রিভিউ
নিরাপদ আশ্রয় যখন বন্দিশালা

‘দ্য লাস্ট হাউজ’ সিনেমার দৃশ্য। নেটফ্লিক্স
আপনি সপরিবারে বড়দিনের জন্য ক্রিসমাস ট্রি কিনতে বাইরে যাচ্ছেন। এমন সময় জানতে পারলেন, বাড়ির মূল দরজা খুলছে না। ছোটাছুটি আর বিকল্প পথ ব্যবহার করে বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু ব্যর্থ হলেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই লক্ষ করলেন, পরিবার ও প্রতিবেশীসহ সবাই নিজের ঘরেই বন্দি। এমনই শ্বাসরুদ্ধকর ও রহস্যময় পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি হয়েছে লুই লেতেরিয়ের পরিচালিত ‘দ্য লাস্ট হাউজ’। সিনেমাটি এখন ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সে দেখা যাচ্ছে।
গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে রাইলি ও জেসন দম্পতি এবং তাদের দুই সন্তান। শুরুতে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও হঠাৎ এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পরিবারটি বুঝতে পারে, বাড়ির দরজা-জানালা কোনোভাবেই খোলা যাচ্ছে না। বাইরে চলছে অদ্ভুত বৃষ্টি, যার সঙ্গে যুক্ত অজানা কোনো শক্তি যেন পুরো বাড়িকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছে।
এটি শুধু কয়েক দিন বা সপ্তাহের বন্দিত্ব নয়; সিনেমার গল্পে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ঘরের ভেতর আটকে থাকার বিষয়টি উঠে আসে। এই দীর্ঘ বন্দিত্ব শুধু তাদের শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও ভেঙে দিতে শুরু করে। বাইরে অবিরাম বৃষ্টি, অকেজো ফোন-ইন্টারনেট— সব মিলিয়ে বাড়িটি একসময় তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের বদলে কারাগারে পরিণত হয়। ক্ষুধা, ভয় ও অনিশ্চয়তা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কেও চাপ তৈরি করে।
বাইরে আসলে কী ঘটছে, এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নাকি অতিপ্রাকৃত ঘটনা— সিনেমার প্রথমার্ধে দর্শককে তা জানানো হয় না। এই কৌতূহল যখন তুঙ্গে, তখনই বাইরে থেকে এক অপরিচিত মানুষের আগমন ঘটে। যদি পৃথিবীর বাকি মানুষ সত্যিই হারিয়ে গিয়ে থাকে, তবে এই ব্যক্তি কোথা থেকে এলো? সে কি আসলেই সাহায্য করতে এসেছে, নাকি এই আগমন নতুন কোনো বিপদের ইঙ্গিত? এই প্রশ্নগুলোই ছবির দ্বিতীয়ার্ধকে এগিয়ে নেয়।
যদিও সিনেমার প্রথমার্ধ থেকেই ছোট মেয়েটি বারবার তার বাবাকে বোঝানোর চেষ্টা করে, বৃষ্টির পানি ও প্রকৃতি যেন তাদের কিছু বোঝাতে চাইছে। শুরুতে জেসন সেই কথাকে গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মেয়েটির সেই উপলব্ধি পরিবারটির সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। শেষ পর্যন্ত প্রকৃতির সংকেত বুঝতে পারাই তাদের বেঁচে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
‘পাস্ট লাইভস’ খ্যাত অভিনেত্রী গ্রেটা লি এখানে রাইলি চরিত্রে চমৎকার অভিনয় করেছেন। একজন মা হিসেবে মুখের অভিব্যক্তি, নীরবতা ও আতঙ্কের মধ্য দিয়ে নিজের ভয় নিয়ন্ত্রণ করে সন্তানদের আগলে রাখার চেষ্টা তিনি বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। অন্যদিকে, জেসন চরিত্রে অস্কার মনোনীত ওয়াগনার মৌরা একজন অসহায় বাবার বাস্তবসম্মত রূপ তুলে ধরেছেন। পরিস্থিতির ব্যাখ্যা খোঁজা থেকে শুরু করে পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা— প্রতিটি পর্যায়েই তার চরিত্রে অসহায়ত্ব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
‘দি ইনক্রেডিবল হাল্ক’ ও ‘ফাস্ট এক্স’-এর মতো বড় বাজেটের অ্যাকশন মুভির জন্য পরিচিত পরিচালক লুই লেতেরিয়ের এখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হেঁটেছেন। বড় অ্যাকশন সেটের বদলে প্রায় পুরো গল্পকে একটি বাড়ির চার দেয়ালের মধ্যে আটকে রেখে দর্শককে ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি।
৭ আগস্ট মুক্তির পর থেকেই মুভিটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একদিকে এর অস্বস্তিকর পরিবেশ ও রহস্য ধরে রাখার কৌশল প্রশংসা পেয়েছে; অন্যদিকে সমালোচকদের একটি বড় অংশ দুর্বল চিত্রনাট্য নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে গল্পের শুরুতে যে প্রশ্নগুলো তৈরি হয়, শেষ পর্যন্ত সবকটির উত্তর সমানভাবে সন্তোষজনক হয়নি।
‘দ্য লাস্ট হাউজ’ হয়তো অনেকের কাছেই একটি নিখুঁত সিনেমা হয়ে উঠতে পারেনি; তবে নিজের ঘরই যখন হঠাৎ বন্দিশালায় পরিণত হয়, তখন নিরাপত্তা, পরিবার ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নিয়ে সিনেমাটি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। বিশেষ করে করোনা মহামারী মোকাবিলার পর প্রকৃতির সংকেত ও মানুষের অসহায়ত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি সুযোগ তৈরি করে ‘দ্য লাস্ট হাউজ’। শেষ পর্যন্ত তাই এটি নিখুঁত হরর সিনেমা না হলেও অস্বস্তিকর এক অভিজ্ঞতা হিসেবে দর্শকের মনে ছাপ ফেলে যায়।
সিনেমার নাম: দ্য লাস্ট হাউজ
পরিচালক: লুই লেতেরিয়ের
অভিনয়: গ্রেটা লি, ওয়াগনার মৌরা, রাইলি চুং
দৈর্ঘ্য: প্রায় ১ ঘণ্টা ৫২ মিনিট
মুক্তি: ৭ আগস্ট ২০২৬
প্ল্যাটফর্ম: নেটফ্লিক্স





