অনলাইন লেনদেন সহজ করতে ক্রস-বর্ডার নীতিমালা
- ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালা-২০২৬-এর খসড়া প্রণয়ন
- বিদেশে বিক্রি, টাকার প্রতিটি ধাপ জানবে বাংলাদেশ
- বিদেশি ই-কমার্সও থাকবে নিয়ন্ত্রণে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কুড়িগ্রামের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ছোট অফিসে বসে কয়েক মিনিটের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একজন ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি করলেন। অর্থ জমা হলো নিরাপদ আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থা-এসক্রো অ্যাকাউন্টে। কাস্টমসের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৌঁছে গেল এনবিআরের সার্ভারে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন পর্যবেক্ষণ করল বাংলাদেশ ব্যাংক। কয়েক বছর আগেও এমন একটি বিষয় ছিল কল্পনার। এখন সেটিকেই বাস্তবে রূপ দিতে প্রথমবারের মতো ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালা-২০২৬-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নীতিমালাটি কার্যকর হলে বিশ্বের যেকোনো দেশের একজন ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে অনলাইনে পণ্য বা সেবা কিনতে পারবেন। তেমনি বাংলাদেশের একজন ভোক্তাও বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে আরও সহজে পণ্য আমদানি করতে পারবেন।
তবে খসড়ায় বলা হয়, এ আইনে কপিরাইট, ট্রেডমার্ক, পেটেন্টসহ সব মেধাস্বত্ব আইন কার্যকর থাকবে। ফলে পণ্যের নকল ব্র্যান্ড, পাইরেটেড সফটওয়্যার ও কপিরাইট লঙ্ঘনকারী এবং মিথ্যা তথ্য দিয়ে উদ্যোক্তারা পণ্য বিক্রি করতে পারবেন না। এ ছাড়া প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন এবং অনলাইন জুয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে খসড়া আইনে। িবশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অনলাইন ক্যাসিনো, বেটিং, লটারি, গেমিং টোকেন ও বিক্রি বা পরিচালনা করা যাবে না। সেখানে আরও বলা হয়, যে পণ্য আমদানি বা রপ্তানিতে নিষিদ্ধ, তা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও বিক্রি নিষিদ্ধ। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া গিফট কার্ড বা বিকল্প অর্থ প্রদানের ডিজিটাল মাধ্যম চালু করা যাবে না। জানতে চাইলে সাবেক অর্থ ও বাণিজ্য সচিব (সিনিয়র) মাহবুব আহমেদ বৃহস্পতিবার আগামীর সময়কে বলেছেন, যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে মিল রেখে এ আইন প্রণয়ন ঠিক আছে। তবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বাণিজ্যের আড়ালে মানি লন্ডারিং যাতে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর বিদেশে ব্যবসায়ীদের এ দেশে ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি হিসেবেও আইনটি প্রণয়ন করা হতে পারে।
বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও), জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা (আঙ্কটাড) এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সীমান্ত অতিক্রম করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক পণ্য ও সেবা বাণিজ্য বিশ্ব জুড়ে বাড়ছে। বৈশ্বিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের ই-কমার্স বাজারের আকার এরই মধ্যে ৬০০ থেকে ৭৪০ কোটি মার্কিন ডলারে (৯০ হাজার কোটি টাকায়) পৌঁছেছে। অর্থাৎ ডিজিটাল অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু এই খাত পরিচালিত হয়েছে বিচ্ছিন্ন আইন, ব্যাংকিং নির্দেশনা, কাস্টমস বিধি এবং ই-কমার্স নির্দেশিকার সমন্বয়ে। ফলে আন্তর্জাতিক লেনদেন, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, কর আদায়, ভোক্তা সুরক্ষা ও বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি— সব ক্ষেত্রেই ছিল নীতিগত শূন্যতা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এতদিন বিদেশি অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো কার্যত বাংলাদেশের ভোক্তাদের কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারলেও তাদের জন্য আলাদা কোনো নিবন্ধন বা জবাবদিহির বাধ্যবাধকতা ছিল না। কিন্তু নতুন খসড়ায় বাংলাদেশে ব্যবসা করতে হলে বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকেও ডিজিটাল বিজনেস আইডি (ডিবিআইডি) নিতে হবে। এর মাধ্যমে আগামীতে আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোও সরকারের নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় আসবে। ফলে কর আদায়, ভোক্তা অভিযোগ, তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া তুলনামূলক সহজ হবে।
অর্থ পাচার ও ভুয়া বাণিজ্যে কড়া নজর: ডিজিটাল বাণিজ্যের অন্যতম বড় ঝুঁকি হলো ভুয়া ইনভয়েস, আন্ডার-ইনভয়েসিং, অর্থ পাচার এবং অস্বচ্ছ বৈদেশিক লেনদেন। এই খসড়ায় আমদানি-রপ্তানির প্রতিটি ডিজিটাল লেনদেনে প্ল্যাটফর্মের পরিচয়, ক্রেতার তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট নথি সংযুক্ত রাখার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী বৈদেশিক অর্থ প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা (বিএফআইইউ) এবং এনবিআরের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান অনেক সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
লেনদেন পদ্ধতির পরিবর্তন: ক্রস বর্ডার ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালার আন্তর্জাতিক পেমেন্ট পদ্ধতি এসক্রো সার্ভিস চালুর বিধান রাখা হয়েছে। বর্তমানে সীমান্তপাড়ের অনেক অনলাইন লেনদেনে ক্রেতাকে আগে অর্থ পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু পণ্য না পৌঁছানো, নিম্নমানের পণ্য বা প্রতারণার অভিযোগও কম নয়। এসক্রো চালু হলে ক্রেতার অর্থ একটি নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষিত থাকবে। পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ার পরই বিক্রেতা অর্থ পাবেন। আন্তর্জাতিকভাবে এই পদ্ধতি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আমাজন, ই-বে, আলিবাবাসহ বিভিন্ন ডিজিটাল বাণিজ্য ব্যবস্থায় ভোক্তার আস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
নীতিমালায় ঘোষণা থাকছে ছোট পার্সেল রপ্তানি সহজ করা, আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস সুবিধা বাড়ানো, বিদেশে ওয়্যার হাউজ স্থাপনে নীতিগত সহায়তা এবং ডিজিটাল রপ্তানি আয়ের জন্য সম্ভাব্য প্রণোদনার। এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের বাধা উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। বিশেষ করে হস্তশিল্প, চামড়াজাত পণ্য, পোশাক, কৃষিপণ্য, আইটি সেবা এবং ফ্রিল্যান্সিং খাত এতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে।
এ ছাড়া খসড়ায় বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো এবং ডিজিটাল বাণিজ্য প্ল্যাটফর্মের মধ্যে দুটি ডিজিটাল সিস্টেমের মধ্যে যোগাযোগের সেতু অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (এপিআই) ভিত্তিক সংযোগ তৈরির পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।




