ঝড়ের পাখির জীবন কাটালাম এই শহরে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঝড়ের গতিতে বেড়ে উঠছে শহর ঢাকা। কংক্রিটে মোড়া এক শহর। সেখানে অসংখ্য মানুষ বেঁচে থাকে প্রতিদিন। কারও মন শিকড় ছড়িয়ে গেঁথে বসেছে এ শহরে। আবার কেউ এখানে থেকেও উন্মূল।
নব্বইয়ের দশকের কবি টোকন ঠাকুর ১৯৯৪ সাল থেকে ঢাকায় বসবাস করেন। কবিতা লেখেন, এ শহরে ভিড় অথবা নির্জনতার ভেতর দিয়ে পথ হাঁটেন। শহরকে দেখেন, নাগরিকদের দেখেন; শীত, গ্রীষ্ম কেটে যাচ্ছে তার এ শহরে বহুদিন ধরে। এ শহর একজন কবিকে কী দিল এতগুলো বছরে? প্রশ্ন করেছিলাম টোকনকে। উত্তরে টোকন বললেন, ‘এ শহরে এসে চারুকলায় পড়াশোনা করেছি। এখানেই শিল্পী-সাহিত্যিকদের সান্নিধ্য পেয়েছি। এ শহর কবি হওয়ার সুযোগ দিয়েছে, পরিচিতি দিয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু উল্টোদিকে এ শহরে আমার মন তছনছ হয়েছে। মানসিকভাবে এ শহরটা আমাকে শান্তি দিতে পারেনি।’
‘তাহলে এ শহরে কাটানো জীবনের এতগুলো বছর কেমন ছিল?’
‘বলতে পারেন, ঝড়ের পাখির জীবন কাটালাম। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, নিজের মৃত্যুর জন্যও ঢাকা শহর একেবারেই ভালো নয়।’
‘ঢাকা শহর ছেড়ে আবার ফিরে যেতে চান সেই ঝিনাইদহে, নিজস্ব ভূমিতে?’
‘ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এ শহরটা বড় অদ্ভুত। তার কাছ থেকে চলে যেতে চেয়ে আবার আটকা পড়েছি। ভৌগোলিক পটভূমি বিবেচনা করলে ঝিনাইদহ অনেক শান্তির জায়গা। কিন্তু এ শহরের সঙ্গে কেমন এক বিপ্রতীপ প্রেমে জড়িয়ে রেখেছে আমাকে। সেই প্রেম অনেক যন্ত্রণা দিল। অথচ তার মাঝেই পড়ে রইলাম অসহায়ের মতো।’
টোকনের কাছে সাড়ে তিন দশকের এ শহর কি অচেনা হয়ে রইল? এ শহরের হৃদয়কে আবিষ্কার করা গেল না কবিতায়? কতটুকু আবিষ্কার করা গেল আর কতটুকু অধরা হয়ে রইল, তা টোকনের কাছে পরিষ্কার নয়। এ শহরে বইয়ের অনেক দোকান নেই, পড়াশোনা করার সুযোগ ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে, চিন্তাশীল, সংবেদনশীল মানুষদের সঙ্গ কম মেলে। সেখানে বসবাস করতে ইচ্ছে করে না এ কবির। তার ভালো লাগত যদি এ শহর রাজনীতিবিদ, ব্যারিস্টার, ব্যবসায়ীদের বদলে কবি, গায়ক, ভাস্কর আর শিল্পীদের পরিচয়ে পরিচিত হতো।
টোকনের পছন্দ শীত। এ শহরে শীতের প্রভাব অনেক কমে গেছে পরিবেশের অবনতি ঘটার কারণে। ঋতুর বিভাজন বলেও এখন তেমন কিছু আর নেই। কিন্তু তারপরও যে কয়েকটা দিন শীত থাকে, শহরটাকে তার অন্যরকম মনে হয়। শীতের মধ্যে শান্ত হয়ে বসে থাকতে ইচ্ছে করে।
ঢাকায় যখন প্রথম পা রেখেছিলেন অন্যরকম এক শহরের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল। টোকনের ভাষায়— বাংলা একাডেমি, শাহবাগ, বইপাড়া, চারুকলায় বহু চরিত্রের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে। প্রগতির দিকে, সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যাওয়া অন্য এক শহরকে পর্যবেক্ষণ করেছি তখন। কিন্তু এখন এ শহরে বর্বর ভিড়, এ শহর ক্রমেই মলিন আর অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে।
তার কাছে একদা হাতের তালুর মতো পরিচিত একটি শহর ক্রমেই অচেনা হয়ে গেছে। নিজেকে কখনো সেখানে আগন্তুক বলে মনে হয়। এক স্বপ্নময় সময় পাল্টে গেছে অপ্রেমে।
কখনো একা হয়ে পথ হাঁটেন টোকন ঠাকুর। আবার কখনো দলবদ্ধ হয়ে থাকেন। হয়তো সেই হারিয়ে যাওয়া শহরটাকে খোঁজেন, একটা সময়কে সন্ধান করেন নিজের মনের মধ্যে।
‘এ শহরের হৃদয়কে কখনো খুঁজে পেয়েছেন?’
‘খুব কঠিন তা খুঁজে পাওয়া। কখনো মনে হয় একদা খুঁজে পেয়ে সবটাই হারিয়ে ফেলেছি। আবার মনে হয় স্পর্শই করা যায়নি।’







