মনের খেয়াল
মাতৃত্বের পর কর্মস্থলে নতুন ধারাবাহিক

মডেল: সুরাইয়া কাওসারী । ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরা বেশ চ্যালেঞ্জিং। এ সময়ে নানা মানসিক চাপ ঘিরে রাখে একজন মাকে। সামলানোর উপায় জানাচ্ছেন নাহিদ ইসলাম
সন্তানের জন্মের পর প্রত্যেক মায়ের জীবনে বিশাল পরিবর্তন আসে। কর্মজীবী মায়ের কাজে ফেরার এই কঠিন সময়ে চলে মানসিক টানাপড়েন। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রতিষ্ঠান মনের বন্ধুর সিনিয়র সাইকোথেরাপিস্ট সানজিদা ইসলামের মতে, এ সময় আনন্দ বা উদ্বেগ কিংবা দ্বিধা কাজ করা স্বাভাবিক। বাচ্চাকে বাসায় বা ডে-কেয়ারে রেখে যাওয়ার সময় মনের ভেতর তীব্র গ্লানি তৈরি হয়। এই অনুভূতিকে স্বাভাবিক মানবিক বিষয় হিসেবে মেনে নেওয়াই সমাধানের প্রথম ধাপ। মাকে নিজের প্রতি কিছুটা সদয় হতে হবে। কেননা পরিবারের আর্থিক ও মানসিক স্থিতিশীলতায় অবদান রাখাও সন্তানের যত্নেরই অংশ। তাই কাজের কারণে সন্তানের প্রতি দায়িত্ব কমে যায়— এমনটা ভাবার কারণ নেই। সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানোর হিসাব না কষে সময়টা কত ভালোভাবে ব্যয় হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে সেটিই বেশি জরুরি।
কাজে যোগ দেওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই ধীরে ধীরে প্রস্তুতি নেওয়া ভালো। শিশুটি যার কাছে থাকবে, তার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া প্রয়োজন। নিজের ঘুম ও খাবারের রুটিন গুছিয়ে নেওয়া এবং অফিসের সময় অনুযায়ী প্রতিদিনের জীবনকে মানিয়ে নেওয়া এ ক্ষেত্রে বেশ কাজে দেয়। শুরুতেই নিজের ওপর বেশি চাপ না দিয়ে ধীরে ধীরে কাজের গতি ফিরে পাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। অফিসের কাজ ও সন্তানের যত্নের মধ্যে একদম নিখুঁত ভারসাম্য খেঁাজার চেয়ে বাস্তবসম্মত চিন্তাভাবনা করা বেশি জরুরি। কাজের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার পাশাপাশি নিজের বিশ্রামের জন্যও সময় রাখা দরকার। প্রতিদিন সবকিছু সমানভাবে সামলানো হয়তো সম্ভব হবে না— এটি মেনে নেওয়াও মানসিক সুস্থতার অংশ। সেই সঙ্গে পরিবারের সমর্থন জরুরি। শিশুর যত্ন এবং সংসারের কাজ জীবনসঙ্গীর সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিলে মায়ের চাপ অনেকটাই কমে যায়। মানসিকভাবে মা শান্তিতে থাকলে সন্তানের আবেগীয় বিকাশে আরও ভালো ভূমিকা রাখতে পারেন।
অফিসের কাজ ও সন্তানের যত্নের মধ্যে একদম নিখুঁত ভারসাম্য খোঁজার চেয়ে বাস্তবসম্মত চিন্তাভাবনা করা বেশি জরুরি
অফিসেও সহযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ দরকার। কর্মক্ষেত্রে ব্রেস্ট পাম্প করা বা সন্তানের খোঁজ নেওয়ার জন্য যে বিরতি প্রয়োজন, তা নিয়ে ঊর্ধ্বতন বা সহকর্মীদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলা ভালো। এগুলোকে মাতৃত্বের একটি স্বাভাবিক প্রয়োজন হিসেবে দেখলে ভুল বোঝাবুঝি কমে যায়। এ ছাড়া অফিস ম্যানেজমেন্ট যদি নমনীয় সময়সূচি এবং ধীরে ধীরে দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ দেয়, তবে মায়ের জন্য পরিস্থিতি সামলানো সহজ হয়।
অনেক মা কাজের চাপে মানসিক অবসাদের শিকার হন। বিষয়টি সবসময় হয়তো বুঝতে পারেন না। ধীরে ধীরে ক্লান্তি যদি শরীরের পাশাপাশি মনেও বাসা বাঁধে, সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সাইকোলজিস্ট উম্মে সালমা সায়মা বলেন, “যদি প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠার পর অবসন্ন লাগে, ছোট ছোট বিষয়েও বিরক্তি বা কান্না চলে আসে, কাজে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়, আগে যেসব কাজে আনন্দ পেতেন সেগুলো অর্থহীন লাগে কিংবা সবসময় মনে হয়— ‘আমি কিছুই ঠিকমতো করতে পারছি না’, তাহলে এগুলো বার্নআউটের লক্ষণ হতে পারে।” সে ক্ষেত্রে নিজের প্রতি আরও যত্নশীল হতে হবে। নিজের যত্ন নেওয়া স্বার্থপরতা নয়; বরং এটি নিজের, সন্তানের এবং পুরো পরিবারের প্রতি একটি দায়িত্ব। কারণ, মানসিকভাবে সুস্থ একজন মা-ই সন্তানের জন্য নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠতে পারেন।
সন্তান জন্মের পর শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের কারণে অনেক মা তীব্র বিষণ্নতা ও হতাশায় ভোগেন, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলে পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন। এটি সন্তান জন্মের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শুরু হতে পারে এবং সঠিক যত্ন না পেলে দীর্ঘ সময় ধরে চলার ঝুঁকি থাকে। এই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিরাময়যোগ্য। যদি মন খারাপ, উদ্বেগ, অতিরিক্ত কান্না, ঘুম বা ক্ষুধার পরিবর্তন, অপরাধ বোধ কিংবা দৈনন্দিন দায়িত্ব পালন করতে অসুবিধা দুই সপ্তাহের বেশি সময় স্থায়ী হয় এবং ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা কর্মজীবনে প্রভাব ফেলে, তাহলে মানসিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।




