মেঘলা চিতা দিবস আজ
গহিন অরণ্যের মেঘলা রাজকুমার

বাংলাদেশের অরণ্যে এখনো আছে মেঘলা চিতা। রাঙামাটির একটি সংরক্ষিত বন থেকে ক্যামেরা ট্র্যাপে তোলা হয়েছিল এই ছবিটি- সুপ্রিয় চাকমার সৌজন্যে
বছর কয়েক আগের কথা। বান্দরবানের দার্জিলিংপাড়ায় পৌঁছার আগে পাহাড়ি উঁচু পথে হেঁটে দু-দণ্ড জিরিয়ে নিতে বমদের একটি ছাপরা দোকানে বসলাম। বাগান থেকে আনা তাজা কমলা আর লেবুর শরবত গলায় ঢালতে ঢালতে বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর ছবি ওদের দেখাচ্ছিলাম। মেঘলা চিতাকে চিনতে দেরি হলো না। বলছিল, রাতের আঁধারে আশপাশের পাহাড়েই ঘোরে রহস্যময় এ শিকারিরা। কাপ্তাইয়ের জঙ্গলেও ‘লতা বাঘের’ (মেঘলা চিতার স্থানীয় নাম) অনেক গল্প শুনেছি। তবে দুর্ভাগ্য, দেখেছি শুধু কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক ও ভারতের দার্জিলিংয়ের চিড়িয়াখানার বন্দিদশায়।
মেটে-বাদামি শরীরে মেঘের মতো ছোপ ছোপ— তাইতো এর নাম মেঘলা চিতা বা মেঘা বাঘ। গেছো বাঘ বা লাম চিতা নামেও পরিচিতি আছে। ১৮ থেকে ২০ কেজির শরীর, লম্বায় তিন ফুটের বেশি। গাছে হেঁটে বেড়ানোর সময় শরীরের ভারসাম্য ঠিক রাখতে দীর্ঘ রাজকীয় লেজটা ভরসা। বৃক্ষচর জীবনযাপনের কারণে এদের পায়ের পাতা শক্ত। বানর-হনুমান প্রিয় শিকার হলেও গাছে ওত পেতে থেকে নিচে চলা হরিণ, খরগোশ বা বুনো শূকরের ছানার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তেও জুড়ি নেই। গাছ থেকে সোজা নিচের দিকে মাথা রেখে নেমে আসার বিরল ক্ষমতাও আছে।
একসময় এমনকি দেশের গ্রামীণ বনেও গেছো বাঘেরা ছিল। সিলেট অঞ্চলে যে প্রচুর ছিল, তাতে সন্দেহ নেই। ছোটবেলায় হবিগঞ্জে নানাবাড়িতে গেলে বিশাল লোহাগড়া বাঘ, মাঝারি সাইজের ফুলেশ্বরীসহ নানা ধরনের বাঘের গল্প শুনতাম। পরে জানতে পারি এই ফুলেশ্বরীই গেছো বাঘ বা লাম চিতা। মুক্তগাছার জমিদার ব্রজেন্দ্রনারায়ণ আচার্য চৌধুরী ‘শিকার ও শিকারী’ বইতেও লিখেছেন ফুলেশ্বরীর কথা। কোথাও কোথাও চিতা বাঘকেও ফুলেশ্বরী বলা হয়। প্রায় ১০০ বছর আগে আসাম-সিলেটের সিভিল সার্জন কর্নেল এইচ এস উড লিখেছেন সিলেটের বনে এদের অবাধ বিচরণের কথা। সাইকেলে যাওয়ার পথে গ্রামবাসীর মেঘলা চিতার বাচ্চা তুলে নিয়ে চম্পট দেওয়া কিংবা জমিদারপুত্রের বাঘডাশা মনে করে লাম চিতার বাচ্চা পোষার কাহিনিগুলো আজও শিহরন জাগায়। স্থানীয়রা উড সাহেবের বর্ণনায় গাছের ৮০ ফুট উঁচুতে থাকা লাম চিতার শিকারের গল্পও উঠে এসেছিল। আমার বিশ্বাস, সিলেট বিভাগের রেমা-কালেঙ্গা, লাঠিটিলা, সাগরনাল কিংবা আদমপুর-খুরমার অরণ্যে এখনো এদের থাকা অসম্ভব নয়। কালেঙ্গার বিখ্যাত গাইড রহিম ভাইও ওই অরণ্যে এদের বসতির তথ্য দিয়েছেন।
হিমালয়ের ৯ হাজার ফুট উচ্চতার পাশাপাশি ম্যানগ্রোভ বনেও চমৎকার মানিয়ে নিতে পারে এরা। ভারতের মিজোরামের ডামপা রিজার্ভ মেঘলা চিতার ঘনত্বের জন্য বিখ্যাত, যা ইঙ্গিত দেয় আমাদের সাজেক-কাসালংয়ের পাহাড়ি অরণ্যে ওরা হয়তো মোটামুটি ভালো সংখ্যাতেই টিকে আছে।
ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স ( সিসিএ) কিংবা সুপ্রিয় চাকমার ক্যামেরা ট্র্যাপে বান্দরবান-রাঙামাটির গহিন বনে ওদের বন্দি হওয়ার খবরে যেমন আনন্দ পেয়েছি, তেমনি ২০১৯ সালে পাহাড়ি শিকারিদের হাতে মৃত এক নাদুসনুদুস মেঘলা চিতার ছবি দেখে মন কেঁদেছে। তারও আগে এক পাহাড়প্রেমীর সূত্রে সাঙ্গু রিজার্ভের ধারে মারা পড়া এক লাম চিতার চামড়ার ছবি দেখে বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করেছিল।
প্রায় ১০০ ডিগ্রি কোণে মুখ হাঁ করতে পারে লাম চিতারা! মাথার খুলির অনুপাতে পুরো বিড়াল গোত্রে এদের শ্বদন্তই সবচেয়ে বড়। এ কারণে প্রাণীপ্রেমীরা ভালোবেসে এদের ডাকেন নয়া জমানার দাঁতাল বাঘ!
বাংলাদেশ ছাড়া ভারত, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ায় টিকে আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সাঙ্গু-মাতামুহুরী, কাপ্তাইয়ের মতো অরণ্যে হয়তো এখনো মোটামুটি সংখ্যায় আছে লাম চিতারা। কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের কোনো কোনো অরণ্যে এমনকি গারো পাহাড় এলাকার খণ্ড বনগুলোতে লাম চিতার দেখা পেতে পারেন।
আজ ৪ আগস্ট, আন্তর্জাতিক মেঘলা চিতা দিবস। বুকের গহিন থেকে একটিই চাওয়া— মানুষের লোভী নজর এড়িয়ে আমাদের বনের উঁচু সব গাছের সবুজ রাজ্যে আরও শত শত বছর স্বাধীনভাবে রাজত্ব করুক অরণ্যের এ আশ্চর্য সুন্দর মেঘলা রাজকুমার-রাজকুমারীরা।
লেখাটি শেষ করতে চাই একটি সুসংবাদ দিয়ে। কক্সবাজারের হাতি অধ্যুষিত এক অরণ্যে ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ে প্রথমবারের মতো ধরা পড়েছে মেঘলা চিতা। বন কর্মকর্তা বিপুল কৃষ্ণ দাস তার পিএইচডি গবেষণার অংশ হিসেবে অরণ্যটিতে বেশ কিছু ক্যামেরা ট্র্যাপ বসিয়েছিলেন। ৩ আগস্ট মোবাইলে আলাপের সময় জানিয়েছেন, বনের আলাদা পাঁচটি জায়গায় ক্যামেরায় বন্দি হয়েছে মেঘলা চিতারা।








