ভয়ই পরিণত হয়েছিল তীব্র ভালো লাগায়

শ্রীমঙ্গলে চিতা বিড়ালের বাচ্চা কোলে খসরু চৌধুরী
চার দশকের বেশি সময় ধরে খসরু চৌধুরী সুন্দরবনের বাঘকে কাছ থেকে দেখেছেন ও বুঝেছেন। ২৯ জুলাই ছিল বাঘ দিবস। এ উপলক্ষে কানাডাপ্রবাসী এই সুন্দরবন গবেষকের সঙ্গে মেসেঞ্জারে আলাপ করেছেন ইশতিয়াক হাসান
বাঘের প্রতি আপনার আগ্রহের শুরুটা কীভাবে?
বাবা ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। বদলির চাকরি। যখন পটুয়াখালীতে ছিলেন, তখন তার বন্ধু নাসের কাকু কুয়াকাটার কাছে একটি বাঘ শিকার করেন। বাঘটি একটি বাছুরের অর্ধেক খেয়ে ফেলেছিল, বাকি অংশ টোপ হিসেবে রেখে তাকে মারা হয়। পরে মৃত বাঘটি শহরে ঘুরিয়ে মানুষকে দেখানো হচ্ছিল। কৌতূহল নিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত পেছন পেছন হেঁটেছিলাম। বাড়ি ফিরে মনে হয়েছিল, কী ভয়ংকর প্রাণী! সেই ভয়ই ধীরে ধীরে আজীবনের আকর্ষণে পরিণত হয়।
শৈশবের আর কোনো উল্লেখযোগ্য স্মৃতি?
পটুয়াখালীর পর আমার শৈশবের একটা বড় সময় কেটেছে ঢাকায়। ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময় স্কুল পালিয়ে চলে যেতাম সদরঘাটে। বুড়িগঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে দূরপাল্লার লঞ্চগুলো দেখতাম। সদরঘাটে একটা প্রাচীন ব্যায়ামাগার ছিল, সেখানে গিয়ে শরীরচর্চা দেখতাম। ফায়ার ব্রিগেডের অফিসে দমকলকর্মীদের মহড়া আর ব্যস্ততা দেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করে দিতাম। ঘুরে ঘুরে পুরান ঢাকার যত চটুল গালাগাল আছে, সেগুলোও রপ্ত করে ফেলেছিলাম! বাবা ছুটিতে বাড়ি আসার পর মা আমার অবস্থা জানালে তিনি আমাকে তার কর্মস্থল ফরিদপুরের কাশিয়ানীতে নিয়ে গেলেন।
তাতে কি অবস্থার উন্নতি হলো?
খুব একটা না। বাবা সারা দিন অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকতেন। মা পাশে না থাকায় শাসনও ছিল না। এদিকে কাশিয়ানীতে আমার একজন বিহারি বন্ধু হলো, যে ছিল হুবহু ‘ইন্দ্রনাথ’-এর মতো দুঃসাহসী। রাতবিরাতে বিলে চলে যেতাম বোয়াল মাছ ধরতে, শিকারের জন্য বিভিন্ন আধুনিক ফাঁদ বা খাঁচা তৈরি করতাম। কোঁড়া পাখি, সাপ, বেজি এসব পুষেছি। একবার এক ঈদে একটা ছোট্ট ঘুঘুর ছানা পেয়ে ওটা পুষতে শুরু করি। ঈদের দিন বন্ধুদের সঙ্গে পাড়ায় ঘুরে ঘুরে আনন্দ করতে করতে আমার আর মনে ছিল না যে বাচ্চাটাকে সময়মতো খাওয়াতে হবে। বিকালে যখন বাড়ি ফিরলাম, দেখি ক্ষুধায় ছানাটি মারা গেছে। এটি আমার শিশুমনকে এতটাই আঘাত করেছিল যে এর পর থেকে বক-বেজি যা-ই ধরেছি, কিছুদিন রেখে আবার ছেড়ে দিয়েছি।
রেঞ্জার ফিসফিস করে বললেন, ‘ওই যে!’ দেখি, খালের পাড়ের ঘন বনের আড়াল থেকে শুধু মাথা বের করে একটি বাঘিনী দাঁড়িয়ে আছে। শীতের সোনালি রোদে তার নতুন গজানো ডোরাকাটা লোম সোনার মতো ঝলমল করছিল
জঙ্গলে নিয়মিত পদচারণা শুরু হলো কীভাবে?
কৈশোরে পদ্মার চরে শিকার করতাম। বাসায় বন্দুক থাকায় শিকার শেখা কঠিন হয়নি। জিম করবেট, কেনেথ অ্যান্ডারসনের বই পড়তাম। পরে এ এফ এম আব্দুল জলিলের ‘সুন্দরবনের ইতিহাস’ পড়ে বাংলার কিংবদন্তি শিকারি পচাব্দী গাজীর কথা জানতে পারি। বইটি আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে যাই, ১৭ বছর বয়সে। যুদ্ধের সময় রাইফেল চালনায় দক্ষ হলাম। স্বাধীনতার পর আবার শিকারে ফিরি। এ সময় পরিচয় হয় মামির বড় ভাই আকতারুজ্জামান কামালের সঙ্গে, যিনি ‘বাঘমামা’ নামে পরিচিত ছিলেন। অসাধারণ শিকারি, ফুটবলার ও সংগীতপ্রেমী মানুষটির হাত ধরেই প্রথম সুন্দরবনে যাই; ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে।
তখনই কি প্রথম বাঘ দেখেন?
হ্যাঁ, প্রথমবারেই বাঘ দেখি। তিন দিনের সফরের শেষ দিন ফেরার পথে বিকালে ছিলাম মরা ভদ্রা এলাকায়। ছোট, প্রায় শুকিয়ে যাওয়া একটি খাল দিয়ে নৌকা টানা হচ্ছিল। চারজন নেমে নৌকা টানছিলেন। আমি নতুন হওয়ায় নৌকায় বসেছিলাম, পাশে মামার লোডেড বন্দুক ও হাতে ক্যামেরা। বেড়ে পোকার কামড়ে অস্থির হয়ে আছি। আমাদের নৌকায় তখন দুটি শিকার করা হরিণও ছিল। প্রধান শিকারি হরি পশারী বনের ভেতর দিয়ে হাঁটছিল। হঠাৎ গোলপাতার ঝোপের ফাঁক দিয়ে চোখে পড়ল হেঁতাল গাছের পাশে লালচে-হলুদ কিছু একটা। ভালো করে তাকিয়ে দেখি, প্রকাণ্ড একটি বাঘ শুয়ে আছে। পেছনের মাল্লা ভয় পেয়ে লগি দিয়ে গোলপাতায় জোরে আঘাত করতে লাগল। শব্দ শুনে বাঘটি উঠে দাঁড়াল, আমাদের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ হাই তুলল, তারপর রাজকীয় ভঙ্গিতে হেঁটে জঙ্গলে ঢুকে গেল। বাঘ চলে যাওয়ার পর মনে পড়ল, পাশে লোডেড বন্দুক ছিল। এতটাই ভয় পেয়েছিলাম যে সেটির কথাই ভুলে গিয়েছিলাম। তবে জঙ্গল থেকে বের হওয়ার পর সেই ভয়ই পরিণত হয়েছিল তীব্র ভালো লাগায়।
বাঘের সংখ্যা টিকিয়ে রাখতে অন্তত ২৫-৩০টি বাঘ প্রয়োজন। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সীমান্তবর্তী ভারত-মিয়ানমার মিলিয়েও এখন তিন-চারটির বেশি নেই
এরপর?
১৯৮৫ সালে লেখক হুমায়ুন খান, মামা আকতারুজ্জামান ও পচাব্দী গাজীকে নিয়ে প্রায় এক মাস সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম অংশ ঘুরলাম। ওই সফরের পর রোববার পত্রিকায় সুন্দরবন ও বাঘ নিয়ে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন করি। লেখাটি আলোড়ন তোলে। তখনই মনে হলো, মাঠের বাস্তব অভিজ্ঞতা বড় পরিসরে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া দরকার।
বিচিত্রায় লেখালেখি শুরু করলেন কবে?
১৯৮৮ সালে ছবিসহ একটি বড় ফিচার নিয়ে বিচিত্রা অফিসে যাই। কাজী জাওয়াদ ভাই প্রথমে বললেন, সুন্দরবন নিয়ে তাদের নিজস্ব প্রতিনিধি লেখেন; আমার লেখার প্রয়োজন নেই। আমি বলেছিলাম, ‘আপনাদের কোনো প্রতিনিধি গহিন জঙ্গলে বাঘের পেছনে ঘুরে এই লেখা লিখতে পারবে না।’ লেখা রেখে চলে আসি। দুই মাস পর ফেরত নিতে গেলে শাহরিয়ার কবির ভাই কয়েক মিনিট পড়েই বললেন, ‘আগামী সপ্তাহেই এটি লিড স্টোরি হচ্ছে।’ লেখাটি প্রকাশের পর ব্যাপক সাড়া পাই।
আপনি তো বুয়েটে লেখাপড়া করেছেন?
হ্যাঁ, বুয়েটে আর্কিটেকচারে ভর্তি হয়েছিলাম। তবে পড়া শেষ করা হয়নি। তখন পড়ালেখার চেয়ে চলচ্চিত্রের প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যায়। ব্রিটিশ কাউন্সিল, ইউসিস লাইব্রেরি ও শিল্পকলা একাডেমিতে বসে চলচ্চিত্র নিয়ে বই পড়তে শুরু করলাম। নাট্যকার মামুনুর রশীদের কাছ থেকে চিত্রনাট্য ও পরিচালনার অনেক কিছু শিখেছি।
সিনেমা বানানোর সুযোগ কি পেয়েছিলেন?
১৯৭৮ সালে সরকার তরুণ নির্মাতাদের অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মিরজা আবদুল হাইয়ের উপন্যাস অবলম্বনে চিত্রনাট্য লিখে প্রায় ৪০০টি স্কেচসহ চিত্রনাট্য জমা দিই। সারা দেশ থেকে মাত্র চারজন নির্বাচিত হয়েছিলাম। কিন্তু পরে শর্ত দেওয়া হয়, মোট বাজেটের ২৫ শতাংশ পরিচালককে দিতে হবে। সেই টাকা জোগাড় করতে না পারায় অনুদান ছেড়ে দিতে হয়। আন্ডারগ্রাউন্ড বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর শাহাযাদ ফিরদাউসকে নিয়ে ‘সমষ্টি সমন্বিত শিল্পী সংস্থা’ গড়ে তুলেছিলাম। এই মঞ্চে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়সহ অনেক শিল্পী জড়ো হয়েছিলেন। আমি বাংলাদেশ বেতারেরও নিয়মিত আবৃত্তিশিল্পী ছিলাম।
সেবা প্রকাশনীতে লেখা শুরু করেছিলেন। কন্টিনিউ করলেন না কেন?
তাহাওয়ার আলী খানের অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘রায়মঙ্গলের মানুষখেকো’ নামে একটি লেখা কাজী আনোয়ার হোসেনের কাছে দিয়েছিলাম। রহস্য পত্রিকায় লেখা ছাপা হলে পরে মোহাম্মদ ইস্রাইল আমাকে ডেকে বিল দেন। সেবা প্রকাশনীর লেখককে এভাবে সম্মান দেওয়ার সংস্কৃতি আমাকে মুগ্ধ করেছিল। পরে শিকারি জিয়াউল হকের অভিজ্ঞতা নিয়ে আরও দুটি গল্প জমা দিই। কাজী আনোয়ার হোসেন পছন্দ করলেও ছদ্মনামে লেখার পরামর্শ দেন। কারণ, খসরু চৌধুরী নামে অন্য একজন তখন সেবায় লিখছেন। তখন বিচিত্রাসহ বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় নিজের নামেই বাঘ ও ক্রিকেট নিয়ে লিখছিলাম। তাই রাজি হইনি। ১৯৯১ সাল থেকে দ্য ডেইলি স্টার-এ নিয়মিত সুন্দরবন ও বাঘ নিয়ে ইংরেজি কলাম লিখতে শুরু করি। একই সময়ে বন্ধু হাসান মনসুর ‘গাইড ট্যুরস লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠা করলে সুন্দরবনে পর্যটকদের নিরাপদে ঘোরানোর কাজে যুক্ত হই। তার উদ্যোগেই সুন্দরবনে পেশাদার পর্যটনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। হাসান বিদেশ থেকে বাঘ ও বন্যপ্রাণী বিষয়ে দুষ্প্রাপ্য বই নিয়ে আসতেন। এগুলো আমাকে বাঘের মনস্তত্ত্ব ও আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা বুঝতে অনেক সাহায্য করেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে যতটা আতঙ্ক দেখানো হয়, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সুন্দরবনের স্বাভাবিক পলি জমার প্রক্রিয়াকে ঠিক রাখা। সুন্দরবন নিজেই নিজেকে উঁচু করে তোলে। এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারলে বন দীর্ঘদিন টিকে থাকবে
বাঘ নিয়ে আপনার মাঠ পর্যায়ের কাজগুলো শুরু হলো কীভাবে?
১৯৮৯ সালে বন বিভাগের সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার আব্দুল ওহাব আকনের সঙ্গে পরিচয় হয়। সে সময় ড. উডফোর্ডের নেতৃত্বে সুন্দরবনে ট্রাঙ্কুলাইজার গান ব্যবহার করে বাঘ অচেতন করার প্রশিক্ষণ চলছিল। বিষয়টি নিয়ে আমাকে মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্ব দেয় বিচিত্রা। ওহাব ভাই প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা করে দেন। এক বন্ধুকে নিয়ে সুন্দরবনে গিয়ে কাজ শুরু করি। চাঁদপাই রেঞ্জে গিয়ে জানতে পারি, চারটি বাঘ নিয়মিত লোকালয়ে ঢুকে মানুষ ও গবাদি পশুর ওপর হামলা করছে। চাঁদপাই থেকে ধানসাগর পর্যন্ত এলাকার ঘটনাগুলো খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করি। পরে কটকায় যাই। তখন সেখানে পর্যটকের ভিড় ছিল না; ছিল একটি মাছের খটি (মাছের মহাজনের দোকান) ও বন বিভাগের ছোট একটি ক্যাম্প। জলদস্যুদের কারণে বনরক্ষীরা চারটি রাইফেল নিয়ে দলবদ্ধভাবে টহলে বের হতেন। সেখানেই কটকার ওসি শফিউদ্দিনের সঙ্গে পরিচয়। বন্যপ্রাণীপ্রেমী এই কর্মকর্তা বলতেন, ‘আপনি যেখানে বাঘের খোঁজে যাবেন, আমিও সঙ্গে যাব।’ তার নিরাপত্তা নিয়েই দিনের পর দিন বাঘের টাটকা পায়ের ছাপ অনুসরণ করে বনের ভেতর মাইলের পর মাইল হেঁটেছি। কখনো খালের ওপার থেকে বাঘের গর্জন শুনেছি, কখনো লোকালয়ে বাঘ ঢোকার খবর পেয়ে ছুটে গেছি।
১৯৭৪ সালে প্রথম বাঘ দেখার পর আবার কবে এর মুখোমুখি হলেন?
১৯৮৩ সালে দূর থেকে একবার বাঘ দেখেছিলাম। তবে একদম কাছ থেকে ও রাজকীয় ভঙ্গিতে বাঘ দেখার অভিজ্ঞতা হয় ১৯৯১ সালে। সেবার বন্ধু হাসান মনসুরের ছোট ছেলে রুবাই, খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের জার্মান ফরেস্ট ম্যানেজার দারুজ্জামান, গারট্রুড ডেঞ্জাউসহ আমি সুন্দরবনে দীর্ঘ ভ্রমণে বের হই। কাকতালীয়ভাবে সঙ্গে থাকা ফরেস্ট রেঞ্জার ছিলেন আমার ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজের সহপাঠী। কটকা থেকে শোলারচরের পথে একটি সরু ভারানী খালে ঢুকতেই চালক হঠাৎ ইঞ্জিন বন্ধ করে বোট থামিয়ে দিল। রেঞ্জার ফিসফিস করে বললেন, ‘ওই যে!’ দেখি, খালের পাড়ের ঘন বনের আড়াল থেকে শুধু মাথা বের করে একটি বাঘিনী দাঁড়িয়ে আছে। শীতের সোনালি রোদে তার নতুন গজানো ডোরাকাটা লোম সোনার মতো ঝলমল করছিল। আমাদের বোটটি ছিল মাত্র ৩০ ফুট দূরে। কিন্তু রেঞ্জারের ছোট ক্যামেরার অটো-ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠতেই আলো বাঘিনীর মুখে পড়ে। সে ধীরে উঠে বনের ভেতরে মিলিয়ে যায়।
জীবনে মোট কতবার বাঘের মুখোমুখি হয়েছেন?
অন্তত ১২ থেকে ১৪ বার। এর মধ্যে ২০০১ সালের একটি অভিজ্ঞতা সবচেয়ে রোমাঞ্চকর। সেবার ফ্রান্সের টেলিভিশন চ্যানেল উশাইয়া সুন্দরবন নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করতে আসে। পরিচালক বার্নার্ড লোকেশন দেখতে এসেছিলেন। পুরো সফরের আয়োজন করেছিলেন আমার ফরাসি বন্ধু পিয়ের ক্লাকা। এ টিমের সঙ্গে কাজ করার সময় আমি, স্পিডবোটচালক বেলায়েত ও ফরেস্ট গার্ড কাজী একটি ছোট স্পিডবোটে কটকা গিয়েছিলাম। ফেরার পথে বেতমোর গাঙে দেখি, নদীর মাঝখানে কিছু একটা ভাসছে আর এক ট্রলারে কয়েকজন জেলে লাঠি হাতে চিৎকার করছে। বেলায়েত বলল, ‘স্যার, বাঘ! নদী পার হচ্ছে।’ আমরা এগিয়ে যেতেই জেলেরা সরে গেল। দেখি, বিশাল একটি বাঘ সাঁতরে নদী পার হওয়ার চেষ্টা করছে। বেলায়েত বোটটি এমনভাবে নিয়ে গেল যে আমরা বাঘের মাত্র সাত-আট ফুট দূরে পৌঁছে গেলাম। ওটা ক্ষিপ্ত হয়ে কোমর পর্যন্ত শরীর তুলে গর্জন করল এবং বোটে থাবা মারতে উদ্যত হলো। ছিটকে আসা পানি আমাদের গায়েও পড়ছিল। সেই মুহূর্তে টানা অনেক ক্লোজআপ ছবি তুলেছিলাম। পরে বাঘটি নিরাপদে তীরে উঠে জঙ্গলে মিলিয়ে যায়। কিন্তু মোংলায় ফিরে ছবিগুলো ডেভেলপ করতে পাঠানোর পর জানা গেল, প্রথম কয়েকটি ফ্রেম ছাড়া পুরো রিলই ব্ল্যাঙ্ক। জীবনের সেরা বাঘের ছবিগুলো এভাবেই হারিয়ে যায়।
আপনার মূল পেশা কী ছিল?
গাইড ট্যুরসে অল্প সময় কাজ করলেও আমার মূল জীবিকা ছিল মাঠ পর্যায়ের ফিচার ও কলাম লেখা। ১৯৮৮ সাল থেকে নিয়মিত লেখক হিসেবে বিচিত্রায় কাজ শুরু করি। ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত সাপ্তাহিক ২০০০-এর সহকারী সম্পাদক হিসেবে চাকরি করি। ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ছিলাম ডেইলি স্টারের ট্রাভেল পেজ এডিটর। ২০০৮ সালে কানাডায় স্থায়ীভাবে গেলেও ২০০৭ থেকে ২০১৭ সাল প্রথম আলোর বন ও পরিবেশ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছি। কাজের প্রয়োজনে দেশে আসা হয়েছে নিয়মিতই।
বিয়ে ও পরিবার সম্পর্কে কিছু বলুন।
সাপ্তাহিক ২০০০-এ থাকাকালীন বিয়ের কিছু প্রস্তাব পাই। শেষ পর্যন্ত বন্ধু লুৎফর রহমান রিটন ও আসিফ নজরুল একই পাত্রীর কথা বললেন। ২০০০ সালে শাহাযাদ ফিরদাউসের বড় ভাই ফারুক ভাইয়ের উদ্যোগে পাত্রী মানে নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক ফারহানা আজিম শিউলির সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। শিউলি সুন্দরবন নিয়ে আমার এই পাগলামিকে কখনো বাধা দেননি; বরং বহুবার গহিন জঙ্গলে আমার সঙ্গী হয়েছেন। ২০০২ সালে আমাদের একমাত্র ছেলে অরণ্য চৌধুরীর জন্ম।
চট্টগ্রামে আপনার বন্যপ্রাণী অনুসন্ধানের অভিজ্ঞতার শুরু কীভাবে?
১৯৮৫ সালে বিটিভিতে আলী ইমাম ভাইয়ের প্রযোজনায় ‘সম্ভাবনা’ নামে একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতাম। তার তত্ত্বাবধানে শুটিংয়ের কাজে কক্সবাজার গেলাম। শুটিং শেষে কক্সবাজারে এক চাচাতো ভাইয়ের সহায়তায় স্থানীয় শিকারিদের নিয়ে পাহাড়ি খাদে হাঁকা শিকারে বুনো মথুরা পাখি শিকার করি। সেখানেই জানতে পারি, কক্সবাজার শহরের কাছের জঙ্গলেও তখন চিতা বাঘের বিচরণ ছিল। শিকারিরা জানান, কিছুদিন আগেই পাহাড়ি খাদে পড়ে আহত হওয়া একটি গরু খেতে নেমেছিল একটি চিতা বাঘ। পরে মালিকের চিৎকারে সেটি পালিয়ে যায়।
আপনার বিখ্যাত ‘কালো চিতা’ দেখার অভিজ্ঞতা?
১৯৯১ সালের তীব্র শীতের সময়। বুয়েটের বন্ধু খান মোহাম্মদ আফতাবের শ্বশুর আব্দুল মোনেম সাহেবের কোম্পানির রাস্তার কাজ চলছিল; ফাসিয়াখালী থেকে আলীকদম যাওয়ার দুর্গম লাইন ঝিরি এলাকায়। ওই এলাকায় সেনাবাহিনী সান্ধ্য আইন বা কারফিউ জারি করেছিল; শুধু কনস্ট্রাকশনের গাড়ি চলতে পারত। সাইট ম্যানেজার বাদল ভাইয়ের সঙ্গে বনের ভেতরে যাই। এক ভোরে প্রথমবার একসঙ্গে তিনটি বুনো কুকুর রাস্তা পার হতে দেখি। আসল ঘটনাটি ঘটে আলীকদম সেনাক্যাম্পের পাশের একটি ব্রিজে। সন্ধ্যায় খোলা জিপে যাওয়ার সময় হেডলাইটের আলোয় একটি কালো চিতা বাঘ বা ব্ল্যাক প্যানথার ধরা দেয়। কয়েক সেকেন্ড আমাদের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে ব্রিজের নিচের ঝিরিতে মিলিয়ে যায়। পরে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের খোঁজে আলীকদমের বিভিন্ন ঝিরিতে দিনের পর দিন হেঁটেছি। হরিণ ও চিতা বাঘের পায়ের ছাপ পেলেও বাঘের নিশ্চিত কোনো চিহ্ন আর পাইনি।
পার্বত্য চট্টগ্রামে কি বেঙ্গল টাইগারের উপযোগী পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব?
তাত্ত্বিকভাবে সুস্থ বাঘের জনসংখ্যা টিকিয়ে রাখতে অন্তত ২৫-৩০টি বাঘ প্রয়োজন। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সীমান্তবর্তী ভারত-মিয়ানমার মিলিয়েও এখন তিন-চারটির বেশি নেই। মানুষের তৈরি পরিবেশগত সংকটই এর মূল কারণ। দীর্ঘদিনের শিকার, আধুনিক অস্ত্রের ব্যবহার এবং হরিণ-বুনো শূকরের মতো শিকারপ্রাণী প্রায় শেষ হয়ে যাওয়ায় বাঘের খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়েছে। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঘের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি আশাবাদী নই।
সুন্দরবনের বর্তমান সংকট নিয়ে মূল্যায়ন কী?
সবচেয়ে বড় সংকট বিষ দিয়ে মাছ ও চিংড়ি শিকার, যা পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করছে। কাঁকড়া নির্বিচারে ধরার কারণে ম্যানগ্রোভ পাতার স্বাভাবিক পচন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে পুরো খাদ্যশৃঙ্খল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং বনের মাটিও পুষ্টিহীন হয়ে পড়ছে। বাঘের প্রজননের স্বার্থে কটকা ও কচিখালীর মতো স্পর্শকাতর অভয়ারণ্য এলাকায় পর্যটন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে যতটা আতঙ্ক দেখানো হয়, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সুন্দরবনের স্বাভাবিক পলি জমার প্রক্রিয়াকে ঠিক রাখা। সুন্দরবন নিজেই নিজেকে উঁচু করে তোলে। এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারলে বন দীর্ঘদিন টিকে থাকবে।
এখন কী নিয়ে লিখছেন?
তিনটি নতুন বইয়ের কাজ করছি। এগুলো হলো ‘সুন্দরবনের বাঘের মন্ত্রতন্ত্র’: বাঘ ও বাওয়ালিদের লোকজ বিশ্বাস নিয়ে, ‘সুন্দরবনের শিকারি ভাষা’: চোর-শিকারি ও বনজীবীদের নিজস্ব কোড ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়ে। শেষটি ‘সুন্দরবনের বাঘের পিছু পিছু (দ্বিতীয় পর্ব)’: গত ৪০ বছরের সুন্দরবন ভ্রমণের শেষ ২০ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমার আত্মজৈবনিক গ্রন্থ। আগামী বছর (২০২৭ সালে) আবারও মাঠ পর্যায়ের গবেষণার জন্য বাংলাদেশে আসার পরিকল্পনা রয়েছে।
(১৫ জুলাই বাংলাদেশ সময় সকাল ৯টা থেকে ১০টা ৪৫ মিনিট)







