গ্রামীণ নারীদের স্বপ্নবুনন

ফেলে দেওয়া ঝুট কাপড় জোড়া দিয়ে তৈরি হতে থাকল নান্দনিক ডিজাইনের ব্যাগ, জামা ও পাঞ্জাবি। শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই ছিলেন এর অন্যতম ক্রেতা।
দিনাজপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চল চাঁদগঞ্জে বসবাস করেন মৌসুমী। স্বামীর স্বল্প আয় দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। ছয় বছরের ছেলেকে মানুষ করতে আকাশের সমান স্বপ্ন দেখেন মা। কিন্তু বাধা তার আর্থিক অসচ্ছলতা। তার স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখার জন্য সামনে এলো ‘স্বপ্নবুনন’। একজন কর্মী হিসেবে তিনি যোগ দিলেন তাদের সঙ্গে। এখন তার মুখে হাসি ফুটছে।
স্বপ্নবুননের যাত্রাটা বেশ মজার। নুসরাত জেসি, সেলিম, নীরব, তৌফিক বিশ্বাস, মুমু, জেসমিন, জেরিন, শুভ ঘোষরা একে অপরের বন্ধু। তারা হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন, সমাজবিজ্ঞান, তড়িৎ প্রকৌশল এবং ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্রছাত্রী। এক বিকালে চায়ের আড্ডায় তারা একটি পরিসংখ্যান নিয়ে আলোচনা করলেন। বছরে প্রায় ৫৭৭ হাজার টন উচ্ছিষ্ট কাপড় তৈরি হয় বাংলাদেশে। এগুলোকে ‘ঝুট কাপড়’ বলে। এসব কাপড় পরিবেশদূষণ করে। কাপড়গুলো যদি ব্যবহার উপযোগী করা হয়, তবে পরিবেশের জন্য যেমন উপকার হবে, তেমনি কাজ করে অনেকে আর্থিকভাবে লাভবান হবেন। ঝুট কাপড় ব্যবহার উপযোগী করে তুলে পরিবেশদূষণ কমানোর সঙ্গে গ্রামীণ জনপদের নারীদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করল ‘স্বপ্নবুনন’।
ক্লাস, ল্যাব শেষ করে প্রায় প্রতিদিন সদস্যদের গন্তব্য হলো বিভিন্ন গ্রাম পরিদর্শন করা। গ্রামে গিয়ে তাদের বোঝানো, কীভাবে আর্থিক অসচ্ছলতা দূর করা সম্ভব। উচ্ছিষ্ট কাপড় থেকে ব্যবহার উপযোগী ব্যাগ, জামা ও পাঞ্জাবি তৈরি করা। কিছুদিনের মধ্যেই প্রায় ২০ জন নারী এই কাজ শিখতে আগ্রহী হয়ে উঠলেন। এবার তাদের প্রশিক্ষণের পালা। ঢাকা থেকে প্রশিক্ষক নিয়ে গিয়ে তাদের শেখানো হলো প্যাচওয়ার্কের (প্যাচওয়ার্ক হলো বিভিন্ন রঙ, আকার ও নকশার ছোট ছোট কাপড়ের টুকরো একসঙ্গে সেলাই করে একটি বড় ও নতুন কাপড় বা শিল্পকর্ম তৈরির প্রক্রিয়া। সহজ কথায় একে জোড়াতালির কাজ বলা যায়, যা বর্তমানে ফ্যাশন ও ঘর সাজানোর জিনিস তৈরিতে দারুণ জনপ্রিয়) কাজ। হাতে-কলমে দক্ষ প্রশিক্ষকের মাধ্যমে সেলাই ও প্যাচওয়ার্কের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় আগ্রহী নারীদের। ধীরে ধীরে নারীরা রপ্ত করলেন সেলাইয়ের কাজ।
ফেলে দেওয়া ঝুট কাপড় জোড়া দিয়ে তৈরি হতে থাকল নান্দনিক ডিজাইনের ব্যাগ, জামা ও পাঞ্জাবি। শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই ছিলেন এর অন্যতম ক্রেতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা অনুষ্ঠানে স্টল দিয়ে শুরু হয় বিক্রয় কার্যক্রম। এ ছাড়া বন্ধুদের মধ্যেও চলে প্রচারণা। ঈদ, পূজা-পার্বণ ও বন্ধুদের সঙ্গে ভ্রমণের জন্য অনেকেই নিজেদের একটু ভিন্নরূপে দেখতে ভিড় জমাতে থাকেন তাদের স্টলগুলোতে। ব্যতিক্রমী ও অনন্য ডিজাইনের কারণে ক্রেতাদের কাছ থেকে আসে আশানুরূপ সাড়া। পাশাপাশি ফেসবুক পেজেও চলতে থাকে প্রচারণা। বিক্রয়ের অর্থ থেকে নিয়মিত পরিশোধ করা হয় মজুরি।
স্বপ্নবুননের অন্যতম সদস্য মুমু অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, যখন একজন নারীকে আমরা প্রথম তার হাতে পারিশ্রমিক হিসেবে মজুরি প্রদান করি এবং সেই টাকা দিয়ে তিনি সন্তানের জন্য শিক্ষাসামগ্রী ক্রয় করেন, তখন এই আনন্দের মাত্রা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে স্বপ্নবুননের চাহিদা। জাগো ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে তরুণদের ব্যবসার আইডিয়া নিয়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। নিজেদের এই অভিনব ব্যবসার আইডিয়া দিয়ে রংপুর বিভাগীয় অঞ্চলে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন তারা। তাদের কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়। এখন স্বপ্নবুননে কাজের মাধ্যমে প্রায় ৩০টি পরিবারের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। নিজেদের আর্থিক উন্নতি ও পরিবারের সমৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন গ্রামীণ জনপদের এই নারীরা।




