খেলাপির লাগাম টানতে সব পদক্ষেপই ব্যর্থ
- রেকর্ড খেলাপি ঋণ ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি
- তিন মাসে বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা
- ১ বছরে বৃদ্ধি ১ লাখ ৬৯ হাজার কোটি
- খেলাপির বাইরে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ সাড়ে ৭ লাখ কোটি

হুহু করে বেড়েই চলেছে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ। একের পর এক বিশেষ পদক্ষেপ এবং ঋণে ছাড় দিয়েও এর লাগাম টানা যাচ্ছে না। তিন মাসে বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৩১ হাজার কোটি টাকা। এ নিয়ে মোট খেলাপি দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। এটি এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রেকর্ড। ঋণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম, পরিচালকদের ঋণ জালিয়াতি এবং আদায়ে কর্মকর্তাদের গড়িমসিসহ বিভিন্ন সময়ে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের হস্তক্ষেপে মূলত এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, গত মার্চ শেষে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। আর খেলাপি ঋণের পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। যদিও গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। সেই হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। আবার ২০২৫ সালে মার্চে ৪ লাখ ২০ হাজার ৩৩৫ কোটি খেলাপির সঙ্গে গত মার্চে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা খেলাপির তুলনা করলে বৃদ্ধি দাঁড়ায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা। একইভাবে ২০২৪ সালের মার্চে খেলাপি ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা, যা গত মার্চের সঙ্গে তুলনা করলে দুই বছরে খেলাপি বেড়েছে ৪ লাখ ৬ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় ২০০৯ সালে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার কোটি টাকা। এরপর ব্যাংকঋণে নানা পরিবর্তন আনা হয়। পাশাপাশি চতুর্থ ও পঞ্চম প্রজন্মের ব্যাংকের সনদ দেওয়া হয়। আর ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা অস্ত্রের মুখে দখল করে নেয় এস আলম গ্রুপ। গ্রুপটি সরকারের ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঋণের নামে কয়েক লাখ কোটি টাকা পাচার করে। আর কোনো ঋণ পরিশোধ না করলেও নানা কৌশলে আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাসা গ্রুপসহ কয়েকটি গোষ্ঠীর খেলাপি ঋণকে নিয়মিত দেখানো হতো। যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর, ডেপুটি গভর্নর, পর্যবেক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বোর্ড এবং ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এমডি ও চেয়ারম্যান কারাগার আছেন। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষকসহ কয়েক ডজন কর্মকর্তাকে দুদক তলব করে। সবশেষ ২০২৪ সালে সরকার বদলের পর গোপন করা ঋণ প্রকাশ পেতে শুরু হয়। বেরিয়ে আসে খেলাপির প্রকৃত চিত্র। আবার আওয়ামী লীগ-সমর্থিত অনেক গ্রাহককে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। ফলে খেলাপি ঋণ হুহু করে বেড়ে যায়। এ অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ ছাড়ে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়। তবু খেলাপি ঋণ লাগামহীন হয়ে পড়েছে। এমনকি অর্ধশত ব্যক্তি আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বর্তমানে সংসদ সদস্য হিসেবে রয়েছেন।
ঋণ আদায়ে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। খেলাপিদের সামাজিক সব ধরনের সুবিধা বন্ধ করে দিতে হবে। কোনো শিথিলতা দেখানো যাবে না— ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ
াংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি। এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৪৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। আর ব্যাংকগুলোর খেলাপির পরিমাণ ৩ লাখ ২৬ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।
এদিকে দৃশ্যমান খেলাপির বাইরে ব্যালান্স শিটে দেখানো হয় না— এমন অবলোপন করা ঋণ সর্বশেষ দাঁড়িয়েছে ৮১ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া অর্থঋণ আদালত, উচ্চ আদালতে রিট ও স্থিতাদেশে আটকা আছে ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। পাশাপাশি আরও কয়েকটি খাতে রয়েছে মোটা অঙ্কের ঋণ, যা আদায়ের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। সব মিলিয়ে দুর্দশাগ্রস্ত এবং ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ ৭ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বললেন, ‘খেলাপি ঋণ ইস্যু শেষ করতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষ সুযোগ দিয়ে ঋণ আদায় করতে হবে। কেস বাই কেস, ব্যাংক বাই ব্যাংক ঋণ আদায়ের লক্ষ্য বেঁধে দিতে হবে। ঋণ আদায়ে মনিটরিং বাড়াতে হবে। কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক সুবিধা বন্ধ করে দিতে হবে। স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার মতো খেলাপি আদায়ে হার্ডলাইনে যেতে হবে। ইন্ডিয়া খেলাপি কমাতে পেরেছে। বাংলাদেশ ব্যাংককেও পারতে হবে। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করতে হবে। কোনো শিথিলতা দেখানো যাবে না।’
প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে আরও জানা গেছে, ২০২৩ সালের মার্চে খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা এবং খেলাপির হার ছিল ৮ দশমিক ৮০ শতাংশ। আর ২০২২ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা এবং খেলাপির হার ছিল ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। মূলত ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত খেলাপির হার এক অঙ্কের ঘরে ছিল। আর গত মার্চে খেলাপির হার মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সাল থেকে লাগামছাড়া হয় খেলাপি ঋণ। এসব বিষয় পর্যবেক্ষণে নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের শর্ত হিসেবে ব্যাংক খাতে খেলাপির হার ১০ শতাংশের নিচে নামার তাগিদ দেয়। সরকারি ব্যাংকের জন্য এ হার ১০ শতাংশ এবং বেসরকারি ব্যাংকের জন্য ৫ শতাংশ।




