ইপিএ’র বড় বাধা নন-ট্যারিফ
- জাপানের বাজারে রপ্তানি বাণিজ্য

সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই হলেও দেশটির বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে বিভিন্ন অশুল্ক বা নন-ট্যারিফ শর্ত। পণ্যের গুণগত মান, রাসায়নিক নিরাপত্তা, লেবেলিং, ক্রেতাদের কঠোর শর্ত এবং সরবরাহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা রপ্তানি সম্প্রসারণে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও কৃষিপণ্য রপ্তানিতে এসব বাধা দূর করা জরুরি বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী এবং অর্থনীতিবিদরা।
তাদের মতে, বাংলাদেশের জন্য জাপানের সঙ্গে ইপিএ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শক্তিশালী অর্থনীতির দেশটির সঙ্গে এটি বাংলাদেশের প্রথম অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি। এর মাধ্যমে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পরও জাপানের বাজারে শুল্ক সুবিধা ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এ সুযোগ কাজে লাগাতে চুক্তির দ্রুত বাস্তবায়ন, সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রণয়ন এবং যেসব শর্ত সহজ করা সম্ভব, সেগুলো নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা করা প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘দুদেশের মধ্যে ইপিএ স্বাক্ষর হয়েছে। এখনো কোনো দেশই এটি অনুসমর্থন করেনি। অনুসমর্থনের পর বাস্তবায়নের পথনকশা তৈরি হলে বাংলাদেশ কী ধরনের সুবিধা পাবে, তা বোঝা যাবে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে বিষয়গুলো পরিষ্কার করা হতে পারে।’
ব্যবসায়ীরা বলছেন, জাপানের ক্রেতারা পণ্যের গুণগত মান, নকশা ও বৈচিত্র্যের বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহের বিষয়টিও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অধিকাংশ পোশাক কারখানা মৌলিক ধরনের পোশাক উৎপাদনে অভ্যস্ত। ফলে জাপানি ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী নতুন নকশা ও বৈচিত্র্যময় পণ্য তৈরি এবং নতুন পণ্য উৎপাদনে ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক প্রতিষ্ঠান পিছিয়ে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জাপানের ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে ‘জাপান ডেস্ক’ চালু করেছে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ।
জাপানে সরাসরি পোশাক রপ্তানি করেন উর্মি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ আশরাফ। তিনি মনে করছেন, ইপিএর সম্ভাবনা কাজে লাগাতে রপ্তানিকারকদের শুল্ক সুবিধা ও উৎপত্তিবিধি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে। একই সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, পণ্যের বৈচিত্র্য, মান নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত সরবরাহের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি জাপানের বাজারে সফল হওয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
তার ভাষ্য, ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করতে পারলে তুলনামূলক বেশি দামেও বাংলাদেশ থেকে পোশাক কেনার আগ্রহ তৈরি হবে। কারণ, পণ্যের মানের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন জাপানের ক্রেতারা।
পোশাকের পাশাপাশি কৃষিপণ্য রপ্তানিতেও জাপানের বাজারে সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে জাপানে সবজি রপ্তানি করে অ্যারট অ্যাগ্রো। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাঞ্চন মিয়া জানালেন, আগে সরাসরি ঢাকা-নারিতা ফ্লাইটে প্রতিবার প্রায় এক টন সবজি রপ্তানি করতেন তারা। জাপানে আম রপ্তানির ক্রয়াদেশও পেয়েছেন। এ ছাড়া গাজর রপ্তানিরও সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সরাসরি ফ্লাইট বন্ধ থাকায় এখন বিকল্প পথে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে। এতে পরিবহন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে কৃষিপণ্য রপ্তানি বাড়াতে ঢাকা-নারিতা সরাসরি ফ্লাইট আবার চালুর জন্য সরকারের উদ্যোগ চান তিনি।
ব্যবসায়ীদের মতে, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতি, উন্নত কাঁচামালের সীমাবদ্ধতা এবং জাপানের কঠোর মান ও অন্যান্য শর্ত পূরণের চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এসব বাধা মোকাবিলায় জাপানি ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের চাহিদা বুঝে পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ এবং জাপানের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ৩৩১ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। বর্তমানে জাপান বাংলাদেশের নবম বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য এবং এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার।
জাপানের শুল্কমুক্ত সুবিধা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ প্রতি বছর ১৪০ কোটি ডলারের বেশি তৈরি পোশাক রপ্তানি করছে। দেশটিতে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশই তৈরি পোশাক। বিজিএমইএর লক্ষ্য, নিকট ভবিষ্যতে জাপানের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়িয়ে ৩০০ কোটি ডলারে উন্নীত করা।
তবে এই লক্ষ্য অর্জনে শুধু শুল্কসুবিধা যথেষ্ট নয়। ইপিএর কার্যকর বাস্তবায়নের পাশাপাশি নন-ট্যারিফ বাধা মোকাবিলা, পণ্যের মান উন্নয়ন, বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপরই নির্ভর করবে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণের সাফল্য।



