আইনজীবীর বাঁচার স্বপ্ন হাসপাতালে বন্দি

ছবি: আগামীর সময়
ডাক্তার বলেছিলেন, একদিন ডায়ালাইসিস লাগবে। সেদিন এসে গেছে। এখন প্রতি সপ্তাহে তিনটি ডায়ালাইসিস না নিলে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। অ্যাডভোকেট দেবদুলাল দেবনাথের জীবনযুদ্ধের করুণ কাহিনি শোনাচ্ছেন আখলাকুজ্জামান অনিক
ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল আইনজীবী হওয়ার। সেই স্বপ্ন বুকে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের লাইসেন্স পেয়ে যোগ দেন আইন পেশায়। দেবদুলাল দেবনাথের স্বপ্ন ছিল হাইকোর্টে যুক্ত হবেন, মানুষের পাশে দাঁড়াবেন ন্যায়ের পতাকা নিয়ে। তার জীবন তখন সম্ভাবনার আলোয় ভরা। কিন্তু পেছনে পুরনো অসুখের চোখরাঙানি।
২০১৪ সালে মা মারা গেছেন কিডনি রোগে। শোকের সেই অন্ধকারে চিকিৎসক তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘পরিবারে যেহেতু এ রোগ আছে, তাই নিজেরও পরীক্ষা করান।’ পরীক্ষার রিপোর্ট পেয়ে বুক ভেঙে গিয়েছিল দেবদুলালের। তারও শরীরে বাসা বেঁধেছে পলিসিস্টিক কিডনি ডিজিজ; যে রোগ জীবন কেড়েছে মায়ের। মা হারানোর ব্যথা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ— দ্বিমুখী শোক একসঙ্গে বুকে চেপে তবু তিনি দমে যাননি। শুরু হলো লড়াই। প্রতিদিন আট থেকে দশ রকমের ওষুধ, নিয়মিত ডাক্তার দেখানো; কিডনি ইনস্টিটিউট, কিডনি ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (পিজি হাসপাতাল) ছোটাছুটি। জীবনটা হয়ে উঠল ওষুধের বাক্স আর হাসপাতালের করিডরের গল্প।
২০১৪ থেকে এ পর্যন্ত চিকিৎসায় খরচ হয়ে গেছে প্রায় ৩০ লাখ টাকা
চিকিৎসকরা সতর্ক করেছিলেন, রক্তচাপ আর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে একসময় কিডনি ডায়ালাইসিস বা ট্রান্সপ্ল্যান্ট অনিবার্য হয়ে উঠবে। সেই দিন এলো ২০২২ সালে। হঠাৎ করেই দেবদুলালের সিরাম ক্রিয়েটিনিন চলে গেল বিপৎসীমার অনেক ওপরে। শুরু হলো জরুরি ডায়ালাইসিস। অসুস্থ শরীর নিয়ে ঢাকা ছেড়ে ঝিনাইদহে, গ্রামের বাড়িতে ফিরে এলেন। পেছনে পড়ে রইল স্বপ্নের হাইকোর্ট, অসম্পূর্ণ ইন্টার্নশিপ আর সাজানো জীবনের স্বপ্ন।
এরপর এলো একটুকরো আলোর আশা। তার জীবনসঙ্গী নূপুর বিশ্বাস রুপা বললেন, ‘আমি কিডনি দেব। তুমি বাঁচো।’ এমন ভালোবাসা কজনের ভাগ্যে জোটে? কিন্তু বিধিবাম! রক্তের গ্রুপ ভিন্ন হওয়ায় চিকিৎসকরা অপারেশনের সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন না। দেবদুলালের ছোট ভাই শুভ দেবনাথেরও একই রোগ। বাবার বয়স অনেক। পরিবারে আর কোনো কিডনি দাতা নেই। আইন অনুযায়ী পরিবারের বাইরে কেউ কিডনি দিতে পারে না। সব পথ বন্ধ হয়ে গেল। আবার ডায়ালাইসিসের টেবিলে ফিরে যেতে বাধ্য হলেন তিনি।
২০১৪ থেকে এ পর্যন্ত চিকিৎসায় খরচ হয়ে গেছে প্রায় ৩০ লাখ টাকা। ডায়ালাইসিসের পথ তৈরিতে হাতে ও বুকে করতে হয়েছে একাধিক অস্ত্রোপচার। এখন প্রতি সপ্তাহে তিনটি ডায়ালাইসিস না নিলে প্রাণপ্রদীপ নিভে যাবে তার। প্রতিদিন ১৮ থেকে ২০ রকমের ওষুধ খেতে হয়। রক্তে হিমোগ্লোবিন এতই কমে গেছে, সপ্তাহে দুটি করে ইনজেকশন নিতে হয়, যার প্রতিটির দাম সাড়ে ৩ হাজার টাকা। মাসপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা খরচ হয় তার চিকিৎসা খাতে। পরিবার যতটুকু পেরেছে, করেছে। বন্ধুরা পাশে ছিল। কিন্তু বছরের পর বছর এ ভার বহন করতে করতে সবার শক্তি ফুরিয়ে আসছে। অথচ চিকিৎসক বলছেন, দ্রুত ট্রান্সপ্ল্যান্ট না করা হলে শরীর আরও ভেঙে পড়বে, জটিলতা বাড়বে। ভারতে কিডনি প্রতিস্থাপন করতে লাগবে কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকা।
বাঁচতে চান অ্যাডভোকেট দেবদুলাল দেবনাথ। তাই সাহায্যের আবেদন নিয়ে হাত বাড়িয়েছেন সবার কাছে।




