শিশুর হাতে পিস্তল ও বোনের জন্য প্রতিশোধের ঘটনাটি সত্য নাকি ভুয়া

ছবিঃ আগামীর সময়
একটি ছোট্ট শিশুর হাতে পিস্তল, বোনের জন্য প্রতিশোধ-এমন শিরোনামের এক গল্পই নাড়িয়ে দিয়েছে সামাজিক মাধ্যমকে। অনেকেই ক্ষোভে, কেউবা আবেগে ভেসে সমর্থন জানিয়েছেন সেই শিশুর প্রতি। কিন্তু হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া এই ঘটনাটির আড়ালে লুকিয়ে আছে ভিন্ন বাস্তবতা-যেখানে নেই কোনো প্রতিশোধ, নেই সেই ঘটনার সত্যতা।
১২ এপ্রিল দুপুরের দিকে ‘Inside Bangla’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে একটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দাবি করা হয়, চাঁদপুরে ১১ বছরের এক কিশোর নিজের বোনের ওপর হওয়া নির্যাতনের প্রতিশোধ নিতে বাবার লাইসেন্স করা পিস্তল ব্যবহার করে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করেছে। ঘটনাটির পরপরই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
ফটোকার্ডটির ভাষা ও উপস্থাপন এমনভাবে করা হয়, যাতে দর্শকের আবেগকে নাড়া দেয়। এর সঙ্গে ক্যাপশনে শিশুটির শাস্তির বদলে পুরস্কার দাবি জানানো হলে অনেকেই না ভেবেই বিষয়টিকে সত্য ধরে নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান। কমেন্টে দেখা যায়, অধিকাংশ ব্যবহারকারী ঘটনাটিকে ন্যায়বিচার হিসেবে দেখছেন এবং শিশুটির পক্ষে মত দিচ্ছেন।
যাচাইয়ে মিলল ভিন্ন বাস্তবতা
তবে দাবিটির সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে উঠে আসে ভিন্ন চিত্র। পোস্টে উল্লেখ ছিল, তথ্যটি নাকি জাতীয় দৈনিক ইত্তেফাক থেকে নেওয়া। কিন্তু সংশ্লিষ্ট পত্রিকার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ ও ওয়েবসাইট ঘেঁটে এ ধরনের কোনো সংবাদ বা ফটোকার্ড পাওয়া যায়নি। শুধু তাই নয়, দেশের অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য গণমাধ্যমেও এমন ঘটনার কোনো উল্লেখ নেই।
ছবির আসল গল্প
এরপর ছড়িয়ে পড়া ছবিটির উৎস খুঁজতে গিয়ে ‘আগামীর সময়’ একটি ভিডিও শনাক্ত করে, যা ‘Ariful Islam’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে শেয়ার করা হয়েছিল। ১২ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, হাতকড়া পরা এক যুবককে কয়েকজন পুলিশ সদস্য ধরে নিয়ে যাচ্ছেন। ভিডিওতে থাকা ব্যক্তির পোশাক, আশপাশের পরিবেশ, এমনকি পুলিশের অবস্থান-সবকিছুই ভাইরাল ফটোকার্ডের ছবির সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
ভিডিওটির বর্ণনা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ওই ব্যক্তি কোনো ১১ বছরের শিশু নন; তিনি ১৮ বছর বয়সী তরুণ মো. বিজয়। অভিযোগ অনুযায়ী, মাদক কেনার জন্য টাকা না পেয়ে তিনি নিজের মায়ের কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকা চুরি করেন। এ ঘটনায় তাঁর মা মামলা করলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। একই তথ্য বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আই-এর একটি প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই একই ভিডিও অতীতেও বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন মিথ্যা দাবির সঙ্গে জড়িয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে। কখনও তাকে ১৩ বছরের শিশু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, আবার কখনও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করা হয়েছে।
আরও গভীরে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে একই ধরনের দাবি দিয়ে ছড়ানো একটি ছবিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে পরিবর্তনের প্রমাণ মিলেছিল। বর্তমান ভাইরাল ফটোকার্ডেও একই কৌশল প্রয়োগ করে মূল ছবির সঙ্গে ভিন্ন মুখ ও গল্প জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
সুতরাং, চাঁদপুরে ১১ বছরের এক শিশুর প্রতিশোধের গল্পটি বাস্তব নয়। একটি ভিন্ন ঘটনার ছবি ব্যবহার করে, ডিজিটাল সম্পাদনার মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে এই বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট, যা আবেগকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে।



