বেসরকারি খাতের অর্থায়ন সহজ করতে আর্থিক খাতে সংস্কারের আহ্বান

ছবি: আগামীর সময়
দেশের বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে অর্থায়নে প্রবেশাধিকার সহজ করা এবং আরও কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন নীতিনির্ধারক, ব্যাংকার ও ব্যবসায়ী নেতারা। তাদের মতে, ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের বাইরে দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের উৎস তৈরি, ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় আস্থা ফিরিয়ে আনা, ডিজিটাল আর্থিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে বেসরকারি বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত গতি পাবে না।
আজ সোমবার রাজধানীর গুলশানে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশে অর্থায়নে প্রবেশাধিকার : বেসরকারি খাতের জন্য আরও সহায়ক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব মতামত উঠে আসে। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ ও এমসিসিআই যৌথভাবে অস্ট্রেলিয়া সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেডের সহযোগিতায় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত বাংলাদেশ বিজনেস ইনডেক্স (বিবিএক্স) ২০২৪-২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, মূল্যায়ন করা ১১টি সূচকের মধ্যে ‘অর্থায়নে প্রবেশাধিকার’ সবচেয়ে কম স্কোর পেয়েছে। এ সূচকে স্কোর হয়েছে ১০০-এর মধ্যে ৪০ দশমিক ০৭, যদিও আগের বছরের তুলনায় এতে ১২ পয়েন্ট উন্নতি হয়েছে। তবুও এটি এখনো দেশের ব্যবসা পরিবেশের অন্যতম বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে রয়ে গেছে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন এমসিসিআইর মহাসচিব ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুক আহমেদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রাইসওয়াটারহাউসকুপারস (পিডব্লিউসি) বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজিং পার্টনার শামস জামান। তিনি বললেন, খেলাপি ঋণ ও আর্থিক খাতের সমস্যার বিশ্বাসযোগ্য সমাধান নতুন ঋণপ্রবাহ ও আস্থা পুনর্গঠনের ভিত্তি তৈরি করবে। একই সঙ্গে শুধু ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের বিকল্প উৎস গড়ে তোলা এবং গ্যারান্টি উইন্ডোকে একটি স্বায়ত্তশাসিত ও পেশাদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী ড. এম. মাসরুর রিয়াজের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন শাশা ডেনিমস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ, আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম)-এর সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল, ব্র্যাক ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এসএমই ব্যাংকিং প্রধান সৈয়দ আবদুল মোমেন এবং এইচএসবিসি বাংলাদেশের বহুজাতিক হোলসেল ব্যাংকিং প্রধান আন্দালিব মির্জা।
আলোচনায় শামস মাহমুদ বললেন, মহামারি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা যায়নি। এর সঙ্গে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি যুক্ত হয়ে উৎপাদন খাতে অর্থায়ন ও নগদ প্রবাহের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে।
অ্যামচেম সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেছেন, বড় প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা (এসএমই) প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নে অনেক পিছিয়ে। এ সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংক, বিচার বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
ব্র্যাক ব্যাংকের সৈয়দ আবদুল মোমেন বললেন, এসএমই খাতে ঋণ সম্প্রসারণে শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো অপরিহার্য। বর্তমানের অনেকটাই ম্যানুয়াল পদ্ধতি কার্যকর নয় এবং এটি ঋণ বিতরণে জটিলতা তৈরি করছে।
এইচএসবিসি বাংলাদেশের আন্দালিব মির্জা বলেছেন, পর্যাপ্ত ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার ও আর্থিক তথ্য যাচাইয়ের দুর্বলতা বিশেষ করে রপ্তানি কার্যক্রম নেই এমন অ-পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গোলটেবিলে অংশ নেওয়া ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিদের ভাষ্য, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না হলে নতুন শিল্প প্রকল্পে ব্যাংকগুলো অর্থায়নে আগ্রহী হবে না। তাই গ্যাস ও এলএনজি অবকাঠামো উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ বিতরণে ইতিবাচক অগ্রগতির কথাও তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন জানান, দেশের আঞ্চলিক, লিঙ্গভিত্তিক, আর্থিক ও মানসিক বৈষম্য বিবেচনায় নিয়ে ঋণগ্রহীতাদের চাহিদাভিত্তিক পৃথক নীতি প্রণয়ন করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি. রহমান বলেছেন, অর্থায়নে প্রবেশাধিকার বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারক এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ও ধারাবাহিক সংলাপের বিকল্প নেই।
গোলটেবিলের আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বেসরকারি খাতের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, সাড়া-দেওয়া সক্ষম এবং প্রবৃদ্ধিবান্ধব আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাস্তবভিত্তিক সংস্কার এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব জোরদারের আহ্বান জানান। তাদের সুপারিশ ভবিষ্যতে দেশের আর্থিক খাত সংস্কারের নীতিনির্ধারণে সহায়ক হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।




