দেশের প্রথম ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স ইনস্টিটিউটের পাশে আছে ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন ছবি: জনি হোসাইন
‘বাংলাদেশের সমুদ্র গবেষণার ইতিহাসে ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। যেহেতু আমাদের দেশে সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনীতির একটি বড় সম্ভাবনা রয়েছে, তাই পরোক্ষভাবে এই গ্রাউন্ড স্টেশন দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে’— কথাগুলো আমির হামজার। তিনি পড়েন সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স ইনস্টিটিউটের পাশে আছে ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন। এটি হলো স্থলে অবস্থিত একটি শক্তিশালী যোগাযোগ ও ডেটা রিসিভিং সেন্টার, যা মহাকাশে থাকা সমুদ্র পর্যবেক্ষণকারী স্যাটেলাইটগুলোর সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে। এর মূল কাজ হলো, স্যাটেলাইট থেকে পাঠানো সামুদ্রিক ছবি, সংকেত ও কাঁচা তথ্য (র ডেটা) রিয়েল-টাইমে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করা। এই স্টেশনগুলোর সাহায্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, তরঙ্গের উচ্চতা, লবণাক্ততা, স্রোতের গতি এবং বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়। ফলে ঘূর্ণিঝড়, সুনামি বা জলোচ্ছ্বাসের মতো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস অন্তত ৪৮-৭২ ঘণ্টা আগে পাওয়া সম্ভব। এ ছাড়া সমুদ্রের অভ্যন্তরে মাছের আধিক্য চিহ্নিত করা এবং সামুদ্রিক খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এসব স্টেশন।
সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকরা জানালেন, এখন মাত্র ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলের রিয়েল-টাইম তথ্য সরাসরি হাতে পাওয়া যাবে। এখন সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ও মেঘের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে ৪৮-৭২ ঘণ্টা আগেই অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া সম্ভব হবে। শুধু তাই নয়, সমুদ্রের কোথায় ইলিশ বা অন্য মাছের ঝাঁক আছে, তা ক্লোরোফিল ও তাপমাত্রা মেপে নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা যাবে। এ ছাড়া সমুদ্রের লবণাক্ততা ও গভীরতা বিশ্লেষণ করে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান করা যাবে।
স্টেশনটি উদ্বোধন করা হয়েছে এ মাসের ৯ জুন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চীনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেকেন্ড ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফির যৌথ উদ্যোগে স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগর ও উপকূলীয় অঞ্চলের স্যাটেলাইটভিত্তিক তথ্য সরাসরি সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ সক্ষমতার নতুন যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। প্রায় ৪২০ টেরাবাইট সংরক্ষণ সক্ষমতাসম্পন্ন এই গ্রাউন্ড স্টেশনটি চীনের উন্নত প্রযুক্তির ১১টি ওশান অবজারভেশন ও আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া, এটি যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘নাসা’ এবং জাপানি স্যাটেলাইট থেকেও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের আবহাওয়ার তথ্য সংগ্রহ করার ক্ষমতা রাখে। এর মাধ্যমে দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ ও ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস, নদীভাঙন, মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনাসহ পরিবেশ-সম্পর্কিত নানা তথ্য দ্রুত সময়ের মধ্যে পাওয়া যাবে।
ফলে উন্মোচিত হয়েছে শিক্ষা ও গবেষণার এক নতুন দিক। যার মাধ্যমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকরা গভীর সমুদ্রের মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে গবেষণার সুযোগ পাবেন। এ গ্রাউন্ড স্টেশনের মূল উদ্দেশ্য শিক্ষা ও গবেষণা বলে উল্লেখ করেন পরিচালক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন। তিনি বলেন, এই প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য বাণিজ্যিক নয়, এর মূল উদ্দেশ্য হলো গবেষণা ও শিক্ষার প্রসার। শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা স্টেশনে নির্দিষ্ট নিয়মে গবেষণা প্রস্তাব জমা দিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন, যা একাডেমিক প্রকাশনা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। গ্রাউন্ড স্টেশনের মাধ্যমে মৎস্য ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান করে অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে বাংলাদেশ।





