ডরসেটের পথে পথে

লেখক আমজাদ হোসেন, পেছনে ডার্ডল ডোর
ডরসেটে মানুষ মূলত ডার্ডল ডোর দেখতে যায়। ইংল্যান্ডের জুরাসিক কোস্টের এই প্রাকৃতিক খিলান দেশটির অন্যতম আইকনিক পর্যটনকেন্দ্র। তবে আমাদের পরিকল্পনা ছিল, ভ্রমণের তৃতীয় দিন সেখানে যাব। তার আগে সেখানকার আরও কয়েকটি জায়গা দেখে নেব। আমার বাসা কেন্টের জিলিংহ্যামে। সেখান থেকে আমাদের গন্তব্যের দূরত্ব প্রায় ১৯০ মাইল, অর্থাৎ ৩০৪ কিলোমিটার। বিকালের দিকে ক্যারাভান পার্কের কাছাকাছি পৌঁছানোর সময় এক পাশে পেলাম ছোট ছোট পাহাড়, অন্য পাশে সমুদ্রের নীল জলরাশি। আমাদের ঠিকানা ছিল গর্সল্যান্ডস ক্যারাভান পার্ক। পাহাড়ের ঢালে সারি সারি ক্যারাভান, সামনে সমুদ্রের অপূর্ব দৃশ্য। প্রতিটি ক্যারাভানে আছে রান্নার সরঞ্জাম, দুটি শোবার ঘর, বসার ও খাওয়ার জায়গা। আর ছোট্ট একটি বারান্দা, যেখানে পছন্দের পানীয় হাতে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে থাকা যায়।
পরদিন গেলাম অ্যাবটসবারি সোয়াইনারি ও সাব-ট্রপিক্যাল গার্ডেনে। সোয়াইনারিতে ঢুকতেই চোখে পড়ল রাজহাঁসের অবয়বে তৈরি বিশাল এক গোলকধাঁধা। ঘণ্টা দুয়েক ঘুরেও তার কূলকিনারা করতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে রাজহাঁস দেখতে এগোলাম। জলাশয় জুড়ে হাজার হাজার সাদা রাজহাঁস। সমুদ্রের লোনা ও মিঠাপানির মিশ্রণে তৈরি এই জলাধারে তারা নিজেদের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়ে তাদের খাবার দেওয়া হয়। আমিও গমের দানা খাওয়ানোর সুযোগ নিলাম। পাখিগুলো মুক্ত, শুধু অনুকূল পরিবেশের কারণে মানুষের এত কাছে এসেও ভয় পাচ্ছে না— দৃশ্যটি ভীষণ ভালো লাগল। পরে গেলাম ৩৩ একর জুড়ে বিস্তৃত সাব-ট্রপিক্যাল গার্ডেনে। বিভিন্ন অঞ্চলের গাছপালা, অর্কিড, ফার্ন আর বিশাল পাতার অচেনা উদ্ভিদ দেখে বারবার থমকে দাঁড়াতে হয়েছে। গাছপালা ভালোবাসেন— এমন মানুষের জন্য জায়গাটি দারুণ। সেদিনই ঘুরে দেখলাম প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরনো অ্যাবটসবারি গ্রাম। পাথরের বাড়ি, ছনের মতো উপকরণে তৈরি ছাদ, বাড়ির সামনে ফুলের বাগান। কোথাও কেউ নিজেদের খামারের ডিম, ফল কিংবা সবজি বিক্রি করছেন; কেউ সাজিয়েছেন ঘরে তৈরি কেক, পেস্টি বা আইসক্রিমের ছোট দোকান। বাড়ির সামনের বাগানে পর্যটকের বসার জন্য চেয়ার-টেবিলও রাখা আছে।
তৃতীয় দিনে গেলাম সেই বহুল প্রতীক্ষিত ডার্ডল ডোরে। পাহাড়ি পথে বেশ খানিকটা হেঁটে পৌঁছালাম বিখ্যাত প্রাকৃতিক পাথুরে খিলানের কাছে। ভিড় প্রচুর। জায়গাটি নিঃসন্দেহে অসাধারণ। তবে আমার কাছে বেশি ভালো লেগেছে কাছের লুলওয়ার্থ কোভ। পাহাড়ঘেরা ডিম্বাকৃতির এই খাড়িকে দূর থেকে প্রাকৃতিক সুইমিংপুলের মতো মনে হয়। নীল জলরাশিতে সাঁতার, নৌকা চালানো আর রোদ পোহানোয় মেতে আছেন সব বয়সের মানুষ। ছেলেকে নিয়ে আমিও সাঁতারে নেমে পড়লাম। বিকালে ছোট্ট একটি ঝরনা খুঁজতে মানচিত্র ধরে পৌঁছালাম লিটল ব্রেডি এলাকায়। স্থানীয় একটি ক্যাফেতে জানলাম, ঝরনাসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা ব্যক্তিমালিকানায় চলে গেছে। পাহাড় কিংবা ঝরনাও যে ব্যক্তিমালিকানায় চলে যেতে পারে, ভাবতেই কেমন লাগে! শেষ পর্যন্ত জঙ্গলের ভেতর ঝরনাটি খুঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হলো। পরদিন ফেরার পথে বোর্নমাউথের অ্যাকুয়ারিয়ামে ঢুঁ মারলাম। কাচের টানেলের ওপর দিয়ে হাঙর, কচ্ছপ ও নানা সামুদ্রিক প্রাণীর চলাচল দেখতে বাচ্চাদের বেশ লাগল। পেঙ্গুইনও দেখলাম। তবে এ ধরনের জায়গায় গেলেই অস্বস্তি হয়। বিনোদনের জন্য অন্য প্রাণীদের বন্দি করে রাখার প্রয়োজন কতটা? বাচ্চারা আনন্দ পায় বলেই দেখা, কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায়।
লেখক: যুক্তরাজ্যে অ্যামাজনে কর্মরত



