হোমারের মহাকাব্য নিয়ে নোলানের সিনেমা, কেন এত বিতর্ক?

১৭ জুলাই প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে ‘দ্য ওডিসি’
বিশ্ববিখ্যাত পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান সিনেমা বানানো মানেই বিশ্ব জুড়ে তুমুল হইচই। তার শেষ সিনেমা ‘ওপেনহেইমার’ দিয়ে অস্কার জেতার পর, এবার তিনি হাত দিয়েছেন গ্রিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মহাকাব্য হোমারের ‘দ্য ওডিসি’-তে।
ম্যাট ডেমন ও জেনডায়ার মতো মেগা তারকাদের নিয়ে তৈরি এই সিনেমাটি ২০২৬ সালের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত ছবি হলেও, মুক্তির আগেই এটি আন্তর্জাতিক মহলে তুমুল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তলোয়ার আর রূপকথার এই সিনেমাটি নিয়ে কেন এত বিতর্ক?
সিনেমার ট্রেলার ও কাস্টিং সামনে আসার পর থেকেই রক্ষণশীল দর্শকরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। হোমারের মূল কাব্যে ‘ট্রয়ের হেলেন’-কে শ্বেতাঙ্গ বা ফর্সা হিসেবে বর্ণনা করা হলেও নোলান এই চরিত্রে কাস্ট করেছেন বিখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেত্রী লুপিতা ইয়ংও-কে। অনেকেই ২০০৪ সালের ‘ট্রয়’ সিনেমায় ব্র্যাড পিট ও ডায়ান ক্রুগারের কাস্টিংয়ের দোহাই দিয়ে নোলানের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন।
এমনকি ডানপন্থী ব্লগার ম্যাট ওয়ালশ ও প্রযুক্তি বিলিয়নিয়ার ইলন মাস্কও নোলানের এই সিদ্ধান্তকে ‘বর্ণবাদী তকমা পাওয়ার ভয়’ বলে কটাক্ষ করেছেন। এর জবাবে লুপিতা ইয়ংও স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘এটি একটি রূপকথার গল্প। আমাদের কাস্ট পুরো বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব করছে।’
তবে গ্রিক ও ব্রিটিশ সাংবাদিকদের একাংশ আবার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, গ্রিসের নিজস্ব মহাকাব্যে কোনো গ্রিক অভিনেতাকেই রাখা হয়নি! এ ছাড়া সিনেমায় একজন রূপান্তরকামী অভিনেতা এলিয়ট পেজ এবং র্যাপার ট্র্যাভিস স্কটকে কাস্ট করা নিয়েও বিতর্ক কম হয়নি।
সিনেমার ট্রেলার প্রকাশের পর আরেকটি বড় ধাক্কা ছিল অভিনেতাদের আমেরিকান উচ্চারণ এবং আধুনিক কথ্য ভাষার ব্যবহার। যেমন— স্পাইডার-ম্যান খ্যাত টম হল্যান্ড প্রাচীন রাজকীয় কায়দায় ‘ফাদার’ সম্বোধন না করে তার চেনা স্পাইডার-ম্যানের গলায় বলে ওঠেন, ‘মাই ড্যাড ইজ কামিং হোম’।
এটি দেখে অনেক দর্শকই মজা করে কমেন্ট করেছেন, ‘শুনতে মনে হচ্ছে প্রাচীন গ্রিসের কোনো যোদ্ধা নয়, বরং স্টারবাক্স কফি শপের বাইরে দাঁড়িয়ে দুই আমেরিকান বন্ধু আড্ডা দিচ্ছে!’
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হলিউডের একটা পুরনো ট্রেন্ড হলো প্রাচীন রোমান বা গ্রিকদের সবসময় ব্রিটিশ রাজকীয় উচ্চারণে কথা বলাতে হবে। কিন্তু বাস্তবে প্রাচীন গ্রিকরা তো আর আধুনিক ব্রিটিশ বা আমেরিকানদের মতো কথা বলত না! যেহেতু ‘ওডিসি’ মূলত মুখে মুখে প্রচলিত গল্প ছিল, তাই কথ্য ভাষার ব্যবহার হোমারের মূল চেতনার কাছাকাছিই হতে পারে।
ট্রেলারে দেখা গেছে, সিনেমায় ‘অ্যাগামেমনন’ চরিত্রে অভিনয় করা বেনি সাফদির বর্ম বা আর্মার দেখতে অনেকটাই হলিউডের সুপারহিরো ‘ব্যাটম্যান’-এর পোশাকের মতো লাগছে।
আবার ওডেসিয়াসের নৌকাটিকে গ্রিক নৌকার চেয়ে ভাইকিং জাহাজের মতো বেশি মনে হচ্ছে। রূপকথার সিনেমা হলেও দর্শকরা চাইছেন সবকিছু যেন একদম নিখুঁত ও বাস্তবসম্মত হয়।
ক্রিস্টোফার নোলানের সিনেমা মানেই কোটি কোটি ডলারের প্রজেক্ট এবং বিশাল সাংস্কৃতিক ঘটনা। নোলানের সিনেমার রাজনীতি বা দর্শন সবসময় একপেশে হয় না; সেখানে বামপন্থী ও ডানপন্থী উভয় মতাদর্শের মানুষই নিজেদের পছন্দের উপাদান খুঁজে পায়।
অতীতে তার ‘ব্যাটম্যান’ ট্রিলজিকে রক্ষণশীলরা নিজেদের ঘরানার মনে করায়, এবার ‘দ্য ওডিসি’তে নোলানের প্রগতিশীল বা মডার্ন টাচ দেখে তারা কিছুটা হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
তবে সমালোচনা যাই হোক না কেন, নোলান ঘরানার বাইরে গিয়ে নিজের মতো করে সিনেমা বানাতে ভালোবাসেন। আর এই বিশাল ক্যানভাস, সাহিত্যিক আভিজাত্য এবং কাস্টিংয়ের চমকের কারণেই আগামী ১৭ই জুলাই প্রেক্ষাগৃহে যখন ‘দ্য ওডিসি’ মুক্তি পাবে, তখন দর্শক যে হলমুখী হবেন— তা বলাই বাহুল্য!





