেবের বাড়ি নরসিংদীর পলাশের এক গ্রামে। তার বড় নেশা— মাছ ধরা। বাড়ির পাশেই একটি জায়গা— পঞ্চবটী। নামের মতোই একসময় এখানে ছিল পাঁচটি বটগাছ। পাশেই দাঁড়িয়ে আছে এক পরিত্যক্ত কটন মিল। প্রায় ১০০ বছর আগে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস এটি স্থাপন করেছিলেন। এখন সেটি ধ্বংসস্তূপের মতো পড়ে আছে। নীরব, অচল অথচ অদ্ভুতভাবে জীবন্ত।
জায়গাটির কুখ্যাতি অনেক পুরনো। সন্ধ্যা তো দূরের কথা, দুপুরের দিকেও মানুষ খুব একটা যায় না। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এখানে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। সেই রক্তাক্ত ইতিহাস যেন এখনো মাটির ভেতরে জমাট বেঁধে আছে।
এরপরের সময়টায় এই কটন মিল হয়ে ওঠে অপরাধীদের আস্তানা। ডাকাতদের লুটের মাল ভাগাভাগি, গ্যাংরেপ— নানা ভয়ংকর ঘটনার সাক্ষী এই জায়গা। ফলে মানুষের বিশ্বাস, এখানে অগণিত অতৃপ্ত আত্মা ঘুরে বেড়ায়। দিনের আলোতেও তাই জায়গাটা এড়িয়ে চলে সবাই।
ঠিক তখনই একটা অদ্ভুত শব্দ ভেসে এলো কানে। যেন দূর থেকে কেউ গুনগুন করে গান গাইছে
তবু শীতলক্ষ্যার এই অংশে মাছের প্রাচুর্য ছিল বরাবরই। বড় বড় বোয়াল মাছের জন্য জায়গাটা বিখ্যাত। এক শীতের রাতে জাফর সাহেব ঠিক করলেন— তিনি এখানেই মাছ ধরবেন।
গভীর কুয়াশায় ঢাকা চারপাশ। নদীর পানি স্থির, বাতাস ঠান্ডা। তিনি ছিপ ফেললেন। অপেক্ষা শুরু হলো। ঠিক তখনই একটা অদ্ভুত শব্দ ভেসে এলো কানে। যেন দূর থেকে কেউ গুনগুন করে গান গাইছে।
খেয়াল করলেন, পেছনের দিকটা খানিকটা উঁচু হয়ে গেছে, উঠে গেছে কারখানার ডরমিটরির দিকে। শব্দটা যেন সেখান থেকেই আসছে।
ছিপটা রেখে ধীরে ধীরে এগোতে লাগলেন। কুয়াশার মধ্যে পথ অস্পষ্ট। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলেন পঞ্চবটির কাছে, এখন আর পাঁচটি গাছ নেই, কেবল একটি বেঁচে আছে।
শব্দটা এবার স্পষ্টতর— গানের সুর।
এই নির্জন রাতে কে গান গাইছে?
তিনি আরও এগোলেন। সামনে সেই জায়গা। কারখানার ভেতরে বিচ্ছিন্ন এক অংশ, যাকে স্থানীয়রা বলে ‘জলকুয়া’। একসময় এই কুয়া দিয়ে শীতলক্ষ্যা থেকে পানি টেনে আনা হতো। এখন সেটি অন্ধকার গহ্বরের মতো। ঠিক তখনই, একটা ছায়া চোখে পড়ল।
একজন নারী।
সুরটা এখন পরিষ্কার— পরিচিত, খুবই পরিচিত। তিনি নিজের মনে প্রশ্ন করলেন— এটা কি হ্যালুসিনেশন? একসঙ্গে দেখা আর শোনার বিভ্রম? অবচেতনভাবে তিনি কারখানার ভেতরে পা রাখলেন।
নারীটি ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে। আর যখন মুখটা স্পষ্ট হলো— জাফর সাহেবের বুক কেঁপে উঠল।
এ তো গ্রামের সেই মেয়ে, শিল্পী রানী। তিন বছর আগে হঠাৎ হারিয়ে গিয়েছিল। মেয়েটি অসাধারণ গান গাইত, এই সুরটাও সেই সুর।
তিনি কিছু বলার আগেই, মেয়েটি মিলিয়ে গেল। পরক্ষণেই চারপাশ আলোকিত হয়ে উঠল।
পরদিন সকালেই কয়েকজন স্থানীয়কে নিয়ে আবার ফিরে এলেন তিনি।
জলকুয়ার ভেতরে নেমে খুঁজতে শুরু করলেন।
আর সেখানে মিলল একটি কঙ্কাল।
একটি মেয়ের কঙ্কাল।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস এই কারখানাটি গড়েছিলেন এক স্বপ্ন নিয়ে। দেশের শ্রম, দেশের কাঁচামাল দিয়ে দেশেই কাপড় উৎপাদন। জঙ্গল পরিষ্কার করে গড়ে ওঠে আধুনিক এই মিল। সেখানে ছিল জং বাহাদুর নামে এক দারোয়ান। একটি কুকুরী থাকত সবসময় তার কাছে। লোককথা বলে, তার মৃত্যুর পরও নাকি তাকে রাতে পাহারা দিতে দেখা যায়।
আরও গল্প আছে।
একজন জেলে রাতে মাছ ধরছিল। হঠাৎ দেখে নদীতে ভেসে আসছে একটি জাহাজ, যা এখন আর চলে না এই নদীতে। জাহাজ থেকে নেমে এলো এক সাহেব, স্যুট পরা। সে হেঁটে ঢুকে গেল কারখানার ভেতরে। আর সঙ্গে সঙ্গে জ্বলে উঠল সব আলো। মেশিনের শব্দ, মানুষের কোলাহল। কারখানা যেন আবার জীবিত!
ভয়ে জেলে পালিয়ে এসে গ্রামবাসীদের বলল— ‘কারখানা আবার চালু হয়েছে!’
এখানে একটা বিখ্যাত শ্মশানঘাট আছে। দিনের বেলা সাধারণ মনে হলেও সন্ধ্যা নামলেই জায়গাটা যেন অন্য এক জগতে ঢুকে পড়ে। একবার দুজন পথচারী নাকি সন্ধ্যার দিকে সেখানে গিয়ে দেখে, এক কোণে যেন আগুন জ্বলছে। মানুষ পোড়ানোর মতো দৃশ্য। তারা কাছে যেতেই দুজন অচেনা মানুষ এগিয়ে এসে প্রশ্ন করে, ‘তোমরা কারা?’ কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত ঠান্ডা সুর। ভয় পেয়ে তারা নিজেদের পরিচয় দেয়। কিন্তু উত্তর আর আসে না। সেই দুজন লোক যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে যায় অন্ধকারে।
কারখানাটি ঘিরে আরকটি রহস্যময় গল্প শোনা যায়। বহু বছর আগে বসন্তের মহামারীর সময় এক জেলে নাকি দেখেছিল, এক নারী নদীর ওপর দিয়ে হেঁটে আসছে। তার একটি চোখ নেই, অন্যটি অদ্ভুতভাবে জ্বলজ্বল করছে। সে ধীরে ধীরে নদী পেরিয়ে ঢুকে যায় পরিত্যক্ত কটন মিলে। পরদিন থেকেই আশপাশের গ্রামে গুটি বসন্ত ছড়িয়ে পড়ে। তখন লোকজন অনুমান করে শীতলা দেবী নিজেই নেমে এসেছিলেন, আর সেই থেকেই মিলটা হয়ে ওঠে আতঙ্কের আরেক নাম। এখনো স্থানীয়রা সূর্য ডোবার পর ওই পথে হাঁটে না। আর মাঝেমধ্যে ভেসে আসে সেই করুণ সুর, কেঁপে ওঠে নিশীথ রাত।





