মুদ্রানীতি ঘোষণা
সুদে কড়াকড়ি বিনিয়োগে ছাড়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় নীতি সুদহার আগের মতোই ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখে গত মঙ্গলবার চলতি অর্থবছরের (২০২৬-২৭) প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে মুদ্রানীতি উপস্থাপন করেন ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান। নীতি সুদহার না কমলে ব্যাংকগুলোর তহবিলের খরচ কমে না। ফলে ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের সুদহারও তুলনামূলক বেশি থাকে। এতে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হওয়ার শঙ্কা থাকে।
এদিকে বিনিয়োগ জোরদার করতে প্রসারিত মুদ্রা (ব্রোড মুদ্রা বা এম-টু) ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩ শতাংশ, যা চলতি ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ছিল ১০ দশমিক ৮ শতাংশ।
এখানে লক্ষণীয় হলো— নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে, কিন্তু একই সঙ্গে অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধির লক্ষ্য বাড়িয়েছে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে তুলনামূলক বেশি তারল্যের সুযোগও রাখতে চাইছে। এটি এক ধরনের সতর্ক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে নতুন মুদ্রানীতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরতে গিয়ে ডেপুটি গভর্নর বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেখানে ৬ থেকে ৭ শতাংশ হওয়া উচিত, সেখানে বর্তমানে তা ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এদিকে মূল্যস্ফীতি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না আসায় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির অবস্থান বহাল রাখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন মুদ্রানীিততে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির ৭ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সেখানে বেসরকারি খাতে ঋণের স্থবিরতা কাটিয়ে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গতি আনতে শিল্প, কৃষি এবং কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা খাতের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজটি যুক্ত করা হয়।
এদিকে অর্থনীতিতে ভিত্তি মুদ্রা বা ‘রিজার্ভ মানি’ বৃদ্ধির লক্ষ্যও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৭ সালের জুনের জন্য রিজার্ভ মানি বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০২৫ সালের জুনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ দশমিক ২১ শতাংশ। রিজার্ভ মানি হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি মূল বা ভিত্তি মুদ্রা, যার ওপর ভিত্তি করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আরও বেশি ঋণ ও আমানত সৃষ্টি করতে পারে। এর লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর ফলে ব্যাংকগুলোর তারল্য বাড়তে পারে, ফলে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যও বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৭ সালের জুনের জন্য বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের জুনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সঙ্গে দেশীয় ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১০ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে ব্যবসা ও শিল্প খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়তে পারে, ফলে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেছেন, ‘খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী ১৮ মাসের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ছয় মাসের নীতি গতকাল জারি করা হয়েছে। এ ছাড়া আগামী বছরের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুটি আইন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একটি হচ্ছে অর্থঋণ আদালত আইন এবং অন্যটি সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন। এই আইন পাস হলে ২০২৭ সালে বিষয়টি ভিন্ন মাত্রা পাবে। একই সঙ্গে অর্থ সৃষ্টির সক্ষমতার সূচক ‘মানি মাল্টিপ্লায়ার’ ৫ দশমিক ২১ থেকে বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৩০ নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থাৎ একই পরিমাণ ভিত্তি মুদ্রার বিপরীতে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আগের তুলনায় কিছুটা বেশি অর্থ ও ঋণ সৃষ্টি করার সুযোগ থাকবে। এর সম্ভাব্য প্রভাব ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কিছুটা বাড়বে।
মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় অর্থনীতি নানা চাপের মধ্যে ছিল। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, আর্থিক ব্যবস্থায় আস্থাহীনতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন ও প্রান্তিক আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছিল। সরকার মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি রপ্তানিমুখী ও বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধির কৌশল অনুসরণ করছে।
মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে, বিশ্ব অর্থনীতি এখনো নানা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং জ্বালানি ও সারের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এসব কারণে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যয়জনিত মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হলেও শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কারণ বর্তমান মূল্যস্ফীতির বড় অংশই অতিরিক্ত চাহিদার কারণে নয়, বরং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, বাজারের অদক্ষতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের সমস্যার কারণে সৃষ্টি হয়েছে। এর পাশাপাশি উচ্চ সুদহার, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং সরকারের ঋণ গ্রহণ বাড়ার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, নতুন অর্থবছরের বাজেটে শুল্ক ও কর যৌক্তিকীকরণ এবং লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ সহায়তার ফলে ধীরে ধীরে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরবে। তবে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, ব্যয়জনিত মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা আগামী দিনেও দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।







