সিওপিডির প্রধান কারণ ধোঁয়া-ধুলা

মডেল: নিহাল পারভেজ, ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
দীর্ঘদিনের কাশি, কফ বা হাঁটাচলার সময় শ্বাসকষ্ট হওয়া ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজের (COPD) লক্ষণ হতে পারে, যা বিশ্ব জুড়ে মৃত্যুর অন্যতম কারণ। লিখেছেন ডা. মো. শাহজাদা তাবরেজ
সিওপিডি কী?
সিওপিডি এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগ, যেখানে শ্বাসনালিতে স্থায়ী প্রদাহ ও সংকোচন এবং ফুসফুসের বায়ুথলির ক্ষতির কারণে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারে না। ফলে রোগী ধীরে ধীরে শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকেন। সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য না হলেও সঠিক সময় শনাক্ত, সঠিক চিকিৎসা এবং জীবনযাপনে পরিবর্তনের মাধ্যমে রোগের অগ্রগতি ধীর করা এবং জীবনমান উন্নত করা সম্ভব।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
দীর্ঘদিন ধরে সিগারেট, বিড়ি বা অন্যান্য তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারকারীদের মধ্যে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
তবে ধূমপানই একমাত্র কারণ নয়। যেসব ব্যক্তি দীর্ঘদিন রান্নার ধোঁয়া, বিশেষ করে কাঠ, খড়, কয়লা বা গোবরের জ্বালানির ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকেন, তাদেরও ঝুঁকি বেশি। এ ছাড়া—
- কর্মক্ষেত্রে ধুলোবালি, রাসায়নিক ধোঁয়া বা বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে দীর্ঘদিন কাজ করা
- বায়ুদূষণ
- বারবার শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ।
- হাঁপানি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণে না থাকা।
- বিরল ক্ষেত্রে বংশগত কারণও সিওপিডির ঝুঁকি বাড়ায়।
কোন লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দেবেন?
সিওপিডির লক্ষণ সাধারণত ধীরে ধীরে শুরু হয়। তাই অনেকেই শুরুতে গুরুত্ব দেন না। এক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া উচিত যদি—
- তিন মাসের বেশি সময় ধরে কাশি থাকে।
- নিয়মিত কফ হয়।
- সিঁড়ি ভাঙতে বা দ্রুত হাঁটলে শ্বাসকষ্ট হয়।
- আগের তুলনায় দৈনন্দিন কাজ করতে কষ্ট হয়।
- বারবার বুকে সংক্রমণ হয়।
- শ্বাস নেওয়ার সময় শোঁ শোঁ শব্দ হয়।
কীভাবে রোগটি শনাক্ত করা হয়?
শুধু লক্ষণ শুনে সিওপিডি নিশ্চিত করা যায় না। রোগ নির্ণয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো স্পাইরোমেট্রি (Spirometry)। এটি একটি সহজ, নিরাপদ ও ব্যথাহীন পরীক্ষা, যার মাধ্যমে ফুসফুস কতটা কার্যকরভাবে বাতাস বের করতে পারছে, তা পরিমাপ করা হয়।
এ ছাড়া প্রয়োজনে বুকের এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা, রক্তের গ্যাস বিশ্লেষণ এবং অন্যান্য পরীক্ষা করা হতে পারে, যাতে রোগের তীব্রতা ও অন্যান্য সম্ভাব্য রোগ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
স্পাইরোমেট্রি পরীক্ষায় ফুসফুস কতটা কার্যকরভাবে বাতাস বের করতে পারছে, তা পরিমাপ করা হয়
চিকিৎসার মূল লক্ষ্য কী?
সিওপিডির চিকিৎসার উদ্দেশ্য রোগ সম্পূর্ণ সারিয়ে তোলা নয়; বরং রোগের অগ্রগতি কমানো, শ্বাসকষ্ট নিয়ন্ত্রণ করা, বারবার অবনতির ঝুঁকি কমানো এবং রোগীকে স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবনযাপন করতে সহায়তা করা।
ধূমপান সম্পূর্ণ বন্ধ করা: ধূমপান বন্ধে ফুসফুসের ক্ষতি অনেকটাই ধীর হয়ে যায় এবং ভবিষ্যতের জটিলতা কমে।
ইনহেলারভিত্তিক চিকিৎসা: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্রঙ্কোডাইলেটর ও প্রয়োজনে অন্যান্য ইনহেলার ব্যবহার করলে শ্বাসকষ্ট কমে, দৈনন্দিন কাজ সহজ হয় এবং রোগের অবনতি কমে।
ফুসফুসের পুনর্বাসন: নিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, শারীরিক অনুশীলন, পুষ্টি পরামর্শ এবং রোগ সম্পর্কে শিক্ষা রোগীর কর্মক্ষমতা ও জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়।
টিকা গ্রহণ: ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং নিউমোকক্কাল টিকা অনেক রোগীর ক্ষেত্রে গুরুতর সংক্রমণ ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
অক্সিজেন থেরাপি: যাদের রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা দীর্ঘদিন কম থাকে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি অক্সিজেন থেরাপি জীবন রক্ষাকারী হতে পারে।
আনতে হবে জীবনযাপনে পরিবর্তন
- ধূমপান ও পরোক্ষ ধূমপান সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলুন
- ঘরের রান্নাঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন
- ধুলোবালি ও দূষিত পরিবেশে প্রয়োজনে মাস্ক ব্যবহার করুন
- নিয়মিত হাঁটুন ও শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করুন
- সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করবেন না
- ইনহেলার ব্যবহারের কৌশল নিয়মিত যাচাই করুন
- শ্বাসকষ্ট বা কাশি হঠাৎ বেড়ে গেলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
কখন হাসপাতালে যেতে হবে?
নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে—
- হঠাৎ তীব্র শ্বাসকষ্ট।
- ঠোঁট বা আঙুল নীলচে হয়ে যাওয়া।
- কথা বলতে কষ্ট হওয়া।
- অতিরিক্ত ঝিমুনি বা বিভ্রান্তি।
- উচ্চ জ্বর বা কফের পরিমাণ ও রঙ হঠাৎ পরিবর্তন হওয়া।
মনে রাখবেন, দীর্ঘদিনের কাশি, কফ বা শ্বাসকষ্ট কখনোই স্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে যারা ধূমপান করেন, অতীতে ধূমপান করেছেন, অথবা দীর্ঘদিন রান্নার ধোঁয়া কিংবা ধুলোবালির সংস্পর্শে থেকেছেন—তাদের এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত একজন বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত এবং প্রয়োজনে স্পাইরোমেট্রি পরীক্ষা করানো উচিত।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক (বক্ষব্যাধি মেডিসিন), মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা




