একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি
‘উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও বিপণন (দ্বিতীয় পত্র)’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিপণন বা মার্কেটিং: শব্দের উৎপত্তি
ল্যাটিন ‘Marcatus’ শব্দ থেকে ইংরেজি ‘Market’ শব্দের উৎপত্তি। Market শব্দ থেকে পরে ‘Marketing’ শব্দটি এসেছে যার বাংলা অর্থ হলো ‘বিপণন’। তাই ‘Marketing’ শব্দটির উৎপত্তি ধারাবাহিকভাবে যেভাবে দেখানো যায় তা হলো:
Marcatus > Market > Marketing
ফিলিপ কটলার (Philip Kotler): আধুনিক বিপণনের জনক
ফিলিপ কটলার (Philip Kotler) আধুনিক বিপণন (Modern Marketing)-এর জনক হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত। তিনি ২৭ মে ১৯৩১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের শিকাগো শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ফিলিপ একজন প্রখ্যাত বিপণন বিশেষজ্ঞ, লেখক, অধ্যাপক এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক পরামর্শক।
১৯৬২ সাল থেকে নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে বিপণন বিষয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন। তার মতে, বিপণন শুধু পণ্য বিক্রয় বা মূল্য নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং গ্রাহকের চাহিদা ও সন্তুষ্টি, বিজ্ঞাপন, বিক্রয় উন্নয়ন, বিতরণ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি গ্রাহক-সম্পর্ক গড়ে তোলাই আধুনিক বিপণনের মূল লক্ষ্য।
ফিলিপ কটলারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো Marketing Mix বা Four Ps of Marketing ধারণার জনপ্রিয়করণ। এই চারটি উপাদান হলো—
Product (পণ্য)
Price (মূল্য)
Place (বিতরণ)
Promotion (প্রচার)
এ ছাড়াও তিনি সোসাইটাল মার্কেটিং কনসেপ্ট (সামাজিক বিপণন ধারণা)-এর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এই ধারণা অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানকে শুধু মুনাফা অর্জনের জন্য নয়, বরং গ্রাহকের সন্তুষ্টি ও সমাজের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্যও বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
ফিলিপ কটলার বিপণন বিষয়ে ৬০টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং তার শতাধিক গবেষণাপত্র বিশ্বের বিভিন্ন খ্যাতনামা জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, ফিলিপ কটলার আধুনিক বিপণন তত্ত্বের বিকাশে সর্বাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তার প্রবর্তিত বিভিন্ন ধারণা, বিশেষ করে মার্কেটিং মিক্স (4Ps), মার্কেটিং কনসেপট এবং সোসাইটাল মার্কেটিং কনসেপ্ট আজও বিশ্বব্যাপী ব্যবসায় শিক্ষা ও বিপণন চর্চার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। তার অবদান বিপণনকে একটি আধুনিক, বৈজ্ঞানিক ও গ্রাহককেন্দ্রিক শাস্ত্রে পরিণত করেছে।
বিপণন বলতে কী বোঝায়? (What is meant by Marketing?)
বিপণন বলতে সাধারণভাবে লাভজনক উপায়ে মানুষের প্রয়োজন ও চাহিদা পূরণের ব্যবস্থাকে বোঝায়। অর্থাৎ, ক্রেতার সন্তুষ্টি নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের লাভ বা মুনাফা অর্জনের যে প্রক্রিয়া, তাকে বিপণন বলা হয়।
আধুনিক দৃষ্টিতে, বিপণন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের জন্য মূল্য (Value) সৃষ্টি করে এবং সেই মূল্যের বিনিময়ে গ্রাহকের কাছ থেকে মূল্য বা মুনাফা অর্জনের উদ্দেশে দীর্ঘমেয়াদি ও শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তোলে।
বিপণনের বৈশিষ্ট্য
বিপণনের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—
১. বিপণনের মাধ্যমে গ্রাহকের জন্য মূল্য (Value) সৃষ্টি করা হয়।
২. এটি গ্রাহকের
সঙ্গে
সুদৃঢ়
ও কার্যকর
সম্পর্ক
গড়ে
তোলে।
৩. বিপণনের
মাধ্যমে
প্রতিষ্ঠান
গ্রাহকের
কাছ
থেকে
মূল্য
বা
মুনাফা
অর্জন
করে।
৪. এটি গ্রাহকের
সঙ্গে
দীর্ঘমেয়াদি
সম্পর্ক
সৃষ্টি
ও বজায় রাখতে সহায়তা
করে।
৫. বিপণন একটি ধারাবাহিক
ও চলমান প্রক্রিয়া।
বিপণনের ক্রমবিবর্তন (Evolution of Marketing)
বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিপণন আজ বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিপণনের ক্রমবিবর্তন অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তাই কোনো দেশের জাতীয় ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, সম্পদের পূর্ণ ব্যবহার ইত্যাদি বিপণনের অগ্রগতি তুলে ধরে। রবার্ট এ বার্টেলস তার ‘The History of Marketing Thought’ বইতে লিখেছেন, ১৯০৬ থেকে ১৯১১ সালের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাের্কটিং শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়। নিম্নে বিপণনের ক্রমবিবর্তন সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
১. আত্ম নির্ভরশীলতার যুগ:
মানব সভ্যতার প্রথম যুগে প্রত্যেক মানুষ ছিল আত্মনির্ভরশীল এবং তারা নিজেরাই নিজেদের প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদন করতো। এ সময় তারা বন-জঙ্গলে, পাহাড়ের গুহায় বা নদীর তীরে দলবদ্ধ হয়ে বসবাস করত। শিকার করে জীবন ধারণ করত। ফলে প্রয়োজন মেটানোর পরে বিপণনের জন্য উদ্বৃত্ত কোনো পণ্য থাকত না। এ সময়কে প্রাচীন সভ্যতার যুগও বলা হয়।
২. বিনিময় যুগ: প্রাচীন সভ্যতার একপর্যায়ে নিজের প্রয়োজন মেটানোর পর কারও কারও কাছে একদিকে যেমন কিছু কিছু পণ্য উদ্বৃত্ত থাকত, অন্যদিকে আবার কেউ কেউ ওই প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ করতেও পারত না। ফলে তখন উদ্বৃত্ত পণ্য বিনিময় করে পারস্পরিক প্রয়োজন পূরণ করত। এ সময়কে বিনিময় যুগ বলা হয়।
৩. উৎপাদন যুগ:
পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে লাভবান হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। ফলে অনেকে অধিক পণ্য উৎপাদন করে উদ্বৃত্ত পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে লাভবান হতে চেষ্টা করে। মূলত ১৮৬০ সালের পর থেকে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। তাই ১৮৬০ সাল থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত সময়কে উৎপাদন যুগ বলা হয়।
৪. বিক্রয় যুগ: ১৯২০ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত সময়কে বিক্রয় যুগ বলা হয়। উৎপাদন দক্ষতা এবং উৎপাদকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এ সময়ে ভোক্তাদের পছন্দসই পণ্য ক্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ফলে ভোক্তাদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য বিক্রয় প্রসারের বিভিন্ন কৌশলের উন্নয়ন এ যুগেই ঘটে।
৫. বিপণন যুগ: ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সময়কে বিপণন যুগ বলা হয়। অর্থাৎ ১৯৫০ সাল হতে বিপণন যুগের সূচনাপাত ঘটে এবং তা প্রায় ২ দশক পর্যন্ত চলমান থাকে। এ সময়ে ভোক্তারা তাদের প্রয়োজন, অভাব ও চাহিদার ব্যাপারে সচেতন হয়।
৬. সামাজিক বিপণন যুগ/ মার্কেটিং কোম্পানি যুগ: ১৯৭০ সালের পর থেকে সামাজিক বিপণন ধারণা অনুযায়ী, একটি প্রতিষ্ঠানের উচিত ভোক্তাদের জন্য পণ্য সরবরাহ করা, মুনাফার মাধ্যমে রাজস্ব অর্জন করা এবং একই সঙ্গে টেকসই পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে সমাজের উপকার করা।
বিপণনকারীরা তাদের ক্রেতাদের চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা এমনভাবে পূরণ করার চেষ্টা করে, যা ভোক্তা ও সমগ্র সমাজের মঙ্গলকে ত্বরান্বিত করে।
এ সময়ে জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ রক্ষা, আইন এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিপণনকারী তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।
৭. সম্পর্কভিত্তিক বিপণন যুগ: ১৯৯০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়কে সম্পর্কভিত্তিক বিপণন যুগ বলা হয়। এ সময়ে বিপণনকারীরা ক্রেতা ও অন্যান্য পক্ষের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়ে ওঠে। সম্পর্কভিত্তিক বিপণনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো— ক্রেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক সৃষ্টি করে তাদেরকে স্থায়ী ক্রেতায় রূপান্তর করা।
৮. সামাজিক যোগাযোগ/ মোবাইল বিপণন যুগ:
২০১০ সাল হতে বর্তমান সময় পর্যন্ত সময়কে সামাজিক যোগাযোগ ও মোবাইল বিপণনের যুগ বলা হয়। বিশ্বব্যাপী
ইন্টারনেট
প্রযুক্তির
প্রচলন
হওয়ার
ফলে
ক্রেতাদের
আচার-ব্যবহারসহ রুচি-পছন্দেও
ব্যাপক
পরিবর্তন
আসে। ইন্টারনেট প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পণ্য ও সেবার প্রচারমূলক কার্যক্রম পরিচালনার
সময়ই
হলো
সামাজিক
যোগাযোগ
বা
মোবাইল
বিপণন
যুগ। ২০০০ সালের পর হতে মূলত এ যুগের সূচনা হয়। তবে আমাদের দেশে ২০১০ সালের পর হতে বিপণনকারী
প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপকভাবে
বিভিন্ন
সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার
করে
তাদের
পণ্য
ও সেবা সম্পর্কে
ক্রেতাদের
মধ্যে
প্রচার
করতে
থাকে।
(চলবে)




