নেশার ঘোরে হিটলার

হিটলারের সঙ্গে ডক্টর মোরেল (পেছনে চশমা পরিহিত) -ছবি: সংগৃহীত
বিগত শতাব্দীর মানব ইতিহাসের ভয়ংকর অন্ধকার এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল এডলফ হিটলারের হাত ধরে। উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, গণহত্যা আর মিথ্যাচারের সিংহাসনে বসে পৃথিবী শাসন করতে চেয়েছিলেন তিনি। পরাজয় এবং বার্লিনের বাংকারে আত্মহননের ভেতর দিয়ে সেই কালো অধ্যায়ের পর্দা নামে।
হিটলারের ব্যক্তিগত জীবনের বহু বিবরণ তার ওপর পরিচালিত অনুসন্ধান ও গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি তেমনি এক অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, ১৯৪১ সালের গোড়া থেকেই বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য সেবনে অভ্যস্ত ছিলেন হিটলার। সেগুলোর বেশিরভাগই ছিল ইনজেকশন। সেই মাদকদ্রব্য তাকে নিয়মিত সরবরাহ করতেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক থিওডর মোরেল। অথচ হিটলার প্রচার করতেন, তিনি অধূমপায়ী।
ডক্টর মোরেলের রোজনামচা থেকে হিটলারের মাদকদ্রব্যের তালিকা খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা। সেখানে আছে অক্সিকোডিন, মেথামফেটামিন এবং মরফিনের মতো মারাত্মক সব উপাদানের নাম। মেথামফেটামিন এক ধরনের বিশেষ ক্রিস্টাল মেথ, যা মানুষের স্নায়ুকে উত্তেজিত করে। কখনো বিষাদ কাটানোর জন্য চিকিৎসকরা এ উপাদানে তৈরি ওষুধ রোগীকে সেবন করার পরামর্শ দেন। অক্সিকোডিন আরেক ধরনের ব্যথানাশক ওষুধের উপাদান। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে সেবনে মানবদেহে আসক্তি তৈরি হয়। গবেষণা বলছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি সৈন্যদেরও স্নায়ুকে আরও বেশি অস্থির করার জন্য সরবরাহ করা হতো মেথ ক্রিস্টাল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন ফুরিয়ে আসছে। অস্থিরতা আর হতাশা হিটলারকে গ্রাস করছে একটু একটু করে। বার্লিনে বাংকারের ভেতরে হাঁটাচলা করতেও তার সমস্যা হচ্ছিল। উঠে দাঁড়ালেও শরীর কাঁপত। গবেষকদের অনেকে মনে করেন, পারকিনসন্স রোগ তার শরীর দখল নিচ্ছিল। আবার উল্টোদিকে অনেক গবেষকের ধারণা, অতিমাত্রার মাদকাসক্তির কারণে তার শরীর কাঁপত। বাইরে তখন মিত্রবাহিনীর কামানের গোলা আছড়ে পড়ছে। চারদিক থেকে এগিয়ে রুশ আর মার্কিন সৈন্যরা। ওই সময়ে নেশাদ্রব্য যথাসময়ে না পাওয়ায় বাংকারের ভেতরে বেশিরভাগ সময় হিটলারকে অস্থির দেখাত। চিকিৎসকদের মত হচ্ছে, উইথড্রোয়াল সিন্ড্রোম তৈরি হচ্ছিল তার শরীরে। দ্রুত এক ধরনের শারীরিক ও মানসিক অবসাদে আক্রান্ত হয়ে পড়তেন ইতিহাসে স্বৈরাচারের আইকনিক চরিত্র হিটলার। ভুল হতো সিদ্ধান্ত নিতে, যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণে।
মোরেলের রোজনামচায় উল্লেখ আছে, নাৎসি পার্টির সদস্য এবং জার্মানির জনগণের উদ্দেশে হাত-পা ছুড়ে উত্তেজক ভাষণ দেওয়ার আগে হিটলার মাদক সেবন করে নিতেন। মাদকের প্রভাবে উগ্রতা ছড়ানো তার বাক্যবাণ পার্টির কর্মী এবং জনতাকে ক্ষেপিয়ে তুলত। হিটলারের ছিল ইনসমনিয়া। রাতগুলো ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। তখন ফুয়েরারকে ঘুম পাড়ানোর জন্য ডা. মোরেল ব্যবহার করতেন বারবিচুরেট। এই ওষুধ মানুষের মস্তিষ্ককে শান্ত করার জন্য শরীরে কাজ করা রাসায়নিক গামা-অ্যামিনোবুটারিক অ্যাসিডের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে। কিন্তু দিনের পর দিন এই বারবিচুরেট সেবন তৈরি করে আসক্তি। হিটলারের সেনাপতিরা নিয়মিত মাদক সরবরাহকারী সেই ডাক্তারকে একেবারেই পছন্দ করতেন না। কিন্তু হিটলার তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন।
মাদকাসক্ত হিটলারকে নিয়ে বই লিখেছেন জার্মান কথাশিল্পী নরম্যান ওহলার। ‘ব্লিৎজড: ড্রাগস ইন নাৎসি জার্মানি’ বইতে তিনি লিখেছেন, হিটলার প্রচুর পরিমাণে নেশা করতেন। ইনজেকশন নিতে নিতে তার হাতের অবস্থা এমন হয়েছিল যে, ডা. মোরেল অনেক সময় সুই ঢোকানোর শিরা খুঁজে পেতেন না।
ডা. মোরেলের ভাষ্য অনুযায়ী, হিটলারকে হত্যার ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর থেকে তার নেশায় আসক্তি দ্বিগুণ হয়ে যায়। ১৯৪৪ সালের সেই ঘটনার পর থেকে তাকে একটা চেয়ারে কিছুক্ষণ সময়ও স্থির হয়ে বসতে দেখা যেত না। তখন উত্তেজিত হিটলারকে শান্ত করার জন্য ‘ইকুয়েডল’ নামে একটি উপাদান ইনজেকশনে ভরে নিয়ে তাকে দিতে হতো। সেই ‘ইকুয়েডল’ উপাদানগত বিচারে হেরোইনের প্রায় সমান।
ওহলার তার বইতে শেষে এক জায়গায় লিখেছেন, “জার্মানি নেশায় আসক্ত এক দানবের পাগলামি দেখছিল তখন। আর সেই দানবের নাম ‘এডলফ হিটলার’।”




