নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণ
মোস্তফা মেটালের আর্থিক প্রতিবেদনে অসঙ্গতি, দায়ীদের শনাক্তের নির্দেশ

ফাইল ছবি
শেয়ারবাজারে এসএমই প্ল্যাটফর্মে প্রকৌশল খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি মোস্তফা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদনে লভ্যাংশ ও সম্পদ নিয়ে নিরীক্ষকের বিশেষ গুরুত্বারোপ (এমফাসিস অব ম্যাটারস) পর্যবেক্ষণ পাওয়া গেছে। বিষয়টি নজরে আসায় নড়েচড়ে বসেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
এমন পরিস্থিতিতে কোম্পানিটির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে বকেয়া লভ্যাংশ ও স্থায়ী সম্পদের রেজিস্টার নিয়ে নিরীক্ষকের উত্থাপিত পর্যবেক্ষণের বিষয়ে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। একইসঙ্গে এই অনিয়মের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) নির্দেশ দিয়েছে এ নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
সম্প্রতি বিএসইসি থেকে ডিএসইর প্রধান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তার (সিআরও) কাছে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিএসইসির নির্দেশনা অনুযায়ী মোস্তফা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের আর্থিক প্রতিবেদনে বকেয়া লভ্যাংশ সংক্রান্ত অসঙ্গতি এবং হালনাগাদহীন স্থায়ীসম্পদ রেজিস্টারের বিষয়ে অস্পষ্টতা সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষক ও কোম্পানি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা গ্রহণ করবে ডিএসই।
এ ছাড়া কোম্পানি কর্তৃক সিকিউরিটিজ আইন, বিধিমালা বা প্রবিধানের কোনো সুনির্দিষ্ট লঙ্ঘন বা পরিপালনে গাফিলতি হয়েছে কি না, তা যাচাই করা হবে। একইসঙ্গে এই অনিয়ম বা আইন লঙ্ঘনের পেছনে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), সিএফও, কোম্পানি সচিব, নিরীক্ষকসহ কারা দায়ী, তাদের নাম-পদবি এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের ব্যাখ্যা সংগ্রহ করে তার বিস্তারিত প্রতিবেদন কমিশনে দাখিল করবে ডিএসই।
বিএসইসির চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, মোস্তফা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের আর্থিক প্রতিবেদনের ২০ দশমিক ০১ নোট অনুযায়ী, ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকারও বেশি লভ্যাংশ বকেয়া (ডিভিডেন্ড পেয়েবল) হিসেবে দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৬৬ টাকা নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া কোম্পানির স্থায়ী সম্পদ রেজিস্টার প্রদান করেছে, যা এখনও হালনাগাদ করা হয়নি। পাশাপাশি অলোচ্য অর্থবছরে কোম্পানিটির সম্পদের কোনো পুনর্মূল্যায়ন করা হয়নি।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, উপরোক্ত পরিস্থিতিতে ডিএসইকে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা যাচ্ছে যে, উল্লেখিত বিষয়গুলো সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষক ও কোম্পানির কাছ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা সংগ্রহ করবে। একইসঙ্গে কোম্পানির দ্বারা সিকিউরিটিজ আইন, বিধি ও প্রবিধানের কোনো লঙ্ঘন বা অপরিপালন হয়ে থাকলে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন কমিশনে দাখিল করতে হবে।
প্রতিবেদনে এসব লঙ্ঘনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের—পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব (সিএস), নিরীক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট অন্যদের চিহ্নিত করতে হবে এবং তাদের ব্যাখ্যাও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই চিঠি প্রদানের তারিখ থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন কমিশনে দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হলো।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোস্তফা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের আর্থিক প্রতিবেদনে নিরীক্ষক যে দুটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন, তা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। প্রথমত বকেয়া লভ্যাংশ হিসেবে বিপুল অংকের অর্থ দেখানো হলেও তার একটি বড় অংশ সময়মতো নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর না হওয়া বিনিয়োগকারীদের জন্য উদ্বেগজনক।
আইন অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোম্পানির লভ্যাংশ ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ টাকা একটি আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রাখতে হয়। কিন্তু কোম্পানিটি তা করেনি। এ ধরনের বিলম্ব বা অস্পষ্টতা থাকলে বিনিয়োগকারীরা সময়মতো তাদের অর্থপ্রাপ্তি নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েন। পাশাপাশি কোম্পানিটির নগদ ব্যবস্থাপনা (ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট) ও করপোরেট সুশাসন কতটা সুশৃঙ্খল- সে বিষয়ে প্রশ্নও উঠেছে।
দ্বিতীয়ত, স্থায়ী সম্পদের নিবন্ধন (ফিক্সড অ্যাসেট রেজিস্টার) হালনাগাদ না থাকা এবং সম্পদের পুনর্মূল্যায়ন না করা বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও বড় ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ সম্পদের সঠিক হিসাব ও মূল্যায়ন না থাকলে কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার সঠিক চিত্র পাওয়া যায় না।
অনেক সময় দেখা যায়, কাগজে-কলমে সম্পদ থাকলেও বাস্তবে তার অস্তিত্ব থাকে না বা তা নষ্ট হয়ে যায়। সম্পদ নিবন্ধন হালনাগাদ না থাকলে কোম্পানির সম্পদের ওপর কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ সম্পদের সঠিক হিসাব ছাড়া কোম্পানির প্রকৃত শেয়ার দর মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।
এ ছাড়া দীর্ঘ সময় পুনর্মূল্যায়ন না করলে সম্পদের বাজারমূল্য এবং বইমূল্যের মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়, যা কোম্পানির সঠিক আর্থিক চিত্র আড়াল করে। ফলে বিনিয়োগকারীরা ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
কমিশনের মতে, তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে এ ধরনের অস্পষ্টতা বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই এ ধরনের ঘটনায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর অবস্থান পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বিএসইসির এমন সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, আর্থিক প্রতিবেদনে কোনো ধরনের অস্বচ্ছতা থাকলে তা আর ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।

