উদ্ভাবন ছাড়া টিকে থাকা অসম্ভব
- মিরপুর সিরামিক ওয়ার্কস ও খাদিম সিরামিকস পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির পরিচালক হামজাহ তাবানী। তিনি বাংলাদেশ সিরামিক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিসিএমইএ) এবং সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি স্কিলস কাউন্সিলের নির্বাচিত পরিচালক। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিএফই) কমিটির সদস্য। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সিরামিক শিল্পের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেছেন আগামীর সময়ের সঙ্গে।

হামজাহ তাবানী, পরিচালক, মিরপুর সিরামিক ওয়ার্কস এবং খাদিম সিরামিকস
প্রশ্ন: প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কিছু বলুন।
উত্তর: মিরপুর সিরামিকস বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় স্ট্রাকচারাল ক্লে প্রোডাকটস প্রস্তুতকারক। আমরা ব্রিকস, ব্লকসসহ নানা নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন করি। সহযোগী প্রতিষ্ঠান খাদিম সিরামিকস নির্মাণের ফিনিশিংয়ের জন্য ওয়াল, ফ্লোর, রুফ, ক্ল্যাডিং টাইলসসহ বিভিন্ন সিরামিক পণ্য তৈরি করে। ১৯৫৮ সাল থেকে আমরা নির্মাণশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। এই দীর্ঘ সময়ে গুণগত মান, উদ্ভাবন ও নির্ভরযোগ্যতায় জোর দিয়ে আর্কিটেক্ট, ইঞ্জিনিয়ার, ইন্টেরিয়র ডিজাইনারসহ টেকনিক্যাল প্রফেশনালদের সঙ্গে কাজ করেছি। তাদের অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দিয়ে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী নতুন নির্মাণসামগ্রী তৈরি করছি।
প্রশ্ন: উদ্ভাবন নিয়ে আপনাদের কাজের প্রক্রিয়াটি কেমন?
উত্তর: আমাদের উদ্ভাবন সুসংগঠিত প্রক্রিয়ায় চলে। প্রথমে স্থপতি, প্রকৌশলী, ইন্টেরিয়র ডিজাইনারসহ পেশাজীবীদের মতামত থেকে বাজারের চাহিদা ও উন্নয়নের সুযোগ চিহ্নিত করি। এরপর দেশি-বিদেশি শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডের সঙ্গে আমাদের পণ্যের তুলনা করি। ইউরোপভিত্তিক প্রযুক্তি ও কাঁচামাল সরবরাহকারীদের সঙ্গে কাজ করে উৎপাদন, উপকরণ ও ডিজাইনের সর্বশেষ অগ্রগতি জানি। বাংলাদেশের জলবায়ু, নির্মাণপদ্ধতি ও গ্রাহকের চাহিদা বিবেচনায় রেখে আন্তর্জাতিক প্রবণতা মূল্যায়ন করি এবং ভারতসহ পার্শ্ববর্তী বাজারের অভিজ্ঞতা থেকে প্রাসঙ্গিক উদ্ভাবনের ধারণা নিই। ভবিষ্যতের চাহিদা বুঝতে সরকারি নীতিমালা, বিল্ডিং রেগুলেশন ও টেকসই নির্মাণ উদ্যোগ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করি। ধারণা নির্বাচনের পর আমাদের গবেষণা ও উন্নয়ন দল প্রোটোটাইপ তৈরি করে, যা প্রয়োজনে বুয়েট ও এমআইএসটির মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। এরপর বিশেষজ্ঞদের মতামতে পণ্যটিকে বাজারজাত করার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত করা হয়। এভাবেই গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে উদ্ভাবন এগিয়ে চলে।
প্রশ্ন: সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কী ধরনের উদ্ভাবনী পণ্য বাজারে এনেছেন?
উত্তর: আমাদের লক্ষ্য নির্মাণ খাতের বাস্তব সমস্যার সমাধান ও টেকসই উন্নয়নের চাহিদা পূরণ। আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন হলো সিরামিক ব্লক। প্রতিবেশী দেশ ভারতের নির্মাণপদ্ধতি বিবেচনায় এর আকার ও নকশা তৈরি করা হয়েছে। প্রচলিত কংক্রিট ব্লকের তুলনায় এটি তাপ ও শব্দ নিরোধে বেশি কার্যকর, ভবন শীতল রাখে ও বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে। হালকা, টেকসই ও দ্রুত নির্মাণে সহায়ক এ ব্লক স্থানীয় কাদামাটির হওয়ায় কার্বন নিঃসরণ ও আমদানি নির্ভরতা কমায়। লাল ইটের বিকল্প হিসেবে গ্রেইনড ও টেক্সচার্ড ফেসিং ব্রিকস তৈরি করেছি, যা ভবনের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি পোড়ামাটির দৃঢ়তা বজায় রাখে।
টাইলসে কয়েকটি নতুন কালেকশন এনেছি। এর মধ্যে Odyssey Series ভূমধ্যসাগরীয় স্থাপত্যশৈলী থেকে অনুপ্রাণিত। Eternal Series উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে মার্বেল, কাঠ ও পাথরের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলে; যা টেকসই, সহজে রক্ষণাবেক্ষণযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব। নগর অবকাঠামোর চাহিদায় তৈরি করেছি Subway Tiles, যা মেট্রো স্টেশন ও আন্ডারপাসের জন্য উপযোগী। এ ছাড়া Khadim Mortars-এর মাধ্যমে টাইল অ্যাডহেসিভ, গ্রাউটসহ রেডি-মিক্স সামগ্রী সরবরাহ করছি, যা টাইলস স্থাপনের মান উন্নত করে সময় বাঁচায়। আমাদের কাছে উদ্ভাবন মানে দেশের জন্য বাস্তবসম্মত ও ভবিষ্যৎমুখী সমাধান তৈরি।
প্রশ্ন: ধারাবাহিকভাবে উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে প্রধান অনুপ্রেরণা কী?
উত্তর: প্রধান অনুপ্রেরণা বাংলাদেশের নির্মাণশিল্পকে এগিয়ে নেওয়া। একটি উদ্ভাবনী সামগ্রী পুরো নির্মাণশিল্পের মান ও ধরন বদলাতে পারে। উন্নয়নে অবদান রাখাই মূল লক্ষ্য। পরিবেশগত নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যার টেকসই সমাধান হলো উদ্ভাবন। আমরা এমন পণ্য তৈরি করি, যা সম্পদের ব্যবহার কমায়, দীর্ঘস্থায়ী হয় ও পরিবেশবান্ধব নির্মাণে সহায়ক। শিল্পে টিকে থাকতে নতুনত্ব অপরিহার্য। নতুন প্রযুক্তি ও পদ্ধতির মাধ্যমে খরচ কমিয়ে উৎপাদন দক্ষ করি এবং সুবিধা গ্রাহকদের দিই। নতুন পণ্য ব্র্যান্ডকে আলাদা পরিচিতি দেয়। বিদেশের সব প্রযুক্তি বাংলাদেশের উপযোগী নয়; আবহাওয়া, কাঁচামাল ও বাজারের চাহিদা ভিন্ন হওয়ায় নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই সমাধান তৈরিতে উদ্ভাবন জরুরি। এ ছাড়া আমদানি করা টাইলস ডিজাইন ও মানের জন্য জনপ্রিয় থাকায় আন্তর্জাতিক মানের পণ্য তৈরি করে দেশীয় শিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক করাও উদ্ভাবনের চালিকাশক্তি।
প্রশ্ন: সিরামিক শিল্পে উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বাধাগুলো কী কী?
উত্তর: দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতায় উদ্ভাবন গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই গবেষণায় বিনিয়োগ করলেও কিছু প্রতিবন্ধকতা উদ্ভাবনের গতি কমাচ্ছে। বড় চ্যালেঞ্জ মেধাস্বত্ব সুরক্ষার অভাব। নতুন ডিজাইন উদ্ভাবনে প্রতিষ্ঠানগুলো সময় ও অর্থ দেয়। কিন্তু দ্রুতই এসব উদ্ভাবন অন্য প্রতিষ্ঠান নকল করে। জবাবদিহি ছাড়া মৌলিক পণ্য অনুকরণ করায় গবেষণায় আগ্রহ কমে। বিনিয়োগ সুরক্ষিত থাকার নিশ্চয়তা প্রয়োজন। মেধাস্বত্ব আইনের প্রয়োগ হলে সুস্থ পরিবেশ তৈরি হবে।
আরেকটি প্রতিবন্ধকতা নীতিমালার ধীরগতি। প্রযুক্তি বদলালেও নীতিমালা, বিল্ডিং কোড, শিল্পমান ও অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত হালনাগাদ হয় না। ফলে উদ্ভাবনী পণ্য গ্রহণযোগ্যতা পেতে দেরি হয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এ ছাড়া নতুন পণ্য প্রতিষ্ঠায় ব্যাপক সচেতনতা লাগে। পেশাজীবী ও ব্যবহারকারীরা প্রচলিত পদ্ধতিতে অভ্যস্ত থাকায় নতুন উপকরণ গ্রহণে দ্বিধায় ভোগেন। তাই নতুন উদ্ভাবন সফল করতে পরীক্ষা, প্রদর্শনী ও প্রশিক্ষণে অনেক বিনিয়োগ করতে হয়। মেধাস্বত্ব সুরক্ষা কার্যকর করা, নীতিমালা আধুনিকায়ন এবং সরকার, শিল্প খাত ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা বাড়ালে উদ্ভাবনের গতি বাড়বে। এতে শিল্পের সক্ষমতা বাড়বে এবং দেশে-বিদেশে অবস্থান শক্তিশালী হবে।
প্রশ্ন: উদ্ভাবন উৎসাহিত করতে আপনার নীতিগত সুপারিশ কী?
উত্তর: সিরামিক শিল্পে উদ্ভাবন বাড়াতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। গুরুত্বপূর্ণ হলো মেধাস্বত্ব সুরক্ষা শক্তিশালী করা। নতুন পণ্য ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গবেষণা ও পণ্য উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হয়। উদ্ভাবন নকল হলে প্রতিষ্ঠানগুলো গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগের আগ্রহ হারায়। কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত হলে উদ্ভাবন স্বীকৃতি পাবে এবং সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হবে। উদ্ভাবনে বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকার করভিত্তিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে পারে। গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং নতুন পণ্য উদ্ভাবনে কর-সুবিধা দিলে প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে। ফলে পণ্যের মান উন্নত হবে, উদ্ভাবনের গতি বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের সিরামিক শিল্পের সক্ষমতা শক্তিশালী হবে।
প্রশ্ন: আগামী ১০ বছরে টাইলস শিল্পকে কোথায় দেখতে চান?
উত্তর: আগামী ১০ বছরে টাইলস শিল্পকে আরও গুণগতমাননির্ভর, প্রযুক্তিনির্ভর ও উদ্ভাবনকেন্দ্রিক দেখতে চাই। স্থানীয় বাজার পরিপূর্ণ হওয়ায় ব্যাপক প্রতিযোগিতা রয়েছে। রপ্তানি সীমিত থাকায় প্রবৃদ্ধি দেশীয় বাজারের ওপর নির্ভরশীল। ভবিষ্যতে শুধু মূল্যভিত্তিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন। যারা নতুন পণ্য উদ্ভাবন করবে, বিশেষায়িত বাজারের সমাধান তৈরি করবে এবং প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করবে, তারাই এগিয়ে থাকবে। কিছু গণউৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও উৎপাদন দক্ষতায় শক্ত অবস্থান ধরে রাখবে। আর যারা উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করবে না, তারা পিছিয়ে পড়বে।
মিরপুর ও খাদিম সিরামিকস এই ভবিষ্যৎ সামনে রেখেই কাজ করছে। আমরা আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখব, জলবায়ু ও চাহিদার উপযোগী পণ্য উদ্ভাবন এবং বুয়েট ও এমআইএসটির সঙ্গে যৌথ গবেষণায় আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করব। এই মডেলই বৈশ্বিক বাজারে আমাদের সক্ষমতা তৈরি করবে। আমাদের লক্ষ্য শুধু শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড হওয়া নয়, বরং বাংলাদেশের সিরামিক পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে নির্ভরযোগ্য ও উচ্চমানসম্পন্ন ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।




