ট্রেড ফাইন্যান্স আধুনিকায়ন ও সম্পদের গুণগত মান উন্নয়ন জরুরি : বিআইবিএম

সংগৃহীত ছবি
দেশের ব্যাংকিং খাতে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ট্রেড ফাইন্যান্সের আধুনিকায়নের পাশাপাশি সম্পদের গুণগত মান উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে আরও দ্রুত, নিরাপদ ও কাগজবিহীন করতে আধুনিক আইনগত ও ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
আজ বুধবার মিরপুরে বিআইবিএম ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত "Trade Services Operations of Banks" শীর্ষক রিভিউ কর্মশালায় দেশের জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার, নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ ও গবেষকেরা ট্রেড ফাইন্যান্স খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে মতবিনিময় করেন।
কর্মশালায় উপস্থাপিত গবেষণাপত্রে জানানো হয়, ট্রেড ফাইন্যান্সে উল্লেখযোগ্য এক্সপোজার রয়েছে এমন ব্যাংকগুলোর ট্রেড-সংশ্লিষ্ট ঋণ পোর্টফোলিওতে সম্পদের গুণগত মানের ওপর ইতোমধ্যে চাপ স্পষ্ট।
গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের ব্যাংকের ট্রেড ফাইন্যান্স-সংক্রান্ত খেলাপি ঋণের হার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ। অন্যদিকে, যেসব ব্যাংকের সামগ্রিক খেলাপি ঋণের হার বেশি এবং একই সঙ্গে ট্রেড ফাইন্যান্সে উল্লেখযোগ্য এক্সপোজার রয়েছে, সেসব ব্যাংকে ট্রেড ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার ৮০ শতাংশেরও বেশি।
গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন বিআইবিএমের প্রফেসর (সিলেকশন গ্রেড) ড. শাহ মো. আহসান হাবীব। তিনি তুলে ধরেন, নন-ফান্ডেড দায় জোরপূর্বক ঋণে রূপান্তরিত হওয়াই ট্রেড ফাইন্যান্সে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষ করে মূলধনী যন্ত্রপাতি, তুলাসহ বিভিন্ন কাঁচামাল, চিনি, সার, জ্বালানি এবং স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানিসংক্রান্ত ট্রেড ফাইন্যান্সে এ ধরনের ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা সম্পদের গুণগত মানের অবনতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
গবেষণায় রপ্তানি অর্থায়নের ক্ষেত্রেও একটি কাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়েছে। মতামত জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় সব ব্যাংকারের অভিমত, আইনগতভাবে কার্যকর ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি ছাড়া ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ব্যবহারের কারণে রপ্তানি অর্থায়নে খেলাপি ঋণ সৃষ্টি হচ্ছে।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি মূলত নিশ্চিত রপ্তানি আদেশের বিপরীতে উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহে অর্থায়নের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু ভিত্তি হিসেবে থাকা চুক্তি দুর্বল, বিতর্কিত বা আইনগতভাবে কার্যকর না হলে পুরো অর্থায়ন প্রক্রিয়া ঝুঁকির মুখে পড়ে। ফলে রপ্তানি আয় সময়মতো না এলে বা আদায় না হলে ট্রেড ফাইন্যান্সের স্বয়ং-পরিশোধযোগ্য বৈশিষ্ট্য নষ্ট হয়ে তা দ্রুত জোরপূর্বক ঋণে পরিণত হয় এবং ব্যাংকের ঋণঝুঁকি বেড়ে যায়।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম। তিনি উল্লেখ করেন, গ্রাহকসেবার মান অক্ষুণ্ন রেখে অর্থপাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন এবং ট্রেড-বেইজড মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে উদ্ভাবনী আর্থিক পণ্য ও ঝুঁকি ভাগাভাগির কার্যকর ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ট্রেড ফাইন্যান্সের সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, পণ্যভিত্তিক তথ্যসংগ্রহ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সম্পদের গুণগত মান পর্যবেক্ষণ আরও জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও কার্যকর ট্রেড ফাইন্যান্স ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংক, তফসিলি ব্যাংক, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর আহ্বান জানান।
গবেষণাপত্রটি যৌথভাবে প্রস্তুত করেন বিআইবিএমের প্রফেসর (সিলেকশন গ্রেড) ড. শাহ মো. আহসান হাবীব, সহকারী অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ, সহকারী অধ্যাপক রাহাত বানু, প্রভাষক রাজিব কুমার দাস, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি ডিপার্টমেন্ট-১-এর অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আরাফাত আলী এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট এ টি এম নেছারুল হক। গবেষণা দলের সব সদস্য কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন।
আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি প্রফেসর ও এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুর রহমান, সিডিসিএস, প্রাইম ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সাজ্জাদ হায়দার চৌধুরী এবং সিটি ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদ।মুক্ত আলোচনায় বিভিন্ন ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা ট্রেড ফাইন্যান্সের আধুনিকায়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সম্পদের গুণগত মান উন্নয়নে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরেন।




