রয়্যাল ফুটওয়্যারের মাধ্যমে নতুন ফাঁদ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ব্যবসা সম্প্রসারণ ও ব্যাংক ঋণের সুদ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০২৩ সালে শেয়ারবাজারের এসএমই প্ল্যাটফর্মে কোয়ালিফায়েড ইনভেস্টরস অফারের (কিউআইও) মাধ্যমে ৫ কোটি টাকা তুলেছিল আল-মদিনা ফার্মাসিউটিক্যালস। বাজারে আসার আগে কোম্পানিটির বিক্রি ও মুনাফায় ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি থাকলেও তালিকাভুক্তির মাত্র তিন বছরের মধ্যে তাতে ভয়াবহ ধস নামে। লক-ইন মেয়াদ শেষ হতেই কোম্পানিটির তিন উদ্যোক্তা-পরিচালক মো. বিল্লাল হোসাইন, মো. জাকির হোসাইন পাটোয়ারি এবং মো. কামরুল আলম তাদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করে দেন। একই উদ্যোক্তা গোষ্ঠী ও ইস্যু ম্যানেজার রয়্যাল ফুটওয়্যারের মাধ্যমে নতুন ফাঁদ পেতেছে। কিউআইওর মাধ্যমে এবার ১২ কোটি টাকা উত্তোলনের উদ্যোগ নিয়েছে তারা। আগের কোম্পানির চরম ব্যর্থতা ও কারসাজির কারণে নতুন কোম্পানির কিউআইও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে গভীর সংশয়।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইস্যু ম্যানেজার প্রাইম ব্যাংক ইনভেস্টমেন্টের মাধ্যমে আল-মদিনা ফার্মাসিউটিক্যালস ৫ কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহ করে। প্রসপেক্টাসে বলা হয়েছিল, এই অর্থের ৩ কোটি ৮ লাখ ব্যবসা সম্প্রসারণে, ১ কোটি ৬৭ লাখ ঋণ পরিশোধে এবং ২৫ লাখ টাকা কিউআইও-সংক্রান্ত ব্যয়ে ব্যবহার করা হবে। কিন্তু তালিকাভুক্তির পর কোম্পানিটির আসল রূপ বেরিয়ে আসে। শেয়ারবাজারে আসার আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে কোম্পানির মোট বিক্রি ছিল ৬৬ কোটি ৯০ লাখ, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে ৪৮ কোটি ১৭ লাখ টাকায় নেমে আসে। একই সময়ে নিট মুনাফা ১ কোটি ৯৭ লাখ থেকে কমে ১ কোটি ১৮ লাখ টাকায় দাঁড়ায় এবং শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ১ টাকা ৩০ পয়সা থেকে কমে হয় মাত্র ৫৮ পয়সা।
অথচ বাজারে আসার আগে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে কোম্পানিটির আর্থিক চিত্রে বিস্ময়কর উন্নতি দেখানো হয়েছিল। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ১৭ লাখ টাকা লোকসান ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা মুনাফায় পরিণত করা হয়। এ সময় বিক্রি ১৫ কোটি ৯ লাখ থেকে বাড়িয়ে দেখানো হয় ৬৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
এ ছাড়া, প্রসপেক্টাসে সুদজনিত ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতিও তারা রক্ষা করেনি। ২০২১-২২ অর্থবছরে সুদ ব্যয় ১ কোটি ২৩ লাখ থাকলেও, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ৫৯ শতাংশ বেড়ে ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, ৬৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ শেয়ারের লক-ইন মেয়াদ শেষ হওয়ার পরপরই গত ডিসেম্বরে উদ্যোক্তা-পরিচালকরা ৩০ লাখ ৩০ হাজার শেয়ার বা ১৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ বিক্রি করে বাজার থেকে তুলে নিয়েছেন প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকা।
আল-মদিনার পর এবার একই উদ্যোক্তা গোষ্ঠী রয়্যাল ফুটওয়্যারের জন্য প্রাইম ব্যাংক ইনভেস্টমেন্টের মাধ্যমে ১২ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চাইছে। প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, উত্তোলিত অর্থের ৮ কোটি ঋণ পরিশোধ, ২ কোটি কাঁচামাল ক্রয়, ১ কোটি ৬৭ লাখে স্পেয়ার পার্টস কেনা এবং ৩৩ লাখ টাকা ব্যবহার করা হবে কিউআইও ব্যয়ে।
রয়্যাল ফুটওয়্যারের বর্তমান আর্থিক চিত্র অবিকল আল-মদিনার কিউআইও-পূর্ববর্তী সময়ের কারসাজির প্রতিচ্ছবি। ২০২০-২১ অর্থবছরে কোম্পানিটির বিক্রি ৫৪ কোটি ৯৭ লাখ থাকলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ৯২ কোটি ২৪ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। একই সময়ে নিট মুনাফা ১ কোটি ৮৭ লাখ থেকে বেড়ে ৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ চার বছরে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রি প্রায় ৬৮ শতাংশ এবং মুনাফা ১৮৮ শতাংশ বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেছেন, শেয়ারবাজারে আসার আগে অনেক কোম্পানির মুনাফা বাড়তে দেখা গেলেও টাকা উত্তোলনের পর স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও পারফরম্যান্স হঠাৎ করে কমে যায়। অতিরঞ্জিত ও ভুয়া ব্যবসায়িক চিত্র উপস্থাপনের কারণেই তৈরি হয় এমন পরিস্থিতি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে আল-মদিনা ও রয়্যাল ফুটওয়্যার কোম্পানির সচিব মো. আনোয়ার হোসাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি গণমাধ্যমের কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।




