স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়, নাকি ভাড়াবাড়ির শিক্ষা?

খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী ক্যাম্পাস
একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু কয়েকটি ভবন, কিছু শিক্ষক কিংবা কয়েকটি বিভাগ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় হলো একটি জাতির জ্ঞান উৎপাদনের কারখানা, গবেষণার কেন্দ্র, উদ্ভাবনের সূতিকাগার এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তোলার প্রতিষ্ঠান। একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মানই নির্ধারণ করে সেই দেশের আগামী দিনের অর্থনীতি, কৃষি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সমাজের গতিপথ।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, গত দেড় দশকে দেশে বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও সেগুলোর ক্ষেত্রে পরিকল্পনার চেয়ে প্রতিষ্ঠান ঘোষণার তাড়াহুড়োই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। যেন ব্যাঙের ছাতার মতো বিশ্ববিদ্যালয় গজিয়েছে, কিন্তু তাদের অধিকাংশেরই নেই স্থায়ী ক্যাম্পাস, মানসম্মত গবেষণাগার, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, আবাসিক হল কিংবা প্রয়োজনীয় গবেষণা অবকাঠামো। খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সেই বাস্তবতারই একটি বেদনাদায়ক উদাহরণ।
২০১৭ সালে জাতীয় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু হয়। এরপর থেকে পাঁচটি অনুষদে প্রতিবছর শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে। ইতোমধ্যে কৃষি অনুষদের তিনটি এবং অন্যান্য অনুষদের দুটি ব্যাচ স্নাতক সম্পন্ন করেছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার প্রায় এক দশক পরও বিশ্ববিদ্যালয়টির নিজস্ব ক্যাম্পাস নেই। নেই গবেষণার জন্য ফিল্ড ল্যাব, নেই সমৃদ্ধ কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, নেই শিক্ষার্থীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ আবাসিক সুবিধা। এখনও ভাড়া করা ভবনে চলছে একাডেমিক কার্যক্রম, আর ভাড়া করা অফিসে পরিচালিত হচ্ছে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড।
একদিকে প্রায় ৭০০ শিক্ষার্থীর জন্য শতাধিক শিক্ষক এবং তিন শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন, অন্যদিকে শিক্ষার মৌলিক অবকাঠামোরই ঘাটতি রয়ে গেছে। এটি কেবল অবকাঠামোগত দুর্বলতা নয়; এটি সুষ্ঠু পরিকল্পনা, অগ্রাধিকার এবং সঠিক বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতার স্পষ্ট প্রতিফলন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, একজন শিক্ষার্থী কী স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে? দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মেধাবী শিক্ষার্থীরা কঠিন প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চশিক্ষার অঙ্গনে পা রাখেন। তারা ভাবেন, এখানে তারা নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করবেন, আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করবেন, বিশ্বমানের শিক্ষকদের কাছ থেকে শিখবেন এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ সুন্দর করে গড়ে তুলবেন। কিন্তু যখন তারা দেখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাস নেই, পর্যাপ্ত গবেষণাগার নেই, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি নেই, তখন সেই স্বপ্ন ধীরে ধীরে গভীর হতাশায় পরিণত হয়। এই হতাশা শুধু একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, এটি একটি পুরো জাতির সম্ভাবনার অপচয়।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, খুলনা অঞ্চল দেশের জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি। লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ঘনঘন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন এবং কৃষি উৎপাদনের পরিবর্তিত বাস্তবতা মোকাবিলায় এই অঞ্চলে একটি শক্তিশালী গবেষণাভিত্তিক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকল্প নেই। জলবায়ু সহনশীল কৃষি, লবণাক্ততা সহনশীল ফসল, উপকূলীয় কৃষি প্রযুক্তি, টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা এবং কৃষি উদ্ভাবনে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করতে পারে, যদি তাকে সেই সুযোগ ও উপযুক্ত অবকাঠামো প্রদান করা হয়।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্মার্ট ক্যাম্পাসে রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে অংশগ্রহণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যখন নিজস্ব ক্যাম্পাসই নেই, প্রয়োজনীয় গবেষণাগার নেই, মানসম্মত লাইব্রেরি নেই, তখন কেবল উচ্চাকাঙ্ক্ষী নীতিগত লক্ষ্য নির্ধারণ করে বিশ্বমান অর্জন করা সম্ভব নয়। বিশ্বমানের আন্তর্জাতিক র্যাংকিং অর্জিত হয় মৌলিক গবেষণা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং উন্নত অবকাঠামোর শক্ত ভিত্তির ওপর ভর করে।
তাই আজ প্রয়োজন সময়োপযোগী ও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ। খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দ্রুত স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন, জমি অধিগ্রহণ কাজ দ্রুত সম্পাদন, আধুনিক গবেষণাগার তৈরি, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি স্থাপন, স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ, শিক্ষার্থীদের উন্নত আবাসন ব্যবস্থা এবং বিস্তৃত গবেষণা খামার প্রতিষ্ঠাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সকল সরকারি সংস্থার সমন্বিত ও আন্তরিক উদ্যোগ ছাড়া এই বিশ্ববিদ্যালয় তার সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারবে না।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে কিছুটা সময় লাগে ঠিকই, কিন্তু সেই সময় যেন কোনো অজুহাত বা দীর্ঘসূত্রতার কারণ হয়ে না দাঁড়ায়। কারণ সময়ের অপচয়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি উদীয়মান প্রজন্মের স্বপ্ন, ক্ষতিগ্রস্ত হয় মৌলিক গবেষণার বিরাট সম্ভাবনা, পিছিয়ে পড়ে গোটা একটি উপকূলীয় অঞ্চল এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো বাংলাদেশ। খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল কোনো নামমাত্র প্রতিষ্ঠান নয়; এটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু অভিযোজন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আশা-আকাঙ্ক্ষার এক অনন্য প্রতীক।
লেখক : উপাচার্য, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা
[email protected]




