৭২ লাখ টাকা গাছ লাগাতে পরামর্শকের পেছনে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
উন্নয়ন প্রকল্পে নানা অজুহাতে অর্থ অপচয় যেন স্থায়ী সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় এবার গাছ লাগাতে পরামর্শকের জন্য বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ৭২ লাখ টাকা। এ ব্যয়কে অযৌক্তিক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে পরিকল্পনা কমিশন। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে এর যৌক্তিকতা। ‘গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ বনায়ন প্রকল্পে’ ঘটেছে এমন ঘটনা। এটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য হলো— উপকূলীয় এলাকায় বন বৃক্ষাচ্ছাদন বৃদ্ধি করা। এমন একটি প্রকল্পে পরামর্শকের কী কাজ, সেটি নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশ্নের। প্রস্তাবটি নিয়ে ১৩ আগস্ট হয়েছে পিইসি (প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি) সভা। সেখানে পরামর্শকের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। অনুমোদন পেলে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের আওতায় বন অধিদপ্তর। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ আগামীর সময়কে বলেছেন, বন অধিদপ্তরের কাজই তো হলো বনসম্পর্কিত। তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন জনবলও আছে। তাহলে বাইরে থেকে আলাদা লোক কেন লাগবে— বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে। এসব ক্ষেত্রে যে বিষয়টি ঘটেছে, তা হলো নিজেদের লোকদের কাজ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তবে প্রকৃত অর্থে পরামর্শক লাগবে কি না, সেটি ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে হবে।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দেশে জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ফরেস্ট্রি মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী প্রতি বছর কমপক্ষে ১০ হাজার হেক্টর এলাকায় নতুন বনায়ন করা প্রয়োজন। এ ছাড়া, ঘনবসতিপূর্ণ কৃষিপ্রধান এ দেশে নতুন জেগে ওঠা চর ভূমির স্থায়ীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে সামুদ্রিক বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের হাত থেকে বাঁচানো প্রয়োজন। এজন্য সমুদ্র তীরবর্তী চর বা নতুন জেগে ওঠা দ্বীপে বনায়ন করা হলে তা উপকূলীয় এলাকায় জনগোষ্ঠী সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করবে এবং ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক হবে। এরই মধ্যে অনেক নতুন চর জেগেছে। জেগে ওঠা এলাকায় বন ও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় অঞ্চলে মূল ভূখণ্ডের কাছাকাছি বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছুটা দূরেও অনেক চর জেগে উঠছে। উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী এবং বরগুনায় জেগে ওঠা নতুন চর উল্লেখযোগ্য। এসব চর ম্যানগ্রোভ বাগান সৃজনের জন্য উপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকা বৃক্ষাচ্ছাদন বৃদ্ধি করে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাস করার লক্ষ্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের আওতায় বন অধিদপ্তর এ প্রকল্পটি প্রস্তাব করেছে।
প্রকল্পের মূল কার্যক্রম হলো— ৪ হাজার ৫০১ হেক্টর ম্যানগ্রোভ বাগান সৃজন, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সরঞ্জাম কেনা এবং কম্পিউটার সফটওয়্যার ও ডেটাবেজ তৈরি করা। এ ছাড়া কার্বন ক্রেডিট মার্কেটে নিবন্ধন এবং প্রশিক্ষণ ও পেশাগত সেবার দক্ষতা বাড়ানো।
সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পের আওতায় ১৮ জন পেশাগত সেবা (কনসালট্যান্সি) অংশে ৭২ লাখ টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। বনায়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে বন অধিদপ্তরের কনসালট্যান্সি প্রয়োজনীয়তার যৌক্তিকতা ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে) সংযুক্ত করা হয়ে বলে পিইসি সভায় জানায়। এ ছাড়া প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং পরামর্শকের যোগ্যতা মূল্যায়ন করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রকল্প নেওয়ার আগেই সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা প্রয়োজন ছিল। কেননা প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে সম্ভাব্যতা ও পরামর্শকের যোগ্যতা মূল্যায়নের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় সভায়।
প্রশ্ন তোলা হয় প্রকল্পের শিরোনাম ‘গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ বনায়ন প্রকল্প’ নির্ধারণ করা নিয়েও। এক্ষেত্রে বলা হয়, প্রকল্প এলাকা হিসেবে বরিশাল এবং চট্টগ্রাম বিভাগের আট জেলার চরাঞ্চলকে নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া এই প্রকল্পের আওতায় শুধু ম্যানগ্রোভ বনায়নের কথা উল্লেখ আছে। সভায় প্রস্তাবিত প্রকল্পটির শিরোনাম নির্ধারণের যথার্থতার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
আরও জানা যায়, প্রকল্পের উদ্দেশ্যে উপকূলীয় এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলা হলেও এ বিষয়ে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়নি। এ ছাড়া উল্লিখিত কার্বন মজুদ বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যমাত্রাও সুনির্দিষ্ট করা হয়নি। এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।






