শাঁখচুন্নি

আঁকা : অরবিন্দ হালদার
গ্রামের পুরনো বাড়িটিতে নতুন বউ এসেছে মাত্র তিন দিন। সারা দিনের বিয়ের আয়োজন শেষে সবাই যখন গভীর ঘুমে, নববধূটি তখনো জেগে। হঠাৎ রান্নাঘরের দিক থেকে ভেসে এলো চুড়ির মৃদু রিনঝিন শব্দ। কৌতূহলবশত বধূটি বারান্দার ধারের সেই অন্ধকার কোণটির দিকে তাকাতেই তার রক্ত হিম। দেখল, লাল পাড় শাড়ি পরা এক নারী অত্যন্ত নিপুণ হাতে মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা চালগুলো গুছিয়ে রাখছেন। নারীর সিঁথিতে চওড়া সিঁদুর আর হাতে শাঁখা-পলা। পরক্ষণেই যেন মিলিয়ে গেল বাতাসের ঝাপটায়। নতুন বউটি বুঝতে পারল, এ বাড়ির পুরনো শাঁখচুন্নিটি আজও তার সংসার আগলে বসে আছে। কয়েক রাত পর নতুন বউ শুনল, কেউ যেন তার নাম ধরে ডাকছে।
বাঙালি লোকগাথায়, শাঁখচুন্নি হলো এমন এক বিবাহিত নারীর আত্মা, যার জীবন অকালে বা কোনো অবিচারের কারণে শেষ হয়ে গেছে। মৃত্যুর পরও সে তার বিবাহিত জীবনের চিহ্নগুলো— শাঁখা, পলা, সিঁদুর আর লাল পাড় শাড়ি সযতনে আগলে রাখে। সংসারের মায়া কাটিয়ে সে কখনোই অন্য কোথাও যেতে পারে না।
শাঁখচুন্নির মূল বিচরণক্ষেত্র মানুষের বসতবাড়ি। বারান্দা, রান্নাঘরের চুলার পাশে, বিয়ের ঘর কিংবা বাড়ির আঙিনায় থাকা পুরনো কোনো গাছ তার প্রিয় আস্তানা। বিশেষ করে বিয়ের উৎসব, ফসল কাটার সময় বা লক্ষ্মীপূজার মতো পারিবারিক পার্বণগুলোতে তার উপস্থিতি টের পাওয়া যায় বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। নতুন বিয়ে হওয়া পরিবারে কিংবা যেখানে সম্প্রতি কেউ শোকের ছায়া অতিক্রম করেছে, সেখানে তার আনাগোনা বেশি থাকে।
যদি পরিবারের কেউ বাড়ির নিয়ম বা শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করে কিংবা সংসারের পবিত্রতা নষ্ট করে, তবে সে রুদ্রমূর্তি ধারণ করতে পারে। তখন প্রদীপের শব্দ বা দুঃস্বপ্নের মাধ্যমে সে তার অসন্তোষ প্রকাশ করে। খামারের গবাদি পশুকে ভয় দেখানো, দুধ টক করে দেওয়া কিংবা গভীর রাতে চেনা মানুষের গলায় ডাক দিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করার মাধ্যমে সে নিজের শক্তির জানান দেয়।
শাঁখচুন্নিকে চিনে নেওয়ার কিছু সংকেত আছে। তার আগমনে বাতাসে হঠাৎ প্রদীপ বা হলুদের গন্ধ ভেসে আসবে। অনেক রাতে নির্জন করিডরে শাড়ির খসখস শব্দ কিংবা শীতল পায়ের পাতার স্পর্শেও শাঁখচুন্নির উপস্থিতি বোঝা যায়। কিছু অঞ্চলে তার পায়ের পাতা উল্টো হওয়া নিয়ে কথা প্রচলিত থাকলেও মূলত শাঁখা-পলার শব্দ আর সাজপোশাক দেখেই তাকে শনাক্ত করা হয়।




