গিটার জাদুকরের জন্মদিন

আইয়ুব বাচ্চু -সাজ্জাদ হোসেন
সাংস্কৃতিক সংগঠক এরশাদুল হক টিংকু খুব কাছ থেকে দেখেছেন আইয়ুব বাচ্চুকে। তার স্মৃতিতে উজ্জ্বল কিছু ঘটনা তুলে ধরেছেন—
১৯৯২ সালের কথা। খবর পেলাম, বাচ্চু ভাইয়ের ডাবল অ্যালবামের রেকর্ডিং চলছে সারেগামায়। স্টুডিওতে গিয়ে দেখি ব্যান্ডের বাচ্চু ভাই, টুটুল ভাই, স্বপন ভাই, জয়সহ সবাই প্রচণ্ড গরমের মধ্যে রেকর্ডিং করে ঘেমে গোসল করে বের হচ্ছেন। বাচ্চু ভাই ভীষণ উত্তেজিত। বললেন, দেখিস, এটি বাংলাদেশের ইতিহাস হবে— একসঙ্গে দুই ক্যাসেটের ডাবল অ্যালবাম। পরে অ্যালবামটি শুনে সত্যিই অবাক হয়েছিলাম। বেকার যুবক, পেনশন— সমাজের নানা চরিত্র ও বাস্তবতা উঠে এসেছিল একেকটি গানে। ‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে’র মতো গান তো ছিলই। আমার মনে হয়েছিল, এটি শুধু একটি অ্যালবাম নয়, একটি সাহসী সৃজনশীল উদ্যোগও বটে।
বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। তার বাসায় যেতাম, এবি কিচেনে আড্ডা দিতাম। দেশের বিভিন্ন জায়গায় তার শো হলে ডাকতেন। একবার জেমস ভাইকে নিয়ে ‘নয়া জমানার নয়া গুরু’ নামে একটি প্রচ্ছদ প্রতিবেদন করেছিলাম আনন্দভুবন ম্যাগাজিনে। সেই সংখ্যাটা বিক্রিও হয়েছিল বেশ; কিন্তু ওই লেখার কারণে বাচ্চু ভাই আমার ওপর অভিমান করেছিলেন। তার স্টুডিওতে গেলেও চুপ করে থাকতেন, কথা এড়িয়ে যেতেন। খুব খারাপ লাগত। একসময় অবশ্য ভুল বোঝাবুঝি কেটে যায়। পরে বুঝেছি, শিল্পীদের মধ্যে পেশাগত প্রতিযোগিতা থাকতেই পারে; কিন্তু আশপাশের মানুষ যখন সেটাকে উসকে দেয়, তখনই সমস্যা হয়। বাচ্চু ভাই আর জেমস ভাইয়ের মধ্যেও কখনো অভিমান হয়েছে, কথা কাটাকাটি হয়েছে; কিন্তু তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গাটা অটুট ছিল।
বাচ্চু ভাইকে আমি সবচেয়ে বেশি বুঝেছি গিটার দিয়ে। চট্টগ্রামের মিউজিক সিন নিয়ে কাজ করার সময় তার গুরু জ্যাকব ডায়াসের সঙ্গে পরিচয়। তিনি বলেছিলেন, বাচ্চুর মধ্যে গিটার শেখার যে ডেডিকেশন ছিল, তিনি নিজেও সেই জায়গায় যাওয়ার কথা ভাবতে পারেন না। তিনি গিটারের ভেতরে নিজের আত্মা নিয়ে ঢুকে যেতেন। আজ বাংলাদেশের ১০ জন গিটারবাদককে জিজ্ঞাসা করলে অন্তত সাত-আটজন বলবে, আইয়ুব বাচ্চুকে দেখে তাদের গিটার বাজানোতে আগ্রহী হয়েছে।
আমি নিজেও বাচ্চু ভাইয়ের মালিবাগের বাসায় গিয়ে দেখেছি— তিনি কার্লোস সান্তানা শুনে শুনে নিজেই গিটার বাজাচ্ছেন। একটি ছোট অংশ হয়তো পাঁচ-সাত মিনিটের; কিন্তু তিনি সেটাকে নিজের মতো করে আধা ঘণ্টা ধরে বাজাচ্ছেন।
বাচ্চু ভাইয়ের লাইভ পারফরম্যান্সও ছিল অন্য রকম। এমন কনসার্ট দেখেছি যেখানে রাত ১০-১১টার দিকে মঞ্চে উঠেছেন, তারপর ভোর হয়ে সকাল ৭টা পর্যন্ত বাজিয়েছেন। একটা ৪-৫ মিনিটের গান এমনকি ২০ মিনিট পর্যন্ত বাজিয়ে গেছেন। যখন বাজাতেন, মনে হতো গান আর গিটারের মধ্যে হারিয়ে গেছেন।
মৃত্যুর প্রায় মাস দেড়েক আগে চ্যানেল আইয়ের একটি অনুষ্ঠানে শেষ দেখা। ডেকে বললেন, ‘চল, একটু কফি খাই।’ একসঙ্গে কফি খেলাম, আড্ডা দিলাম। সেলফি তুললাম। তখনই শরীরটা খারাপ দেখেছিলাম। অনেক শারীরিক সমস্যা তিনি লুকিয়ে রাখতেন। বলেছিলাম, চেকআপ করান। এর কিছুদিন পর তো চলেই
গেলেন। জন্মদিন খুব জাঁকজমক করে পালন করার মানুষ তিনি ছিলেন না। তবে ঢাকায় থাকা চট্টগ্রামের মানুষ ও তার ভক্তরা প্রতিবছর তাকে মনে করে মেজবানের আয়োজন করে। এটা খুব সুন্দর একটা উদ্যোগ।






