পাঠকের ভয়
পুকুরে কে ছিল?

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঝড়ের পর পুকুরটির চারপাশে এমন বাজে গন্ধ কেন? বাড়ির ভেতরে রহস্যময় এই শব্দের কারণ কী? নিজের জীবনের ব্যাখ্যাতীত এক অভিজ্ঞতার গল্প শুনিয়েছেন ফাহিম মাশরুর
সালটা ১৯৯৮, বগুড়ার ছোট্ট এক শহরতলি সোনাতলা। বাবার চাকরির সুবাদে সেখানে সপরিবারে থাকা। পরিবার বলতে মা-বাবা আর আমি। ছিমছাম তিন কামরার এক বাসা। দুই রুমে আমরা থাকি, এক রুমে অফিস। সামনে বড় উঠান, পেছনে পুকুর, পুকুরের পাড় ঘেঁষে রেললাইন। দিনে দুবার রেলের কুউউ ঝিকঝিক শব্দে পুরো এলাকা থাকে মুখরিত। পুকুরে খাবি খায় মাছ, সেই মাছ বড়শি দিয়ে ধরার যে আনন্দ, সে আর বলে বোঝাবার নয়। এই পুকুরই যে আমার পরিবারের জন্য এত বড় দুঃস্বপ্ন বয়ে আনবে, সেটা হয়তো আমরা কল্পনাও করিনি।
এক ঝড়ের রাত। বাবা অফিসের ট্যুর থেকে ফিরলেন। সঙ্গে নিয়ে এলেন বিরাট আকারের জোড়া ইলিশ। দেখে আমার সে কী আনন্দ! মা ইলিশ কাটতে বসলেই বাধে বিপত্তি। ইলিশ যে একটু নরম! জোড়া ইলিশ পেটে না গিয়ে পড়ল বাড়ির পেছনের সেই পুকুরে। মাছ ভাজা না খাওয়ার কষ্ট নিয়েই ঘুমিয়ে পড়লাম সেই রাতে। এই ঘুম যে বহুদিনের ঘুমহীন রাতের শুরু, সেটা ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি কেউ।
পরদিন সকাল। ঝড়ের দাপট কমেছে কিছুটা। আশপাশে ঝড়ের ক্ষত এখনো প্রকট। মা পুকুরের ধারে যেতেই পেলেন বিকট গন্ধ। ঝড়ে কিছু মরে পড়ে আছে, এ ভেবে আর বেশিদূর এগোলেন না।
দুপুরে খাওয়াদাওয়া শেষ করে যখন ঘুমাতে যাব, তখনই পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল। মনে হলো ছোটখাটো এক ভূমিকম্প। দৌড়ে বাইরে এলাম। কিন্তু আশপাশের কেউ তো বের হয় না। পাশের বাড়িতে গিয়ে শুনি, তারা তো কিছুই টের পায়নি!
এই পুকুরই যে আমার পরিবারের জন্য এত বড় দুঃস্বপ্ন বয়ে আনবে, সেটা হয়তো আমরা কল্পনাও করিনি
এরপর এলো সেই রাত। বাবা অফিসের কাজে প্রতিদিনের মতোই বাইরে। সন্ধ্যার পর হঠাৎ পুরো বাড়িতে তীব্র বাজে গন্ধ। কোথাও কোনো ময়লা নেই, কিন্তু বাজে গন্ধটা যাচ্ছে না। পাশের বাড়িতে গেলাম, সেখানে তো কিচ্ছু নেই! মায়ের চোখেমুখে তখন খানিকটা ভয়ের আভাস।
রাতে বাবা বাড়ি ফিরলেন। খাবার খেয়ে ঘুমাতে যাব। ঠিক তখন অফিস রুমে বিকট আওয়াজ। সবকিছু কেউ ভেঙেচুরে একাকার করে ফেলছে। দৌড়ে বাবা রুমে গেল। ওমা, রুমে তো সব ঠিকঠাকই আছে।
অফিস রুম বন্ধ করে বাবা শোবার ঘরের দিকে এগোতেই পেছন থেকে তার গলা টিপে ধরল কেউ। বাবার গোঙানি শুনে আমরা মা-ছেলেও সেদিকে দৌড়। গিয়ে দেখি বাবা মাটিতে পড়া।
বাবাকে ধরে যখন রুমে নিয়ে এলাম, ততক্ষণে সেই আওয়াজ পৌঁছে গেছে চরমে। শুধু অফিস রুমে নয়, আমাদের রুম থেকেও থেমে থেমে আসছে আওয়াজ। ছোট্ট আমি তো ভয়ে জড়সড়ো! মা বাবাকে সামলাবেন না আমাকে, সে দ্বিধায় দিশাহারা। ভয়ংকর আওয়াজে তখন বাড়িতে টিকে থাকার জো নেই। তিনজন অনেক কষ্টে বেরিয়ে এলাম বাড়ি থেকে। অনেক চেষ্টায় ঘুম ভাঙল পাশের বাড়ির আন্টিদের, আমাদের ভয়ার্ত চোখমুখ দেখে আন্টিও বুঝে গেল, কিছু একটা হয়েছে। পরদিন বাড়ি ফিরলাম। দুপুরের পর থেকে ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। এখন কী করার? শেষমেশ বাবা দ্বারস্থ হলেন মসজিদের ইমামের। আমরা গত কয়েক দিনের সবকিছু জানালাম। ইলিশের গল্পটা কোনো এক কারণে ভুলে গেলেন মা। ইমাম অবশ্য সব শুনে নিজে থেকেই বললেন, পুকুরে কি কিছু ফেলেছেন? আমাদের সবার আর বুঝতে বাকি রইল না। সে ইলিশেই তাহলে বিপত্তি!
ইলিশের সেই ব্যাপারটা শুনেই ইমাম গেলেন পুকুরপাড়ে। বিড়বিড় করে কিছু একটা বললেন। আমরা সেখানে প্রায় ১০ জনের মতো উপস্থিত। সবাই এবার শুনতে গেল সেই গোঙানি। এতজন মানুষ একসঙ্গে কি ভুল শুনতে পারে?
বেশ কিছু সময় পর থামল আওয়াজ। ঘরে ফিরলাম আমরা। বিশেষ পদ্ধতিতে পুরো বাড়ি ‘বন্ধ’ করে দেবেন তিনি, জানালেন এমনটাই।
বাড়ি বন্ধ হলো। আওয়াজ কমল, গন্ধ আর ফিরল না। কিন্তু প্রায় এক মাস পর সেই পুকুরে ডুবে মারা গেল পাড়ার দুজন। আনন্দের পুকুর তখন রীতিমতো আতঙ্ক।
এসবের মধ্যেই বাবার বদলি হলো। বগুড়ার পাট চুকিয়ে আমাদের সিরাজগঞ্জ ফেরার সময় এলো। যেদিন চলে আসি, সেদিন হঠাৎ পুকুরপাড়ে দেখলাম এক মেয়ে বসে আছে। আমাকে দেখে একটু হেসে বলল, আহা। তোমার মায়ের মজার ইলিশ তো আর খেতে পারব না তাহলে!
চিৎকারে আমি জ্ঞান হারালাম। চোখ খুলে দেখি আমি গাড়িতে। পুরো ব্যাপারটি কি শুধুই আমার কল্পনা, নাকি বাস্তব?


