ত্বকে লাল দাগ ও সাদা আঁশ, সোরিয়াসিস নয় তো?

সোরিয়াসিস ত্বকের একটি প্রদাহজনিত রোগ। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যেকোনো বয়সে এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। সোরিয়াসিস একটি দীর্ঘস্থায়ী অটো-ইমিউন চর্মরোগ। এটি ছোঁয়াচে নয়। এটি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যেকোনো বয়সেই হতে পারে।
সোরিয়াসিস কেন হয়?
আমাদের ত্বকের কোষ সাধারণত ২৮ থেকে ৩০ দিনে নতুন করে তৈরি হয়। কিন্তু সোরিয়াসিস আক্রান্তদের ক্ষেত্রে এই কোষ মাত্র ৩-৪ দিনেই বেড়ে যায়, ফলে ত্বকের ওপর মৃত কোষ জমে লাল, উঁচু ও আঁশযুক্ত চাকা বা ‘প্লাক’ তৈরি হয়। এর প্রধান দুটি কারণ হলো:
অটো-ইমিউন সমস্যা: শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভুলবশত নিজের সুস্থ ত্বক কোষকেই আক্রমণ করে বসে।
বংশগত কারণ: পরিবারে কারো সোরিয়াসিস থাকলে এটি হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
তবে কিছু ‘ট্রিগারিং ফ্যাক্টর’ বা উদ্দীপক এই রোগের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়। এর মধ্যে রয়েছে-
* মানসিক চাপ ও অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা
* ত্বকে আঘাত, কেটে যাওয়া বা রোদে পোড়া
* অতিরিক্ত ঠান্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়া
* কিছু ওষুধ - যেমন উচ্চ রক্তচাপের বিটা-ব্লকারর, লিথিয়াম, ব্যথানাশক ঔষধ, টারবিনাফিন
* ধূমপান ও মদ্যপান
* অতিরিক্ত ওজন
লক্ষণ ও সংক্রমণের স্থান
শরীরের যেকোনো স্থানে সোরিয়াসিস হতে পারে, তবে কনুই, হাঁটু, মাথার ত্বক, পিঠের নিচের অংশ, হাতের তালু, পায়ের তলা ও নখে এর প্রকোপ বেশি দেখা যায়। আক্রান্ত স্থানে লালচে দাগের ওপর সাদা বা রুপালী রঙের মৃত চামড়া জমে থাকে। রোগী তীব্র চুলকানি, ব্যথা কিংবা জ্বালাপোড়া অনুভব করতে পারেন। ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে ফেটে যেতে পারে এবং অনেক সময় নখের রঙ পরিবর্তন বা খসখসে হয়ে গর্ত হতে দেখা দেয়।
চিকিৎসা ও প্রতিকার
সোরিয়াসিস এমন একটি রোগ, যা সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব নয়, তবে সঠিক চিকিৎসায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা ও সংক্রমণের গভীরতা বিবেচনা করে চিকিৎসার পথ ঠিক করা হয়:
বাহ্যিক ওষুধ: ময়েশ্চারাইজার, কর্টিকোস্টেরয়েড ক্রিম, স্যালিসিলিক অ্যাসিড বা ভিটামিন-ডি সমৃদ্ধ ক্রিম ব্যবহার করা হয়।
ফটোথেরাপি: নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় আলট্রাভায়োলেট-বি রশ্মি প্রয়োগ করে কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি কমানো হয়।
পদ্ধতিগত ওষুধ: রোগ বেশি ছড়িয়ে পড়লে চিকিৎসকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে মেথোট্রেক্সেট, সাইক্লোস্পোরিন বা রেটিনয়েড জাতীয় ওষুধ বা ইনজেকশন দেওয়া হয়।
বায়োলজিক চিকিৎসা: গুরুতর ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক বায়োলজিক ইনজেকশন ব্যবহার করা হয়, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার নির্দিষ্ট অংশকে লক্ষ্য করে কাজ করে।
জীবনযাত্রায় সতর্কতা
সোরিয়াসিস নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সচেতন জীবনযাপন অপরিহার্য:
* ত্বক সবসময় ময়েশ্চারাইজড রাখুন এবং অতিরিক্ত গরম পানিতে গোসল করবেন না।
* মানসিক চাপ কমাতে মেডিটেশন ও ইয়োগা চর্চা করুন।
* ধূমপান, মদ্যপান, লাল মাংস ও ফাস্টফুড বর্জন করুন। প্রতিদিন প্রচুর পানি পান করুন এবং খাদ্যতালিকায় ওমেগা-৩ যুক্ত মাছ ও শাকসবজি রাখুন।
* ত্বকে কাটাছেঁড়া বা পোকামাকড়ের কামড় যেন না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিন।
* নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শে ফলোআপ করুন।
সোরিয়াসিস কোনো লজ্জার বা হীনমন্যতার বিষয় নয়। এটি কেবল একটি শারীরিক অবস্থা মাত্র। সঠিক চিকিৎসা ও ইতিবাচক জীবনযাত্রার মাধ্যমে একজন সোরিয়াসিস আক্রান্ত রোগীও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবন কাটাতে পারেন।
লেখক: কনসালট্যান্ট, চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগ
কুর্মিটোলা মাল্টিকেয়ার স্পেশালাইজড হাসপাতাল, ঢাকা।



