তামিলনাড়ুতে শুরু হতে যাচ্ছে থালাপতি বিজয়ের যুগ

তামিলনাড়ুতে অভিনেতা থেকে রাজনীতিবিদদের দলে যোগ দেওয়া সর্বশেষ ব্যক্তি হলেন মেগাস্টার বিজয়।
তামিলনাড়ুর সাধারণ মানুষ ভক্তি করেন তাদের প্রিয় অভিনেতা আর নেতাদের একদম সমান তালে। রুপালি পর্দার তারকাদের নেতা হিসেবে বেছে নেওয়ার রয়েছে এক লম্বা আর রঙিন ইতিহাস এই রাজ্যে।
কিংবদন্তি এমজিআর আর তার সুযোগ্য উত্তরসূরি জয়ললিতা জয় করেন মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার গৌরব নিজেদের জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে। ডিএমকে প্রতিষ্ঠাতা আন্নাদুরাই আর করুণানিধি ছিলেন কলম জাদুকর আর তুখোড় চিত্রনাট্যকার রাজনীতির মাঠে নামার আগে। তারা প্রত্যেকেই পেয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বিপুল জনসমর্থন আর আকাশচুম্বী রাজনৈতিক সাফল্য।
মেগাস্টার বিজয় হলেন অভিনেতা থেকে নেতা হওয়া এই ক্লাবের একদম টাটকা আর নতুন এক সদস্য। তামিলনাড়ুর নির্বাচনের ফল ঘোষণার ঠিক আগমুহূর্তে জনমত জরিপগুলো দিচ্ছে ক্ষমতাসীন ডিএমকের জয়ের ইঙ্গিত।
তবে একটি বড় পোলিং সংস্থা দাবি করছে যে বিজয়ের দল ১২০টি আসন নিয়ে পেতে পারে বিশাল এক জয়। তাদের মতে বিজয় হয়ে উঠতে পারেন তামিল রাজনীতির পরবর্তী এমজিআর এই নির্বাচনের মাধ্যমে। যদিও এক্সিট পোলের সব পূর্বাভাস মাঝেমধ্যে একদম উল্টে যায় সাধারণ মানুষের রায়ে।
বিজয় প্রায় দুই বছর আগে ঘোষণা দেন নিজের নতুন রাজনৈতিক দল ‘তামিলাগা ভেট্রি কাজাগম’ (টিভিকে) গঠনের কথা। তিনি পরিষ্কার করে জানিয়েছিলেন, ২০২৬ সালের নির্বাচনে তার দল নামবে সরাসরি ভোটের লড়াইয়ে।
রাজনীতিকে তিনি দেখেন মানুষের পবিত্র সেবা হিসেবে; স্রেফ অন্য কোনো পেশার বদলে। নিজের লক্ষ্যের কথা জানিয়ে তিনি বলেছেন, রাজনীতি তার কোনো শখ নয়; বরং এটি জীবনের এক বড় অন্বেষণ। রাজনীতির জন্য তিনি ইতি টানেন নিজের রুপালি পর্দার ক্যারিয়ারে ‘জানা নায়গান’ সিনেমার মাধ্যমে। তার সেই শেষ সিনেমাটি এখন আটকে আছে সেনসর বোর্ডের জটিলতায় কোনো এক অজানা কারণে।
৫১ বছর বয়সী এই অভিনেতা লড়ছেন পেরাম্বুর আর ত্রিচি ইস্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ সব আসন থেকে। জনগণের পাশে থেকে নীতিগত রাজনীতি করার শপথ নিয়েছে তার দল এই কঠিন লড়াইয়ের ময়দানে।
সিনেমা জগতের বড় বড় নাম শিবাজি গণেশন বা কমল হাসানের ব্যর্থতা কাজ করবে বিজয়ের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা হিসেবে। তবে অন্ধ্র প্রদেশের কিংবদন্তি এনটি রামা রাওয়ের উত্থান জোগাতে পারে বিজয়ের মনে এক নতুন আশার আলো।
এনটিআর রাজনীতিতে আসার মাত্র ৯ মাসের মাথায় দখল করেন মুখ্যমন্ত্রীর গদি নিজের অদম্য ইচ্ছা আর জনপ্রিয়তায়। বিজয়ও অনেক বছর ধরে সাজিয়েছেন নিজের রাজনৈতিক চালগুলো খুব গোপনে আর সুনিপুণ পরিকল্পনায়।
২০০৯ সালে তিনি নিজের হাজার হাজার ফ্যান ক্লাবকে রূপ দেন এক বড় সমাজসেবামূলক সংগঠনে। এই সংগঠনটি ২০১১ সালের নির্বাচনে সমর্থন দেয় এআইএডিএমকে জোটকে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের জন্য। এমজিআরও একসময় তার বিশাল ফ্যান বাহিনীকে বদলে ফেলেছিলেন রাজনৈতিক শক্তিতে নিজের দল গঠনের আগে।
সমালোচকরা মনে করেন, বিজয়ের সিনেমাগুলো অনেক আগেই বুনে দিয়েছিল তার রাজনীতির এই মজবুত বীজ। শিশুশিল্পী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করা এই অভিনেতা বড় পর্দায় আসেন ১৯৯২ সালে নিজের মা-বাবার হাত ধরে। প্রথম সিনেমাটি ফ্লপ হলেও বিজয় হারাননি নিজের মনোবল; বরং এগিয়ে গেছেন দাপটের সঙ্গে।
তার ‘থালাইভা’ সিনেমার সেই নেতৃত্ব দেওয়ার ট্যাগলাইনটি উসকে দেয় তার রাজনীতিতে নামার সব জল্পনা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিজয় বদলে ফেলেন নিজের পর্দার সেই মারকুটে হিরোর ইমেজকে একদম সচেতনভাবে। সিনেমায় তিনি নিজেকে তুলে ধরেন শোষিত মানুষের ত্রাণকর্তা হিসেবে সামাজিক ন্যায়বিচারের লড়াইয়ে।
কৃষকদের দুঃখ থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি নিয়ে সোচ্চার হন তিনি নিজের একের পর এক সুপারহিট সিনেমায়। বিজয়ের বাবাও ছিলেন বামপন্থী ঘরানার মানুষ এবং ছেলের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে রেখেছেন বড় এক নেপথ্য ভূমিকা।
২০২০ সালে বিজয়ের বাবা তার সংগঠনকে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন করলে শুরু হয় বাবা-ছেলের সঙ্গে এক আইনি লড়াই। বিজয় তখন প্রকাশ্যে অস্বীকার করেন এই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নিজের কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতার কথা। তবে এক বছর পরেই তার সংগঠনের কর্মীরা চমক দেখান স্থানীয় নির্বাচনে ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১১৫টি জয় করে। বিজয় ইদানীং নিজে তদারক করছেন দলের প্রার্থী বাছাই আর রাজনীতির সব গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা।
বিজয়ের এই রাজনৈতিক ময়দানে নামাটা মোটেও আকস্মিক বা হুট করে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা ছিল না। ২০১১ সালে জেলেদের পাশে দাঁড়ানো বা ২০১৭ সালে নিট পরীক্ষার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া প্রমাণ করে তার অনেক দিনের রাজনৈতিক বাসনা।
বিজয় প্রথম বড় হোঁচট খান গত সেপ্টেম্বরে নিজের নির্বাচনী জনসভায় ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ পদদলিত হওয়ার ঘটনায়। সেই দুর্ঘটনায় ১১ শিশুসহ প্রাণ হারায় ৪১ জন মানুষ, যা জন্ম দেয় তীব্র সমালোচনা। বিজয় সেই ঘটনার পরপরই মঞ্চ ছেড়ে চলে যান বিমানবন্দরে এবং চেন্নাই পৌঁছেও এড়িয়ে যান সাংবাদিকদের সব প্রশ্ন। তিন দিন পর এক ভিডিও বার্তায় তিনি প্রকাশ করেন নিজের শোক আর দুঃখ নিহতদের পরিবারের প্রতি।
এক মাস পরে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে নিয়ে আসা হয় চেন্নাইয়ের এক গোপন রিসোর্টে অভিনেতার সঙ্গে দেখা করার জন্য। সাংবাদিকদের থেকে দূরে রেখে তাদের বিশেষ বাসে করে আনা হয় অভিনেতার এই বিশেষ সাক্ষাতের আয়োজনে।
ব্যক্তিগত জীবনেও বিজয় পার করছেন এক কঠিন সময় যখন তার স্ত্রী ফেব্রুয়ারিতে শুরু করেন বিবাহবিচ্ছেদের আইনি প্রক্রিয়া। স্ত্রীর পক্ষ থেকে অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহার আর প্রতারণার, যা ভাবমূর্তিতে ফেলেছে এক নেতিবাচক প্রভাব। তবুও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিজয়ের রয়েছে এক বিশাল ভক্ত বাহিনী, যারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে পুরনো সব রাজনৈতিক দল থেকে।
বিজয় সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি ডিএমকে বা বিজেপি কোনো পক্ষেই পা বাড়াবেন না নিজের আদর্শ রক্ষায়। টিভিকে মনে করে বিজেপি বা ডিএমকের সঙ্গে জোট করা হবে তাদের রাজনৈতিক আদর্শের চরম এক অপমান। তারা জনগণের শক্তিকে পুঁজি করে এগিয়ে যেতে চায় একা এই ভোটের অসম লড়াইয়ে।
বিজয়ের নির্বাচনী ইশতেহার সাজানো হয়েছে মূলত বেকার যুবক, নারী আর জেলেদের ভাগ্য বদলানোর নানা স্বপ্ন দিয়ে। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মাছের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ আর মাছ ধরা নিষিদ্ধের সময় বড় অংকের নগদ সহায়তা দেওয়ার। ছাত্রদের জন্য ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনা সুদে শিক্ষাঋণের এক অভাবনীয় প্রস্তাব রেখেছেন তিনি তার নির্বাচনী ইশতেহারে।
এ ছাড়া নারীদের জন্য বছরে ছয়টি সিলিন্ডার ফ্রি আর মাসিক ভাতার পরিমাণ আড়াই হাজার টাকা করার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি প্রচারণায়। এমনকি বিয়ের সময় উপহার হিসেবে আট গ্রাম স্বর্ণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি অভাবী মেয়েদের জন্য।
অভিনয়ের একদম তুঙ্গে থাকা অবস্থায় রাজনীতিতে নেমে বিজয় এক নতুন বাজি ধরেছেন নিজের উজ্জ্বল ক্যারিয়ার নিয়ে। তিনি এখন ডাক দিয়েছেন এক ‘বাঁশি বিপ্লবের’ যেখানে বাঁশিই হলো তার দলের বিশেষ নির্বাচনী প্রতীক। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা, বর্তমানে দক্ষিণের রাজ্য তামিলনাড়ুর ২৩৪ আসনে একযোগে ভোট গণনা চলছে। থালাপতির নতুন দল তামিলাগা ভেট্রি কাজাগম বা সংক্ষেপে টিভিকে এগিয়ে আছে ১০৬ আসনে। আজ জানা যাবে বিজয়ের এই বাঁশির সুরে তামিল জনতা নাচে কি না।







