সংস্কারের হাওয়ায় চাঙ্গা শেয়ারবাজার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গেল সপ্তাহে বিনিয়োগকারীদের শক্তিশালী অংশগ্রহণ এবং সূচকের বড় উত্থান লক্ষ করা গেছে দেশের দুই শেয়ারবাজারে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গত সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫ হাজার ৯০০ পয়েন্টের মাইলফলক স্পর্শ করেছে। একই সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে সার্বিক তারল্যপ্রবাহ। শুধু ডিএসইতেই ৫ কার্যদিবসে মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা, যার দৈনিক গড় লেনদেন আগের সপ্তাহের তুলনায় সাড়ে ৬ শতাংশের বেশি।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীতিগত বিভিন্ন সংস্কারের আশ্বাস, বিশেষ করে মার্জিন রুল সংশোধন ও স্ক্রিপ নেটিং সুবিধা চালুর প্রত্যাশায় আস্থা বেড়েছে বিনিয়োগকারীদের। এতেই চাঙ্গা বাজার। মূলত এই দুই সংস্কার বাস্তবায়ন হলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কেনার জন্য আরও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পাবেন, যা তাদের বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়াবে। পাশাপাশি স্ক্রিপ নেটিং সুবিধা চালু হলে একই কার্যদিবসে শেয়ার কেনাবেচার (ডে ট্রেডিং) সুযোগ তৈরি হবে। অর্থাৎ, কোনো শেয়ার কেনার পর তা ম্যাচিউরড হওয়ার অপেক্ষা না করেই একই দিনে বিক্রি করে নতুন শেয়ারে বিনিয়োগ করা যাবে।
এই সুবিধার ফলে বাজারে শেয়ারের হাতবদল বা তারল্যপ্রবাহ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে। এই সংস্কার ও বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমাদের অর্থনীতির তুলনায় শেয়ারবাজারের ডেপথ (গভীরতা) কম ছিল। দৈনিক ৫০০ কোটি টাকা লেনদেনের একটি বাজার মূল্যায়ন করা যায় না। আমরা ধীরে ধীরে দৈনিক লেনদেন ২ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করতে চাই। তবে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্থায়ী করতে হবে। সেই উদ্দেশ্যে আমরা বেশ কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছি।’
‘বাজারে শৃঙ্খলা না থাকলে টেকসই উন্নয়ন হবে না। ইনডেক্স বা সূচক নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই। লেনদেন বাড়লে ইনডেক্সও বাড়বে। নতুন কমিশন অত্যন্ত বিনিয়োগবান্ধব। বর্তমানে যেসব সংস্কার কাজ চলমান আছে, সেগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে ছয় মাস সময় লাগতে পারে’, যোগ করেন তিনি।
ডিএসইএক্স সূচকের পাশাপাশি অন্য সূচকগুলোও গত সপ্তাহে ছিল ঊর্ধ্বমুখী। নির্বাচিত বড় কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএস-৩০ এবং শরিয়াহ ভিত্তিক কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএসইএস—দুই ক্ষেত্রেই ভালো প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ডিএসইতে গত সপ্তাহে দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণও আগের সপ্তাহের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
এদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও সূচক ও লেনদেনে চাঙ্গা ভাব দেখা গেছে। সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই এবং সিএসসিএক্স সূচক—দুই সূচকই গত সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় ২ শতাংশের ওপরে বৃদ্ধি পেয়েছে। সপ্তাহ শেষে সিএসইতে মোট লেনদেনের পরিমাণও ছিল চোখে পড়ার মতো।
ডিএসইতে গত সপ্তাহে লেনদেন হওয়া অধিকাংশ কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড ও করপোরেট বন্ডের দর বেড়েছে। বাজারের এই রেকর্ড উত্থানে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে ব্র্যাক ব্যাংক, লাফার্জহোলসিম, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, ইসলামী ব্যাংক এবং পূবালী ব্যাংক।
গত সপ্তাহের লেনদেনে একক আধিপত্য দেখিয়েছে সাধারণ বীমা এবং বস্ত্র খাত। ডিএসইর মোট লেনদেনের একটি বড় অংশ যৌথভাবে দখল করে শীর্ষে রয়েছে এই দুই খাত। এর পরেই বিনিয়োগকারীদের পছন্দের তালিকায় ছিল ওষুধ ও রসায়ন, প্রকৌশল, ব্যাংক এবং খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাত।
বিনিয়োগকারীরা গত সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি মুনাফা পেয়েছেন সিমেন্ট খাতে, যেখানে সবচেয়ে বড় ইতিবাচক রিটার্ন এসেছে। এ ছাড়া মিউচুয়াল ফান্ড, চামড়া বা ট্যানারি, ব্যাংক এবং পাট খাতেও ভালো মুনাফা পেয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। অন্যদিকে তথ্যপ্রযুক্তি, কাগজ ও মুদ্রণ, ভ্রমণ এবং জীবন বিমা খাতে কিছুটা দর সংশোধন বা নেতিবাচক রিটার্ন লক্ষ করা গেছে।
আকর্ষণীয় করপোরেট রিটার্ন ও নীতিগত সংস্কারের ইতিবাচক আবহে শেয়ারবাজার দীর্ঘদিনের মন্দাভাব কাটিয়ে একটি শক্তিশালী অবস্থানের দিকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সাধারণ বিনিয়োগকারী।






