উচ্চ কোলেস্টেরলের ক্ষতি এড়ানোর উপায়

রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে গেলেও অধিকাংশ মানুষের কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। ফলে নীরবে রক্তনালির ক্ষতি হতে থাকে। উচ্চ কোলেস্টেরল নিয়ে জানাচ্ছেন ডা. মো. রবিউল আলম (রনি)
কোলেস্টেরল কী এবং কেন প্রয়োজন?
কোলেস্টেরল হলো শরীরে থাকা এক ধরনের চর্বিজাতীয় উপাদান, যা কোষের গঠন, বিভিন্ন হরমোন এবং ভিটামিন ডি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে কোলেস্টেরল শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও তা অবশ্যই নির্দিষ্ট মাত্রায় থাকতে হবে।
কোলেস্টেরলের মধ্যে LDL (লো-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন)-কে ‘খারাপ কোলেস্টেরল’ বলা হয়। কারণ এটি ধমনির দেয়ালে চর্বি জমাতে সাহায্য করে। অন্যদিকে HDL (হাই-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন)-কে ‘ভালো কোলেস্টেরল’ বলা হয়। কারণ এটি অতিরিক্ত কোলেস্টেরল অপসারণে সহায়তা করে। এ ছাড়া রক্তে ‘ট্রাইগ্লিসারাইড’ বেশি থাকলেও হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
উচ্চ কোলেস্টেরলের ক্ষতি
রক্তে LDL-এর মাত্রা বেশি হলে ধমনির ভেতরের দেয়ালে ধীরে ধীরে চর্বি জমে প্লাক তৈরি হয়। এর ফলে রক্তনালি সরু হয়ে যায় এবং হৃৎপিণ্ড, মস্তিষ্ক ও অন্যান্য অঙ্গে রক্তপ্রবাহ কমে যায়। এই অবস্থাকে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস বলা হয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্লাক ফেটে গেলে সেখানে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে, যা মুহূর্তের মধ্যেই হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। এ ছাড়া পায়ের রক্তনালিতে রক্তপ্রবাহ কমে গিয়ে হাঁটার সময় ব্যথা, ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া, এমনকি গুরুতর ক্ষেত্রে অঙ্গহানির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
কিছু অভ্যাস ও শারীরিক অবস্থা উচ্চ কোলেস্টেরলের ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়। যেমন—
- অতিরিক্ত তেল, ঘি, মাখন ও ফাস্টফুড খাওয়া
- শারীরিক পরিশ্রমের অভাব
- অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা
- ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার
- ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ
- পারিবারিকভাবে উচ্চ কোলেস্টেরল বা অল্প বয়সে হৃদরোগের ইতিহাস
- বয়স বৃদ্ধি ইত্যাদি ঝুঁকি থাকলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
কীভাবে প্রতিরোধ করবেন?
উচ্চ কোলেস্টেরল প্রতিরোধে ও নিয়ন্ত্রণে ওষুধের পাশাপাশি প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বেশি করে শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, ওটস এবং অন্যান্য আঁশসমৃদ্ধ খাবার রাখুন। লাল মাংস, ভাজাপোড়া, বেকারি পণ্য, ট্রান্স ফ্যাট ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন। নিয়মিত মাছ খাওয়া উপকারী হতে পারে।
এর পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ধূমপান সম্পূর্ণ বর্জন হৃদস্বাস্থ্য ভালো রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ থাকলে সেগুলোও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
কখন পরীক্ষা করবেন?
উচ্চ কোলেস্টেরলের কোনো নির্দিষ্ট লক্ষণ না থাকায় নিয়মিত পরীক্ষা করাই একে শনাক্ত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সাধারণভাবে ২০ বছর বয়সের পর অন্তত একবার ‘লিপিড প্রোফাইল’ পরীক্ষা করা উচিত। যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ, স্থুলতা বা পরিবারে অল্প বয়সে হৃদরোগের ইতিহাস রয়েছে, তাদের আরও নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ওষুধ নিয়ে ভুল ধারণা
অনেকেই মনে করেন, কোলেস্টেরলের ওষুধ একবার শুরু করলে সারা জীবন খেতে হবে। এ ধারণা সবক্ষেত্রে সঠিক নয়। কার ওষুধ প্রয়োজন, কোন ওষুধ কতদিন চলবে— এসব নির্ভর করে রোগীর বয়স, কোলেস্টেরলের মাত্রা, হৃদরোগের ঝুঁকি এবং অন্যান্য শারীরিক অবস্থার ওপর। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ শুরু বা বন্ধ করা উচিত নয়।
লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য)
মেডিকেল অফিসার (মেডিসিন)
শিবালয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স শিবালয়, মানিকগঞ্জ




